
হু শিক্ষার্থী নির্ধারিত শ্রেণি শেষ করলেও প্রত্যাশিত শিখনযোগ্যতা অর্জন করতে পারছে না
বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষাখাত দীর্ঘদিন ধরে পরিমানগত অগ্রগতির এক আশাব্যঞ্জক চিত্র তুলে ধরছে। বিদ্যালয়ে ভর্তি বৃদ্ধি, লিঙ্গসমতা, বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের মতো সূচকগুলোতে সাফল্য দৃশ্যমান। তবে এখন যে প্রশ্নটি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, তা হলো- এই অগ্রগতি কি শিশুদের প্রকৃত শেখার মানে প্রতিফলিত হচ্ছে?
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মূল্যায়নের ফলাফল ইঙ্গিত দেয়, বহু শিক্ষার্থী নির্ধারিত শ্রেণি শেষ করলেও প্রত্যাশিত শিখনযোগ্যতা অর্জন করতে পারছে না। এই বাস্তবতায় প্রাথমিক শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক দলিল- বার্ষিক পাঠ-পরিকল্পনা (Annual Lesson Plan)- নতুন করে পর্যালোচনার দাবি রাখে।
বার্ষিক পাঠ-পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। এটি সারা বছরের পাঠদানকে কাঠামোবদ্ধ করে, শ্রেণি ও বিষয়, পাঠভিত্তিক সময় বণ্টন নির্ধারণ করে এবং মূল্যায়নের সঙ্গে পাঠের সংযোগ ঘটায়। নীতিগতভাবে এটি একটি শক্তিশালী ও প্রয়োজনীয় দলিল। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই পরিকল্পনা অনেক সময় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর জন্য সহায়ক নির্দেশনার চেয়ে একটি চাপের কাঠামো হয়ে ওঠে।

একটি সাধারণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের শিখনস্তরের বৈচিত্র্য অত্যন্ত স্পষ্ট। কেউ সাবলীলভাবে পড়তে পারে, কেউ পড়তে শিখছে, আবার কেউ এখনো ধ্বনি উচ্চারণ ও বর্ণ চেনার পর্যায়ে রয়েছে। অথচ বিদ্যমান বার্ষিক পাঠ-পরিকল্পনা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ধরে নেয়- সব শিক্ষার্থী একই গতিতে শিখবে এবং নির্ধারিত সময়ে একই পাঠ শেষ করবে। এই ধারণাগত অসামঞ্জস্যের ফল হিসেবে শিক্ষকরা প্রায়ই “পাঠ শেষ করা”-কে অগ্রাধিকার দেন, “শেখা নিশ্চিত করা” পিছিয়ে পড়ে।
নীতিনির্ধারণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- বার্ষিক পাঠ-পরিকল্পনা প্রণয়নে মাঠপর্যায়ের শিক্ষকদের অংশগ্রহণ সীমিত। শিক্ষকরা মূলত পরিকল্পনার বাস্তবায়নকারীর ভূমিকায় থাকেন, পরিকল্পনার সহ-নির্মাতা হিসেবে নন। ফলে পরিকল্পনায় বিদ্যালয়ের বাস্তবতা, শ্রেণিকক্ষের চ্যালেঞ্জ কিংবা শিক্ষার্থীদের সামাজিক-মানসিক প্রেক্ষাপট পর্যাপ্তভাবে প্রতিফলিত হয় না।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় একজন শিক্ষককে প্রায়ই একাধিক শ্রেণিতে ও একাধিক বিষয় পড়াতে হয়। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক বৈচিত্র, বড় ক্লাস সাইজ, সহশিক্ষক সংকট, শিক্ষকের দক্ষতা ও যোগ্যতার বৈচিত্র, প্রশাসনিক দায়িত্ব, প্রশিক্ষণের সীমাবদ্ধতা, শিক্ষার্থীদের শিখনগত বৈচিত্র্য এবং স্থানীয় প্রেক্ষাপট- সব মিলিয়ে নির্ধারিত পাঠ-পরিকল্পনা অনেক সময় “লক্ষ্য” হিসেবেই থেকে যায়, “বাস্তব চর্চা” হয়ে ওঠে না। এর ফলে পাঠ শেষ হয়, কিন্তু শেখা অসম্পূর্ণ থেকে যায়; মূল্যায়ন হয়, কিন্তু প্রকৃত সক্ষমতা প্রতিফলিত হয় না।
শিক্ষক প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। প্রশিক্ষণগুলো প্রায়শই নির্দেশনামূলক- “এভাবে পড়াবেন” – কিন্তু “কেন, কখন এবং কীভাবে পাঠ-পরিকল্পনা অভিযোজন করবেন”- সে দক্ষতা গড়ে ওঠে না। ফলে বার্ষিক পাঠ-পরিকল্পনা একটি নমনীয় একাডেমিক দলিল না হয়ে অনেক সময় বাধ্যতামূলক চেকলিস্টে পরিণত হয়।
এই প্রেক্ষাপটে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে বার্ষিক পাঠ-পরিকল্পনাকে কার্যকর করতে নীতিনির্ধারকদের জন্য কয়েকটি সুস্পষ্ট বিষয় বিশেষভাবে বিবেচনা করা জরুরি।
প্রথমত, বার্ষিক পাঠ-পরিকল্পনাকে কঠোর সময়সূচি নয়, নমনীয় একাডেমিক কাঠামো হিসেবে পুনর্গঠন করতে হবে। নির্ধারিত শিখনফল থাকবে, কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পথ শিক্ষক বাস্তবতা অনুযায়ী সামঞ্জস্য করতে পারবেন- এই সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, শ্রেণিভিত্তিক পরিকল্পনার পাশাপাশি শিখনস্তরভিত্তিক (learning level based) নির্দেশনা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এতে শিক্ষকরা বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীর জন্য উপযুক্ত কৌশল বেছে নিতে পারেন। শিক্ষকরা বুঝতে পারবেন, কোন শিক্ষার্থী কোন স্তরে রয়েছে এবং কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, শিক্ষক প্রশিক্ষণে গুণগত পরিবর্তন আনতে হবে। পাঠ-পরিকল্পনা “অনুসরণ” নয়, বরং “ব্যবহার ও অভিযোজন (use and adaptation)”- এই পেশাগত দক্ষতা গড়ে তোলাই হওয়া উচিত প্রশিক্ষণের মূল লক্ষ্য।
চতুর্থত, একাডেমিক তদারকি ও মূল্যায়ন ব্যবস্থাকে নিরবচ্ছিন্ন ও পেশাগত সহায়তামূলক করতে হবে। পরিদর্শনের মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত- শিশুরা কতটা শিখছে- সিলেবাস কতটা শেষ হয়েছে, সেই প্রশ্ন নয়।
বার্ষিক পাঠ-পরিকল্পনা প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে- যদি তা শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতার সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। কেবল কাগজে সুন্দর পরিকল্পনা নয়, শিক্ষার্থীকে শেখাতে পারাই হওয়া উচিত প্রকৃত সাফল্যের মানদণ্ড। পরিকল্পনা তখনই কার্যকর হবে, যখন তা শিক্ষককে সীমাবদ্ধ না করে ক্ষমতায়িত করবে এবং প্রতিটি শিশুর শেখার সুযোগ নিশ্চিত করবে।
প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে হলে পরিকল্পনা ও বাস্তবতার মধ্যে সেতুবন্ধন জরুরি। বাংলাদেশ যদি মানসম্মত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে চায়, তবে বার্ষিক পাঠ-পরিকল্পনাকে কেবল প্রশাসনিক দলিল হিসেবে দেখার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। শিক্ষার্থীকে কেন্দ্রে রেখে শিক্ষককে আস্থা দেওয়া ও নীতিগত নমনীয়তাই হতে পারে বার্ষিক পাঠ-পরিকল্পনাকে কার্যকর করার সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ ও টেকসই সমাধানের মূল চাবিকাঠি।
মোহাম্মদ কামরুজ্জামান কালাম: এডুকেশন লিড, ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ।











































