শুক্রবার । মে ১৫, ২০২৬
ব্রি: জে: (অব.) মোঃ জাহেদুর রহমান মতামত ১৫ মে ২০২৬, ১২:০৩ অপরাহ্ন
শেয়ার

সীমান্ত হত্যা: প্রকৃত ও বিশ্লেষণমূলক আলোচনা


zahedur Rahman

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের কিছু অঞ্চলে স্থানীয় মানুষের কাছে বিএসএফ এখন শুধু একটি সীমান্তরক্ষী বাহিনীর নাম নয়; এটি আরেকটি আতঙ্কের প্রতিশব্দ। নদীতে যেমন কুমিরের ভয়, জঙ্গলে যেমন বিষধর সাপের আতঙ্ক, তেমনি সীমান্তঘেঁষা অনেকের কাছে বিএসএফের টহলও এক অনিশ্চিত আতঙ্কের নাম। তবে মূলত এই আতঙ্কিত জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই ক্রস বর্ডার অপরাধ জগৎ ও স্মাগলিং এর সাথে জড়িত, যা অনেক ক্ষেত্রেই সংবাদ মাধ্যমে সেভাবে প্রকাশিত হয়না। মানব পাচারকারী কিংবা চোরাকারবারি, অনেক ক্ষেত্রেই জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান নির্ধারিত হয়েছে কয়েক সেকেন্ডের ট্রিগার প্রেসে।

সাধারণ মানুষের মনে তাই স্বাভাবিক প্রশ্ন সীমান্তে মানুষ গুলিতে নিহত হয় কিন্তু বিজিবি কী করে? এই প্রশ্নের উত্তর আবেগ দিয়ে নয়, সীমান্ত বাস্তবতা, সামরিক কৌশল, আন্তর্জাতিক আইন এবং রাষ্ট্রীয় সীমাবদ্ধতার ভেতর থেকে খুঁজতে হবে।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত বিশ্বের অন্যতম জটিল আন্তর্জাতিক সীমান্ত। প্রায় প্রতিটি সেক্টরেই রয়েছে জনবসতি, কৃষিজমি, আন্তঃসীমান্ত সামাজিক সম্পর্ক, চোরাচালান রুট, মানবপাচার করিডোর এবং সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের সক্রিয় উপস্থিতি। এর ভেতরে আবার পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনপরবর্তী রাজনৈতিক উত্তেজনা, `বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ ইস্যুকে ঘিরে আগ্রাসী রাজনৈতিক বক্তব্য এবং সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা-অভিযান পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল এবং ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।

এই প্রেক্ষাপটে সীমান্তে অধিকাংশ প্রাণহানির ঘটনা ঘটে ভারতীয় ভূখণ্ডে, বিএসএফের অপারেশনাল কন্ট্রোল জোনে। অর্থাৎ ফায়ার কন্ট্রোল, গ্রাউন্ড ডমিনেশন এবং রুলস অব এনগেজমেন্ট সম্পূর্ণভাবে ভারতীয় বাহিনীর হাতে থাকে। এখানেই মৌলিক বাস্তবতা হলো, কোনো দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের সীমান্তরক্ষী বাহিনী অন্য দেশের ভেতরে প্রবেশ করে পাল্টা সামরিক প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে না। সেটি আন্তর্জাতিক সীমান্ত লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে এবং তাৎক্ষণিক ট্যাকটিক্যাল উত্তেজনাকে স্ট্র্যাটেজিক সংঘাতে রূপ দিতে পারে।

তাহলে বিজিবির ভূমিকা কী?
বিজিবি সীমান্তে প্রতিদিন যুদ্ধ সংঘটিত হওয়া প্রতিরোধ করে। এই বাস্তবতা জনসমক্ষে খুব কম দৃশ্যমান। কারণ একটি লাশের ছবি সংবাদ হয়, কিন্তু একটি সম্ভাব্য সীমান্ত সংঘর্ষ প্রতিরোধ করার ঘটনা সাধারণত শিরোনাম হয় না। সীমান্তে বিজিবির ভূমিকা মূলত এসকেলেশন কন্ট্রোল, বর্ডার স্ট্যাবিলিটি এবং কৌশলগত সংযম বজায় রাখার মধ্যে নিহিত।

কোনো গুলির ঘটনার পর তাৎক্ষণিক ফ্ল্যাগ মিটিং, কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ের যোগাযোগ, ব্যাটালিয়ন কমান্ডার সমন্বয়, কূটনৈতিক প্রতিবাদ, ট্যাকটিক্যাল প্যাট্রোল রিইনফোর্সমেন্ট, ডিজিটাল সার্ভিল্যান্স বৃদ্ধি, ঝুঁকিপূর্ণ বিওপি এলাকায় ডমিনেশন প্যাট্রোল এবং সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীকে সতর্ক করা, এগুলোই আধুনিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনার বাস্তব প্রতিক্রিয়া।

একইসঙ্গে বিজিবি প্রতিদিন সীমান্তে অস্ত্র, মাদক, মানবপাচার ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে অপারেশন পরিচালনা করে। অসংখ্য অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকানো হয়, বহু মানবপাচারের শিকার উদ্ধার হয়, সংঘবদ্ধ চোরাকারবারি সিন্ডিকেট শনাক্ত করা হয়। কিন্তু এসব নীরব সাফল্যের দৃশ্যমানতা কম।

অন্যদিকে সীমান্তে বিএসএফের আচরণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই মানবাধিকার প্রশ্ন রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, ভারতীয় নাগরিক সমাজ এমনকি ভারতের নিজস্ব গণমাধ্যমের একাংশও বহুবার সীমান্তে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, বিচারবহির্ভূত গুলি এবং “shoot first” মানসিকতার সমালোচনা করেছে। কারণ আধুনিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় নন-লেথাল কন্ট্রোল, ইলেকট্রনিক নজরদারি, আটককেন্দ্রিক প্রতিরোধ এবং টেকনোলজি-সাপোর্টেড ইন্টারসেপশনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে দক্ষিণ এশিয়ার এই সীমান্তে অনেক সময় গুলিই প্রথম প্রতিক্রিয়ায় পরিণত হয়।

এটি কেবল মানবিক সংকট নয়; এটি কৌশলগতভাবেও বিপজ্জনক। কারণ সীমান্তে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভয়, ক্ষোভ এবং রাষ্ট্রবিরোধী মনোভাব তৈরি করে। দীর্ঘমেয়াদে এটি সীমান্ত ব্যবস্থাপনাকে আরও অনিশ্চিত করে তোলে।

এখানে আরেকটি অস্বস্তিকর বাস্তবতাও রয়েছে। সীমান্তে নিহতদের একটি অংশ সংঘবদ্ধ চোরাকারবার, মাদক পরিবহন, গবাদিপশু পাচার কিংবা অবৈধ পারাপারের সঙ্গে যুক্ত থাকে। কিন্তু সেটিও প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের বৈধতা প্রদান করে না। কারণ আইন প্রয়োগের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত আটক ও বিচার, সরাসরি হত্যা নয়।

মূলধারার গণমাধ্যম প্রায়ই সীমান্ত হত্যাকে মানবিক ট্র্যাজেডি হিসেবে উপস্থাপন করে, কিন্তু সীমান্ত অপরাধ অর্থনীতি, দালালচক্র, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং সীমান্তের অপারেশনাল বাস্তবতা তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত হয়। ফলে জনমনে এমন ধারণা তৈরি হয় যেন সীমান্তে প্রতিটি মৃত্যু কেবল একক বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তার ফল। বাস্তবে সীমান্ত নিরাপত্তা অনেক বেশি জটিল, বহুস্তরীয় এবং কূটনৈতিক ভারসাম্যনির্ভর একটি বিষয়।

দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে পূর্ণমাত্রার উত্তেজনা কোনো পক্ষের জন্যই লাভজনক নয়। এ কারণেই বিজিবির কৌশলগত দায়িত্ব কেবল সীমান্ত পাহারা দেওয়া নয়; বরং সীমান্তকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হওয়া থেকে রক্ষা করা।

কারণ সীমান্তে প্রতিটি ট্রিগার শুধু একটি জীবনই থামায় না; এটি দুই রাষ্ট্রের মধ্যকার আস্থার ক্ষেত্রও সংকুচিত করে। আর সেই কারণেই সীমান্তে সংযম অনেক সময় গুলির চেয়েও কঠিন দায়িত্ব।

ব্রি: জে: (অব.) মোঃ জাহেদুর রহমান: নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

[মতামত বিভাগে প্রকাশিত লেখা লেখকের নিজস্ব মন্তব্য ]