ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডে বিব্রত আওয়ামী লীগ

chatraleageছাত্রলীগের নতুন কমিটিতে বিবাহিত, অছাত্র, হত্যা মামলার আসামি, মাদক ব্যবসায়ীসহ নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িতরা স্থান পেয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ত্যাগী ও যোগ্য নেতাকর্মীরা কমিটিতে ঠাঁই না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করায় পদবঞ্চিতদের ওপর মধুর ক্যান্টিনে হামলার ঘটনায় বিস্মিত, হতবাক ও বিব্রত সংগঠনটির অভিভাবক দল আওয়ামী লীগ। দলটির একাধিক নেতার মতে, ছাত্রলীগ অনেক বড় সংগঠন। ছোটখাটো কিছু সমস্যা থাকতেই পারে। যেহেতু পদসংখ্যা কম, তাই নতুন কমিটি হলে সবাইকে পদ দেয়া সম্ভব হয় না। তেমনি পদবঞ্চিতরা ক্ষোভ প্রকাশ করবে- এটিও গণতান্ত্রিক সৌন্দর্য। তাই বলে পদধারীরা পদবঞ্চিতদের ওপর হামলা করে মারাত্মকভাবে আহত করবে এটা শোভনীয় নয়। দলীয় প্রধান এ বিষয়টি মোটেই ভলোভাবে নেবেন বলে মনে হয় না।

এ দিকে ছাত্রলীগের সাবেক নেতারাও নতুন কমিটিতে বিতর্কিতরা ঠাঁই পাওয়ায় বিস্মিত হয়েছেন। ছাত্রলীগের অভিভাবক ও আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা নতুন কমিটির বিতর্কিত নেতা এবং ত্যাগী পদবঞ্চিতদের বিষয়ে খোঁজখবর নেয়ার জন্য গোয়েন্দা সংস্থাকে নির্দেশও দিয়েছেন বলে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে।

গত সোমবার সহসভাপতি পদে ৬১ জন, যুগ্ম সম্পাদক পদে ১১ জন এবং সাংগঠনিক সম্পাদক পদে ১১ জনসহ ছাত্রলীগের ৩০১ সদস্য বিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। কমিটিতে বিবাহিত, অছাত্র, মাদক ব্যবসায়ী, হত্যা মামলার আসামিসহ বেশ কয়েকজন বিতর্কিত নেতাকে পূর্ণাঙ্গ কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদ দেয়া হয়েছে; যা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে। বিতর্কিতদের মধ্যে সহসভাপতি আতিকুর রহমান খান, আরেফিন সিদ্দিকী সুজনের বিরুদ্ধে মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। গণরুমে পিস্তল দিয়ে শিক্ষার্থীদের ভয় দেখানো এবং শিক্ষকের গায়ে হাত তোলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার হয়েছিলেন বরকত হাওলাদার। আমিনুল ইসলাম বুলবুল একটি হত্যা মামলার এক নম্বর আসামি। তানজিল ভূঁইয়া তানভীর ঠিকদারি ব্যবসায় জড়িত। সংগঠনটির যুগ্ম সম্পাদক প্রদীপ চৌধুরী ২০১৪-১৫ সেশনে পরীক্ষায় নকলের দায়ে ঢাবি থেকে তিন বছরের জন্য বহিষ্কার হয়েছিলেন।

সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগের নাম বিক্রি করে এলিফ্যান্ট রোডের একটি পাঞ্জাবি দোকান থেকে পাঞ্জাবি নেয়ার দায়ে আটক হয়ে কারাভোগ করেছিলেন উপগ্রন্থনা ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক পদ পাওয়া সৌরভ নাথ। এসব বিষয় নিয়ে গত সোমবার পদপ্রত্যাশী ও পদবঞ্চিত নেতাকর্মীরা সংবাদ সম্মেলন করতে গেলে হামলার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় আহতরা গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলন করে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছেন। তারা আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কমিটি ভেঙে নতুন কমিটি ঘোষণারও দাবি জানান। এ ছাড়াও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আশ্বাস ছাড়া দলের অন্য কোনো নেতার আশ্বাস মেনে নেয়া হবে না উল্লেখ করে পদবঞ্চিতরা বলেন, শুধু আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী এ ঘটনার বিচার করলে মেনে নেয়া হবে। আজ বুধবার বেলা ১টায় হামলার ঘটনায় জড়িতদের শাস্তির দাবিতে রাজু ভাস্কর্যে মানববন্ধন করবেন বলেও তারা জানান।

গত সোমবারের সংঘর্ষে আহতদের একজন এবং নতুন কমিটির উপসাংস্কৃতিক সম্পাদক ও কাক্সিক্ষত পদ না পাওয়া তিলোত্তমা শিকদার গতকাল সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে অছাত্র, বিবাহিত, চাকরিজীবীদের শীর্ষ পদে রাখা হয়েছে। ছাত্রলীগের ত্যাগী কর্মীদের মূল্যায়ন করা হয়নি। তাদের বিরুদ্ধে আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কোনো ব্যবস্থা না নেয়া হলে নতুন কমিটিতে পদ পাওয়া আমার মতো আরো ৩০ থেকে ৩৫ জন গণপদত্যাগ করবে। রোকেয়া হলের সভাপতি লিপি আক্তার বলেন, তদন্ত কমিটি মানি না। যারা হামলা করেছে, তাদের দিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। শোভন-রাব্বানীর প্রত্যক্ষ নির্দেশে আমাদের ওপর হামলা হয়েছে। আবার তারা হামলাকারীদের দিয়ে তদন্ত কমিটি করেছে।

পদবঞ্চিতদের কমিটিতে রাখার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলাপ করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, বিতর্কিতদের ব্যাপারে অভিযোগ প্রমাণিত হলে পদশূন্য ঘোষণা করা হবে। মধুর ক্যান্টিনে সংঘর্ষের ঘটনায় তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রধান ও ছাত্রলীগ সহ সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় সাংবাদিকদের বলেন, এরই মধ্যে ভিডিও ফুটেজ দেখে তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করেছে। দোষীদের চিহ্নিত করে আমরা প্রতিবেদন জমা দেবো। ছাত্রলীগে এখন পর্যন্ত সন্ত্রাসী কার্যক্রম করে কেউই ছাড় পাননি, পাবেনও না। কমিটি ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই তদন্ত প্রতিবেদন পেশ করবে।

ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণা এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দল প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, ছাত্রলীগের কাউন্সিল হয়েছিল এবং নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। এই সংগঠনে লাখ লাখ নেতাকর্মী রয়েছে। যোগ্য নেতার সংখ্যাও অনেক, কিন্তু সবাইকে পদ দেয়া বা নেতা বানানো সম্ভব হয় না। এ কারণে তাদের মধ্যে কিছু অসন্তোষ, কিছু ক্ষোভ হতেই পারে। মধুর ক্যান্টিনে যে ঘটনা ঘটেছে এটা অতি ছোট ঘটনা। এ ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার কিছু নেই। আশা করি শিগগিরই তাদের ক্ষোভ প্রশমিত হবে।

সৌজন্যে- নয়া দিগন্ত