জাপানের শীর্ষ ধনী মাসাইয়োশি সন

প্রতিবেশীদের ফেলে দেয়া খাবার কুড়িয়ে ছোটবেলায় গবাদি পশুকে খাওয়াতেন মাসাইয়োশি সন। তবে তিনি এখন জাপানের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি। ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ব্যবসাজগতের যেসব মানুষ তার সঙ্গে সবার আগে সাক্ষাত্ করেছিলেন, তাদের একজন ছিলেন এ বিজনেস টাইকুন। বৃহস্পতিবার সনের প্রতিষ্ঠিত টেলিকম জায়ান্ট সফটব্যাংক যুক্তরাষ্ট্রের রাইডশেয়ারিং জায়ান্ট উবারের একটি বড় অংশ কেনার ঘোষণা দিয়েছে। তবে এটিই সনের এ রকম বড় উদ্যোগ নয়, এর আগে তিনি চাইনিজ ই-কমার্স জায়ান্ট আলিবাবা ও ফ্রান্সের রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান আলডেবারানের সঙ্গে বিশাল আকারের চুক্তি করেছেন। খবর এএফপি।

ফোর্বসের হিসাবমতে, ৬০ বছর বয়সী সন জাপানের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি এবং তার সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ২২০ কোটি ডলার। সনের নেতৃত্বে সফটব্যাংক টেক স্টার্টআপদের জন্য ভিশন ফান্ড নামে ১০ হাজার কোটি ডলারের একটি সুবিশাল তহবিল গড়ে তুলেছে, যা গোটা টেক দুনিয়াকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে।

ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর সন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে ৫ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ এবং ৫০ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টির আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন। বৃহস্পতিবার সফটব্যাংক ও উবারের মধ্যে হওয়া চুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন জানান, সনের কোম্পানি উবারের ১৫ শতাংশ শেয়ারের মালিক হচ্ছে।

জাপানের কাইউশু দ্বীপে ১৯৫৭ সালে এক কোরীয় পরিবারে জন্ম নেন সন। হাঁস-মুরগি ও শূকর লালনপালন করে তার পরিবার আয়-রোজগার করত। কোরিয়া উপদ্বীপ জাপান ১৯১০ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত দখলের পর দেশটিতে কোরীয়রা দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্যের শিকার হয়েছে।

একটি ব্যবসায়িক অ্যাওয়ার্ড নিতে গিয়ে ১৯৯৬ সালে সন বলেছিলেন, ‘আমি ছোটবেলায় এত শুকনা ছিলাম যে, সবসময় অসুস্থ বোধ করতাম। আমি একটা ঠেলাগাড়িতে বসে থাকতাম আর আমার দাদি, যিনি এখন আর বেঁচে নেই, তিনি সেটা ঠেলতেন। আমরা প্রতিবেশীদের ফেলে দেয়া খাবার কুড়িয়ে গবাদি পশুদের খাওয়াতাম। আমরা কঠোর পরিশ্রম করতাম।’

সন ১৬ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রে যান। পরে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়াতে পড়াশোনা করেন এবং সেখান থেকেই তার ব্যবসায়িক জীবন শুরু করেন।

তার প্রথম সাফল্য আসে যখন তিনি ইংরেজি থেকে জাপানি ভাষায় অনুবাদ করার একটি কম্পিউটার ব্যবস্থা উদ্ভাবন করেন। পরে তিনি সেটিকে শার্পের কাছে ১০ লাখ ডলারে বিক্রি করেন।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে আসার এক বছর পর ১৯৮১ সালে তিনি সফটওয়্যারের পাইকারি বিক্রেতা ও কম্পিউটার ম্যাগাজিনের প্রকাশক হিসেবে সফটব্যাংকের সূচনা করেন। তবে সফটব্যাংক নিয়মিত পত্রিকার পাতায় শিরোনামে জায়গা করে নেয় ১৯৯৪ সালে পাবলিক লিমিটেড হওয়ার পর থেকে। কোম্পানিটি জাপানি ও বিদেশী ব্যবসা অধিগ্রহণ করার বেলায় যে অতি আগ্রাসী নীতি গ্রহণ করেছিল, তা জাপানের অটল করপোরেট জগত্ টলিয়ে দিয়েছিল।

একসময় কোম্পানিটি ছিল ইয়াহুর সর্বোচ্চ শেয়ারহোল্ডার। জাপানজুড়ে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট বিস্তারের কৃতিত্ব এ কোম্পানিটিকেই দেয়া হয়।

১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকে সফটব্যাংক পিসি ম্যাগাজিনসহ অন্যান্য কম্পিউটার ম্যাগাজিনের প্রকাশক জিফ-ডেভিস কমিউনিকেশনস, চিপ নির্মাতা কিংস্টন টেকনোলজিস এবং কনফারেন্স আয়োজক ইন্টারফেস ও কমডেক্স কিনে পরে, আবার বিক্রি করে দেন।

সাশ্রয়ী সেবা প্রদানের মাধ্যমে সফটব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে বাজারে আধিপত্য বিস্তার করা এনটিটি ডকোমো ও এর ক্ষুদ্র প্রতিদ্বন্দ্বী কেডিডিআইকে ধাক্কা দেয় এবং জাপানে অ্যাপলের আইফোন আমদানি শুরু করে। এখন অবশ্য জাপানে ব্যাপক সফল হওয়া আইফোনের মনোপলি না থাকলেও সফটব্যাংক মোবাইল জাপানের তৃতীয় বৃহত্তম মোবাইল ক্যারিয়ার। বিশেষত শহুরে জাপানিদের কাছে সফটব্যাংক অত্যন্ত জনপ্রিয়। ম্যাকোয়ারি ব্যাংকের এক বিশ্লেষক ডেভিড গিবসন সন সম্পর্কে এএফপিকে বলেন, তিনি একটি অস্বাভাবিক চরিত্র। অন্য অনেক বিনিয়োগকারী থেকে তার দীর্ঘমেয়াদি দূরদৃষ্টি আছে।

ফুকোশিমার পারমাণবিক বিপর্যয়ের পর পরমাণু শক্তির বদলে নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন বিদ্যুত্ উত্পাদনে বিকল্পের খোঁজে থাকা জাপানে সৌরবিদ্যুত্ উত্পাদনের প্রকল্পও হাতে নিয়েছেন সন। ট্রাম্পের এই ভালো বন্ধু ট্রাম্পের মতোই টুইটারে ভীষণ জনপ্রিয়। নিউক্লিয়ার সংকটের সময়ে নিউক্লিয়ার জ্বালানির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে তিনি তুমুল জনপ্রিয়তা পান। চুল পড়ে যাওয়া বিষয়ে টুইটারে এক প্রশ্নের জবাবে টাক মাথার সন বলেছিলেন, ‘আমার চুল কমছে না, আমি সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।’