
তাহলে শেষ পর্যন্ত কি হবে? বিজয় কী পারবেন ম্যাজিক নাম্বার ছুঁতে?
দক্ষিণী ছবির মতোই টুইস্ট এবং পাল্টা টুইস্ট তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে। ছবির গল্পের মতো টানটান উত্তেজনা আর নিত্যনতুন বাঁক। যার শেষটা ধরা যাচ্ছে না। ছবির নাম- ম্যাজিক নাম্বার।
গল্পের শুরুটা হয়েছে রাজ্যের সদ্য শেষ হওয়া নির্বাচনের পর। যে নির্বাচন তামিলনাড়ুতে গেলো প্রায় পঞ্চাশ বছরের বেশি সময়ের চিত্র পাল্টে দিয়েছে। ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে- রাজ্যের দুই বড় দল, যারা পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় তামিলনাড়ুর ক্ষমতা ভাগাভাগি করেছে, তাদের পেছনে ফেলে সেখানে সবচেয়ে বড় দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে মাত্র দুই বছর আগে গঠিত টিভিকে পার্টি। সবচেয়ে বড় দল বলা হচ্ছে ভোটের ফলের হিসেবে। কারণ তামিল ছবির সুপারস্টার বিজয় থালাপতির দল টিভিকে নির্বাচনে ১০৮টি আসনে জিতেছে। অন্যদিকে দুই বড় দল ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে’র আসন সংখ্যা চল্লিশ থেকে পঞ্চাশের ঘরে।
মাত্র দুই বছরের একটি দলের এমন সাফল্যকে যদি টুইস্ট ধরা হয় তাহলে পাল্টা টুইস্টও আছে। তামিলনাড়ুতে ক্ষমতায় যাওয়ার ম্যাজিক নাম্বার ১১৮। অর্থাৎ ২৩৪ সদস্যদের বিধানসভায় অন্তত ১১৮ আসনে বিজয়ী প্রার্থীর সমর্থন লাগে। আর এখানেই আটকে গেছেন বিজয় থালাপতি আর তার দল টিভিকে। নিজেদের ১০৮ আসনের বাইরে তাদের দরকার আরও অন্তত ১০ নির্বাচিত সদস্যের সমর্থন।
কংগ্রেস পার্টি যদিও এগিয়ে এসেছে। হাত মার্কার কংগ্রেস হাত বাড়িয়েছে টিভিকে এবং বিজয়ের দিকে। কিন্তু এখানেও সেই টুইস্ট। বিজয়ের হাত ধরার আগে কংগ্রেস তাদের দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী ডিএমকে’র হাত ছেড়েছে। যাদের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে সদ্য শেষ হওয়া নির্বাচনও করেছে কংগ্রেস। অনেকে ভেবেছিল কংগ্রেসের পক্ষে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন। কারণ জাতীয় রাজনীতিতে ডিএমকে, কংগ্রেসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সঙ্গী। ভারতের লোকসভায় তাদের আসন সংখ্যা ২২। যাদের সমর্থন জাতীয় রাজনীতির প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া ডিএমকে কংগ্রেস নেতৃত্বধীন ইন্ডিয়া জোটের বড় দলগুলোর একটি। কংগ্রেস যদি তামিলনাড়ুতে ডিএমকে নেতৃত্বাধীন জোট থেকে বেরিয়ে যায় তাহলে জাতীয় পর্যায়ে নিশ্চিতভাবে কংগ্রেসের জোট ছাড়বে ডিএমকে। এই ঝুঁকি মাথায় রেখেও বিজয়ের টিভিকে পার্টিকে সমর্থন করেছে কংগ্রেস। কারণ তামিলনাড়ু তথা দ্রাবিড়িয়ান রাজনৈতিক সংস্কৃতি অনুযায়ী দীর্ঘদিন ডিএমকে জোটে থাকলেও কখনো রাজ্যটিতে ক্ষমতার ভাগ পায়নি কংগ্রেস। জোট ক্ষমতায় এসেছে কিন্তু এককভাবে রাজ্য পরিচালনা করেছে ডিএমকে। বরাবর ক্ষমতার বাইরে থাকতে হয়েছে কংগ্রেসকে। এ নিয়ে তামিলনাড়ুর কংগ্রেস নেতা-কর্মীদের মধ্যে হতাশা আর ক্ষোভ ছিল। ফলে টিভিকে যখন প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির বাইরে এসে কংগ্রেসকে ক্ষমতার অংশীদার করার নিশ্চয়তা দিয়েছে তখন কংগ্রেস এই রাজনৈতিক ঝুঁকিটা নিয়েছে। তবে কংগ্রেসও পাল্টা কিছু শর্ত দিয়েছে বিজয়ের দলকে। যার মধ্যে প্রধান শর্ত হচ্ছে টিভিকে নেতৃত্বাধীন নতুন জোট ও সরকারে বিজেপি তথা কোনো কমিউনাল দলকে জায়গা দেয়া যাবেনা।
বিজয়ের দল কংগ্রেসের শর্ত মেনে নেয়। কিন্তু টুইস্ট শেষ হয়না। কারণ- সেই ম্যাজিক নাম্বার। ১১৮। কংগ্রেসের হাতে আছে ৫। অর্থাৎ তারা জিতেছে ৫টি আসনে। ফলে টিভিকে এবং কংগ্রেস মিলে সংখ্যাটা দাঁড়ায় ১১৩। ১১৮ তে পৌঁছাতে দরকার আরও ৫। ওদিকে তামিলনাড়ুর রাজ্যপাল যিনি সাবেক বিজেপি নেতা তিনি বিজয়কে সাফ জানিয়ে দেন, ১১৮ জন নির্বাচিত সদস্যের স্বাক্ষর নিয়ে আসতে হবে তাকে। নতুবা মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি বিজয়কে শপথ পড়াবেন না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অবশ্য বলছেন, রাজ্যপালকে দিয়ে করা এই টুইস্টটি মূলত বিজেপির দিক থেকে এসেছে। কারণ রাজ্যপাল এভাবে বলতে পারেন না। ভারতের সংবিধান অনুযায়ী রাজ্যপাল নির্বাচনের পর সিঙ্গেল লার্জেস্ট পার্টি অর্থাৎ যে দল সবচেয়ে বেশি আসনে জয়লাভ করে তাদেরকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানান। এটাই রীতি। সিঙ্গেল লার্জেস্ট পার্টি যদি ম্যাজিক নাম্বার থেকে পিছিয়ে থাকে তাহলে তাদের ফ্লোর টেস্টের মুখোমুখি হয়ে নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে হয়। কিন্তু বিজয় এবং তার দলকে সেই সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। বলা হচ্ছে, শপথের আগেই মেজরিটি প্রমাণ করতে হবে।
ফলে তামিলনাড়ুতে নতুন সরকার গঠন নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। আর সেই অনিশ্চয়তা জন্ম দিয়েছে নতুন আরেক টুইস্টের। বিজয় এবং তার দলকে ঠেকাতে নিজেদের মধ্যে আলোচনা শুরু করে ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে। যারা তামিলনাড়ুর রাজনীতির দুই চিরপ্রতিদ্বন্দী। তবে চির বৈরিতা ভুলে ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে এক হলেও সমস্যার সমাধান হয়না। এখানেও সেই ম্যাজিক নাম্বার। এই দুই দলের মিলিত আসনসংখ্যা ১০৬। তাদেরও জোগার করতে হবে আর ১২ সদস্যের সমর্থন।
ফলে ম্যাজিক নাম্বার ছুঁতে নির্বাচন পরবর্তী তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে চলছে টুইস্ট এবং পাল্টা টুইস্টের খেলা। প্রতি মুহুর্তে বদলাচ্ছে পরিস্থিতি। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বিজয় থালাপতির শপথের জন্য তারিখ ও ভেন্যু সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিল। কিন্তু থমকে আছে সব।
তাহলে শেষ পর্যন্ত কি হবে? বিজয় কী পারবেন ম্যাজিক নাম্বার ছুঁতে?
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা অবশ্য আশাবাদী। তারা বলছেন, তাকে আটকানোর নানা ধরণের চেষ্টা হলেও তা হয়তো ‘শপথের’ সময়টাকেই পেছাতে পারবে শুধু। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জয়টা বিজয়েরই হবে।
বাংলা টেলিগ্রাফ ভিজ্যুয়াল









































