cosmetics-ad

সোনার হরিণের খোঁজে ওমান, মেলেনি ছাইও

oman-kausar

‘সাড়ে ৪ লাখ টাকা খরচ করে ওমান এসেছি। ভেবেছিলাম, পরিবারকে সুখের মুখ দেখাব। উন্নত জীবন যাপন করব। ছেলে-মেয়েকে ভালো স্কুলে লেখাপড়া করাব। তাই শতকষ্টে টাকা-পয়সা জোগাড় করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওমান পাড়ি দিলাম। কিন্তু এখানে এসে হতাশা ছাড়া কিছুই দেখছি না। সোনার হরিণের খোঁজে এসে ছাইও মেলছে না’।

আবেগাপ্লুত হয়ে ফ্রি ভিসায় যাওয়া মাস্কাটের হামরিয়া থেকে কাউসার নামে এক প্রবাসী এসব বলেন। তিনি বলেন, ‘আমার মতো অনেক বাংলাদেশি অপেক্ষার প্রহর গুনছেন আউট পাশের জন্য। আবার অনেকেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ওমান থেকে পালিয়ে দুবাই হয়ে দেশে চলে যাচ্ছেন। ওমানের বৈধ কাগজপত্র না থাকায় অনেকেই কাজ করতে পারছে না। কাজহীন বেকার জীবন কাটাচ্ছে হাজারও ওমান প্রবাসী। ফ্রি ভিসা মানে একধরণের প্রতারণা সেটা বিদেশ এসে বুঝলাম’।

দেশটিতে বিনা বেতনে ৫ মাস ধরে কাজ করছেন এমন এক ভুক্তভোগী কামরুল হাসান। তিনি বলেন, দীর্ঘ ৬ মাস যাবত কাজ করেও বেতন দিচ্ছে না কোম্পানি, অভিযোগ দিলে উল্টো দেশে পাঠিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। দীর্ঘদিন বেতন না দেওয়ার কারণে ওই কোম্পানি থেকে অনেক বাংলাদেশি শ্রমিক না খেয়ে দিন পার করছে। কোম্পানির দোষে অবৈধ হলেও এখন তাদের দেশে যাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

একদিকে বাংলাদেশ থেকে পরিবারের চাপ, আবার ব্যাংক ঋণের চাপ, অপরদিকে কাজহীন বেকার জীবন, সবমিলিয়ে হতাশায় আর দুশ্চিন্তায় নানা রোগে ভোগে অনেকেই অকালে মারাও যাচ্ছে।

প্রতিদিনই শতশত ওমান প্রবাসী আউট পাশের বিষয়ে জানতে চাচ্ছেন। আবার অনেককেই আউট পাশ দিয়েছে এমন গুজব ছড়াচ্ছেন প্রবাসীদের মাঝে। তবে ওমান সরকার থেকে আউট পাশ দেয়া হয়নি বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ দূতাবাস। এমনকি কবে নাগাদ এমন ঘোষণা দেয়া হবে তাও বলতে পারছে না দূতাবাস।

এ ব্যাপারে ওমানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত গোলাম সরওয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘এখনও আউট পাশের বিষয়ে কোনো কিছু জানায়নি ওমান সরকার। দেশটির সরকার যখন জানাবে আমরাও বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশ করব’।

এদিকে ওমান দূতাবাসের সামনে আউট পাশের জন্য হাজার হাজার প্রবাসী বাংলাদেশি অপেক্ষার প্রহর গুনছে। দীর্ঘদিন পরিবার পরিজন ছেড়ে দূর প্রবাসে আর থাকতে চান না তারা। একেকটা রাত তাদের জন্য একেকটা বছরের মতো পার হচ্ছে। এমনই নিদারুণ কষ্টে দিন পার করছে ওমানের বৈধতা না থাকা হাজারও বাংলাদেশি।

না বুঝে দালালের প্ররোচণায় ফ্রি ভিসায় ওমানে এসে এমন বিপাকে পড়েছেন বেশিরভাগ বাংলাদেশি শ্রমিক। বাস্তবে ফ্রি ভিসার অস্তিত্ব না থাকলেও এই ভিসার নাম করে মধ্যপ্রাচ্যসহ কয়েকটি দেশে শ্রমিক পাঠানো হচ্ছে।

বৈধ ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিট না থাকায় এসব দেশে গিয়ে কোনো কাজ পাচ্ছেন না শ্রমিকেরা। ফলে প্রবাসে অমানবিক জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন।

বৈধ কাগজ না থাকায় ওমান থেকে কয়েক হাজার প্রবাসী বাংলাদেশি দেশেও আসতে পারছে না। এমনকি পরিবার-পরিজনের কেউ মারা গেলেও শেষবারের মতো প্রিয়জনের মুখটি পর্যন্ত দেখতে পারছে না।

কথা হয় মাস্কাটে থাকা প্রবাসী রাশেদের সঙ্গে। তিনি বলেন, ভাগ্য বদলের আশায় চার বছর আগে মরুর দেশ ওমানে আসি। দালালদের প্ররোচণায় ভিটেমাটি বিক্রি করে দেশটিতে এসে প্রতারণায় শিকার হই। চল্লিশ হাজার টাকা বেতনে চাকরির কথা বলে ওমানে এনে দিতে পারেনি কোনো কাজ। অবৈধভাবে ফ্রি ভিসায় এসে এখন পথে পথে ঘুরছি। না পাচ্ছি কোনো কাজ না হচ্ছে বাড়ি যাওয়া।

জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে সুনির্দিষ্ট কাজের চুক্তির মাধ্যমে ভিসা ইস্যু হয়। অনেক ক্ষেত্রে ভিসার সব খরচ নিয়োগদানকারী সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বহন করে। ফ্রি ভিসা বলে কিছু না থাকলেও মূলত কিছু অসাধু বাংলাদেশি স্থানীয়দের যোগসাজশে ফ্রি ভিসার নামে প্রতারণা পদ্ধতি চালু করেছে। ফলে সাধারণ শ্রমিক তার সর্বস্ব বিক্রি করে বিদেশে গিয়ে কাজ না পেয়ে অসহায়ত্বের মধ্যে পড়েন। এমনকি জেল জরিমানার ফাঁদে পড়েন।

বাইজিদ আল হাসান