sentbe-top

গবেষণায় কোরিয়া সামনের সারিতে

সিউল, ২৬ ফেব্রুয়ারী, ২০১৪:

মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ-আল-ওয়াদুদ (সুজন)। হানগুক ইউনিভার্সিটি অব ফরেন স্টাডিজের এসোসিয়েট প্রফেসর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কমপিউটার বিজ্ঞান বিভাগ থেকে প্রথম শ্রেণীতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেন। লেকচারার হিসেবে কাজ করেন ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটি ও ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে। পরবর্তীতে কোরিয়ান সরকারের আইআইটিএ স্কলারশীপ নিয়ে কিয়ংহি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি সম্পন্ন করে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন কোরিয়ার বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় হানগুক ইউনিভার্সিটি অব ফরেন স্টাডিজে। কোরিয়ায় বাংলাদেশী ছাত্রছাত্রীদের জন্য উন্নয়নমূলক কাজ, বাংলাদেশ কোরিয়ার সম্পর্ক উন্নয়নসহ বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডেও নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন তিনি। দীর্ঘদিন তিনি কোরিয়া-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারী ফ্রেন্ডশীপ এ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যানদের একজন ছিলেন। পাশাপাশি তিনি সদ্য গঠিত বাংলাদেশ কমিউনিটি ইন কোরিয়া’র নির্বাহী কমিটিরও একজন সদস্য।

986756_10152684456940715_593120449_nকোরিয়ায় উচ্চশিক্ষা, কোরিয়ার গবেষণা এবং কোরিয়ার শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে বাংলা টেলিগ্রাফকে দেওয়া ওয়াদুদ সুজনের একান্ত সাক্ষাৎকার তুলে ধরা হল।

বাংলা টেলিগ্রাফঃ দীর্ঘদিন ধরে কোরিয়ায় আছেন? প্রথমদিকে যখন কোরিয়া আসেন তখনকার আর এখনকার মধ্যে পার্থক্য কি?

ওয়াদুদ সুজনঃ অনেকদিন হয়ে গেল কোরিয়াতে। আমরা যে সময়ে এসেছিলাম তখনকার চেয়ে এখন সবদিক দিয়েই অনেক ভাল। বিদেশীদের জন্য কোরিয়ার প্রধান সমস্যা ভাষা। তবে ইংরেজী বলা কোরিয়ানের সংখ্যা এখন আগের চেয়ে বেশি। ফলে কোথাও সমস্যায় পড়লে এখন সহযোগিতা পেতে বেশি সমস্যা হয় না।

বাংলা টেলিগ্রাফঃ কোরিয়ায় বাংলাদেশী ছাত্রছাত্রীদের বর্তমান অবস্থান কেমন?

ওয়াদুদ সুজনঃ ২০০৫ সালের দিকে কোরিয়াতে বাংলাদেশী ছাত্রছাত্রী ছিল বড়জোর এক-দেড়শ। এখন পাঁচ শতাধিক ছাত্রছাত্রী পড়াশোনা করছেন। প্রতি সেমিস্টারেই নতুন ছাত্রছাত্রী আসছেন। গবেষণায় বাংলাদেশী ছাত্রছাত্রীরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। অনেক প্রফেসরই বাংলাদেশি ছাত্রছাত্রীদের ব্যাপারে বেশ ভাল আগ্রহী।

বাংলা টেলিগ্রাফঃ পড়াশোনা শেষে কি চাকরি পাচ্ছেন?

ওয়াদুদ সুজনঃ এখন কোরিয়াতে বিদেশী ছাত্রছাত্রীদের চাহিদা বাড়ছে। পাশ করে অনেকেই কোরিয়াতেই চাকরি পাচ্ছেন। আবার অনেকেই উচ্চশিক্ষা বা চাকরির জন্য অন্য দেশে পাড়ি দিচ্ছেন। সবমিলিয়ে চাকরির বাজার ভালই বলব।

বাংলা টেলিগ্রাফঃ কোরিয়ায় পড়াশোনা শেষে চাকরির ক্ষেত্রে কোরিয়ান ভাষা কি একটা বড় বাধা?

ওয়াদুদ সুজনঃ সায়েন্স, ইঞ্জিনিয়ারিং এর ক্ষেত্রে এখন কোরিয়ান ভাষা খুব বড় বাধা নয়। প্রায় সব কাজ ল্যাব এবং কম্পিউটারে হওয়ায় ভাল কোরিয়ান জানা ছাড়াই অনেকেই চাকরি পাচ্ছেন। তবে অন্যান্য বিষয়ের ছাত্রছাত্রীদের জন্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কোরিয়ান ভাষা জানা আবশ্যক।

আমার ব্যক্তিগত পরামর্শ হল, যারা এখানে পড়তে আসেন কমবেশি সবাই দুই থেকে চার-পাঁচ বছর থাকেন। এই সময়ে যদি প্রতি সপ্তাহে অন্তত দুই এক ঘন্টা করে সময় দেন, তাহলেই একটি চলনসই পর্যায়ের কোরিয়ান ভাষা শিখে নিতে পারেন। এখানে চাকরি করলেতো ভাষাটা লাগবেই। চাকরি করার ইচ্ছা না থাকলেও কোরিয়ানের মত একটি ভাষায় দখল থাকা অবশ্যই ইতিবাচক।

বাংলা টেলিগ্রাফঃ কোরিয়ান প্রফেসরদের নিয়ে অনেকেরই অভিযোগ আছে। বিশেষ করে চুক্তি অনুযায়ী টাকা না দেওয়ার বিষয়ে।

ওয়াদুদ সুজনঃ এই ব্যাপারটায় একটু সতর্ক থাকতে হবে। কোরিয়ার সব প্রফেসর এই রকম না হলেও কিছু প্রফেসর ছাত্রছাত্রীদের চুক্তি অনুযায়ী টাকা দেননা। তবে দিনদিন পরিস্থিতি ভাল হচ্ছে। এই ধরণের কথা না রাখা প্রফেসরের সংখ্যা কমছে। বাংলাদেশী ছাত্রছাত্রীদের আমি বলব, কোরিয়াতে আসার আগে সংশ্লিষ্ট প্রফেসরের ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে আসার চেষ্টা করবেন। এখন প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়েই (অন্তত সব এলাকায়) বাংলাদেশী ছাত্রছাত্রী আছেন। তাদের কাছ থেকে খোঁজ নেয়া যেতে পারে।

বাংলা টেলিগ্রাফঃ বাংলাদেশী ছাত্রছাত্রীদের কোরিয়াতে স্কলারশীপ নিয়ে পড়ার সুযোগ কেমন? কিভাবে স্কলারশীপের জন্য আবেদন করবে?

ওয়াদুদ সুজনঃ কোরিয়ান সরকারের বিভিন্ন বৃত্তি নিয়ে কোরিয়ায় পড়াশোনা করার সুযোগ আছে। তবে সবচেয়ে বেশি ছাত্রছাত্রী আসেন প্রফেসরদের মাধ্যমে। আবেদন করার জন্য কোন প্রফেসরকে সুপারভাইজার হিসেবে রাজি করানোটাই আসল। সেই লক্ষ্যে সরাসরি প্রফেসরকেই-মেইল করা যেতে পারে অথবা কোন বাংলাদেশী ছাত্রের সাহায্য নেয়া যেতে পারে। কোন ছাত্রের ব্যাপারে আগ্রহী হলে সাধারণত প্রফেসর নিজে অথবা তাঁর ল্যাবের অন্য কোন ছাত্র আবেদন করার প্রক্রিয়ায় সহায়তা করেন।

এক্ষেত্রে বাংলাদেশী ছাত্রছাত্রীরা যদি তাদের নিজেদের ল্যাব বা পরিচিত অন্যান্য ল্যাবের কথা ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমগুলোতে জানান, তাহলে বাংলাদেশী ছাত্রছাত্রীরা বেশ উপকৃত হবে। অনেকেই এই কাজটি করছেন। আমি অন্যদেরকেও অনুরোধ করব সবাই যেন এই ব্যাপারে এগিয়ে আসেন।

১০-১৫ বছর আগে যেখানে উচ্চশিক্ষা সম্পর্কে কোন তথ্য বা কিভাবে প্রসেসিং করতে হয় তা জানা বেশ কষ্টসাধ্য ছিল, এখন সব তথ্য হাতের নাগালে। ফেসবুক কিংবা গুগলে যেকোন বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য পাওয়া যায়। বাংলাদেশী ছাত্রছাত্রীরাও এখন কোরিয়াসহ বিশ্বের সব নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন। ইন্টারনেটে তাদের সাথে যোগাযোগ করেও তথ্য পাওয়া যায়। কোরিয়াতে যেসব বাংলাদেশী ছাত্রছাত্রী পড়াশোনা করছেন তাদের ফেসবুক, ইয়াহু ইত্যাদিতে গ্রুপ আছে। সেখানে তাদের কাছ থেকে সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।

বাংলা টেলিগ্রাফঃ উচ্চশিক্ষা এবং গবেষণার ক্ষেত্রে কোরিয়ার অবস্থান কেমন?

ওয়াদুদ সুজনঃ কোরিয়া এখন অনেক ভাল অবস্থানে আছে। গবেষণাখাতে পৃথিবীর যেসব দেশ বেশি খরচ করে, তাদের মধ্যে কোরিয়া সামনের সারিতে। শিক্ষা বাজেটের একটি বিশাল অংশ কোরিয়ান সরকার গবেষণাখাতে খরচ করে। এছাড়া বেসরকারী খাতেও গবেষণা বাড়ছে। বড় বড় কোম্পানীগুলো বিনিয়োগ করছে।

উচ্চশিক্ষার জন্য যেকেউ এখন কোরিয়াকে বেছে নিতে পারেন। বিশেষ করে মাস্টার্সের জন্য আমি কোরিয়াকে পৃথিবীর যেকোন দেশের চেয়ে ভাল মনে করি। এর কারণ হল গবেষণা প্রকাশনা। মাস্টার্স করার সময় অন্যান্য দেশে ইন্টারন্যাশনাল জার্নালে একটি রিসার্চ পেপার করা বেশ কঠিন ব্যাপার। কিন্তু কোরিয়াতে অনেক বাংলাদেশী ছাত্রছাত্রীই মাস্টার্সের সময় নামকরা জার্নালে পেপার করে ফেলেন। অন্তত কয়েকটি কনফারেন্স পেপার তো হয়ই। এর ফলে পিএইচডি’র জন্য বিশ্বের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্কলারশীপ পাওয়া বেশ সহজ হয়।

বাংলা টেলিগ্রাফঃ কোরিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা আদানপ্রদান বা সহযোগিতামূলক কার্যক্রম আছে কি?

ওয়াদুদ সুজনঃ কোরিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতামূলক কার্যক্রম খুব বেশি না হলেও এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সহযোগিতা বাড়ছে। এই বিষয়ে বিশেষ করে বাংলাদেশী বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের যে শিক্ষকগণ এখন কোরিয়াতে আছেন বা আগে কোরিয়াতে ছিলেন, তাঁরা নিজ নিজ সুপারভাইজিং প্রফেসরের মাধ্যমে বেশ ইতিবাচক পদক্ষেপ নিতে পারবেন বলে আমার বিশ্বাস।

বাংলা টেলিগ্রাফঃ ইউরোপ আমেরিকাকে বাংলাদেশ যেভাবে গুরুত্ব দেয় সেভাবে কি দক্ষিণ কোরিয়ার মত উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোকে গুরুত্ব দেয়?

ওয়াদুদ সুজনঃ অর্থনৈতিকভাবে চিন্তা করলে কোরিয়া এখন অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়ার মত একটি দেশ। স্যামসাং, হুন্দাইয়ের মত কোরিয়ান ব্র্যান্ড এখন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কারখানা করছে। সাংস্কৃতিকভাবেও কোরিয়া এখন সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। আমার মনে হয় দক্ষিণ কোরিয়া আমাদের জন্য বেশ অনুকরণীয় একটি দেশ এবং আমাদের অর্থনৈতিক উন্নতির ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলা টেলিগ্রাফঃ কোরিয়াতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি কিভাবে বৃদ্ধি করা যায়?

ওয়াদুদ সুজনঃ আসলে ব্র্যান্ডিং এর জন্য আমরা যারা এই দেশে আছি তাদের কাজকর্মই মূল ভূমিকা পালন করবে। আমরা যে যেখানে কাজ করি সেখানে যদি ভাল কাজ করি এমনিতেই সুনাম ছড়িয়ে পড়বে। কোন ল্যাবের একজন ছাত্র ভাল কাজ করলে তাঁর প্রফেসর বাংলাদেশী আরেকজন ছাত্রকে কাজ করার সুযোগ দিবেন। কোন বাংলাদেশী যদি একটি কারখানায় ভাল কাজ করেন সেই কারখানার মালিক স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশী আরেকজনকে কাজের সুযোগ দিবেন।

আমরা আরো একটি কাজ করতে পারি। কোথাও কোন সুযোগ আছে কি না খোঁজ রাখতে পারি এবং সেই তথ্যটি সবাইকে জানাতে পারি। বাংলাদেশে যাঁরা সুযোগের অপেক্ষায় আছেন তাঁদের জন্য এটি হবে বেশ বড় একটি সহযোগিতা। আর আমাদের জন্য একটু হলেও আত্মতৃপ্তির হবে এই ভেবে যে, মাতৃভূমির জন্য একটু কিছু করতে পারলাম।

বাংলা টেলিগ্রাফঃ বাংলা টেলিগ্রাফকে সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।
ওয়াদুদ সুজনঃ আপনাকেও ধন্যবাদ।

বাংলা টেলিগ্রাফের পক্ষে বিশেষ সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন বাংলা টেলিগ্রাফ সম্পাদক সরওয়ার কামাল।

sentbe-top