মঙ্গলবার । এপ্রিল ১৪, ২০২৬
মোহাম্মদ কামরুজ্জামান কালাম মতামত ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ৬:১১ অপরাহ্ন
শেয়ার

প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি: লটারি, পরীক্ষা নাকি ন্যায্যতা?


kalam bhai edu

আমাদের মনে রাখতে হবে, শিক্ষা একটি অধিকার- কোনো পুরস্কার নয়

সকালের ব্যস্ত সময়। একটি ছোট শিশু তার অভিভাবকের সঙ্গে ভর্তি পরীক্ষার জন্য যাচ্ছে। তার হাতে বই, মনে চাপ, চোখে অনিশ্চয়তা। এই দৃশ্যটি আমাদের কাছে পরিচিত- কিন্তু প্রশ্ন হলো, এটি কি স্বাভাবিক হওয়া উচিত?

বাংলাদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি- বিশেষ করে প্রথম শ্রেণিতে- শুধু একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়, এটি শিক্ষাব্যবস্থার ন্যায্যতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদ্যালয়ে লটারিভিত্তিক ভর্তি চালু হওয়ায় স্বচ্ছতা ও সমতার একটি নতুন দিগন্ত তৈরি হযেছে। তবে একই সঙ্গে এটি নিয়ে কিছু বিতর্কও তৈরি হয়েছে- ভর্তি পরীক্ষার বদলে লটারি কি যথার্থ সমাধান?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমেই আমাদের শিক্ষা দর্শনের মূল ভিত্তিতে ফিরে যেতে হবে। একটি শিশু বিদ্যালয়ে আসে শেখার জন্য; সে শিক্ষিত হয়ে আসে না। চার থেকে ছয় বছর বয়সী একটি শিশুর জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত আনন্দময় শেখা, অনুসন্ধান ও বিকাশ। এই বাস্তবতায় ছয় বছর বয়সী শিশুকে ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে বাছাই করা শিক্ষার মৌলিক উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কিন্তু আমরা সেই সময়টিকে প্রতিযোগিতার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছি। ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে আমরা আসলে শিশুর মেধা নয়, তার পরিবেশ ও সুবিধাকে মূল্যায়ন করছি।

বর্তমান বাস্তবতায় ভর্তি পরীক্ষা মূলত শিশুর সম্ভাবনাকে নয়, বরং তার পারিবারিক ও সামাজিক অবস্থানকে মূল্যায়ন করে। শহরের একটি শিশুর জন্য কোচিং, টিউটর ও শিক্ষিত পরিবেশ সহজলভ্য; অন্যদিকে প্রান্তিক অঞ্চলের শিশু সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত। ফলে ভর্তি পরীক্ষা একটি সমান প্রতিযোগিতা তৈরি করে না, বরং বৈষম্যকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।

এই প্রেক্ষাপটে প্রথম শ্রেণিতে লটারিভিত্তিক ভর্তি একটি তুলনামূলকভাবে ন্যায্য পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এটি অন্তত শিশুকে শুরুতেই প্রতিযোগিতার চাপে ফেলে না; সকল শিশুর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করে এবং ভর্তি প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ করে। তবে লটারির সীমাবদ্ধতাও অস্বীকার করা যায় না- এটি শিক্ষার্থীর প্রস্তুতি বা বিদ্যালয়ের সক্ষমতার সঙ্গে সবসময় সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না। তাই লটারির সঙ্গে আরও কিছু বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ যুক্ত করা জরুরি- যেমন স্থানীয় শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার এবং পরবর্তী শ্রেণিতে ধীরে ধীরে দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়ন।

আমাদের মনে রাখতে হবে, শিক্ষা একটি অধিকার- কোনো পুরস্কার নয়। এটি অর্জন করতে প্রতিযোগিতার প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন সুযোগের সমতা। যদি আমরা সত্যিই শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষা চাই, তাহলে ভর্তি প্রক্রিয়াতেই সেই পরিবর্তন আনতে হবে। কারণ শিক্ষার শুরুটাই যদি সঠিক না হয়, তাহলে শেষটাও কাঙ্ক্ষিত হবে না। তাই একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতির প্রয়োজন। প্রথম শ্রেণিতে লটারিভিত্তিক ভর্তি বজায় রেখে দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে সীমিত ও শিশুবান্ধব মূল্যায়ন চালু করা যেতে পারে। এই পর্যায়ে শিশুরা মৌলিক সাক্ষরতা ও সংখ্যাজ্ঞান অর্জনের সুযোগ পায়, ফলে মূল্যায়ন তুলনামূলকভাবে বেশি অর্থবহ হয়। তবে এই মূল্যায়ন অবশ্যই চাপমুক্ত ও দক্ষতাভিত্তিক হতে হবে।

ভারসাম্যপূর্ণ নীতির পাশাপাশি ক্যাচমেন্ট এরিয়া ভিত্তিক ভর্তি নীতি প্রবর্তন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কমপক্ষে ৫০-৬০ শতাংশ আসন স্থানীয় শিক্ষার্থীদের জন্য সংরক্ষণ করলে একদিকে যেমন স্থানীয় শিশুদের অধিকার নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে বিদ্যালয় ও সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি স্বাভাবিক সংযোগ তৈরি হবে।

সবশেষে, ভর্তি প্রক্রিয়াকে শিক্ষার অন্তরায় নয়, বরং প্রবেশদ্বার হিসেবে দেখতে হবে। ন্যায্যতা, সমতা ও শিশুকেন্দ্রিকতা- এই তিনটি নীতির সমন্বয়েই একটি কার্যকর ভর্তি ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।

মোহাম্মদ কামরুজ্জামান কালাম: এডুকেশন লিড, ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ। ব্যাচেলর অব অনার্স, এমএড, এমফিল ইন এডুকেশন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ভিডিও স্টোরি >>>