cosmetics-ad

প্রবাসী পিতার অসহায়ত্ব

singapore-shipon
ফাইল ছবি

প্রতিদিন ডিউটি শেষে বাসায় ফিরে বাড়িতে কল দিয়ে কথা বলা আমার নিত্যদিনের অভ্যাস। বাড়িতে কথা বলা মানেই ছেলেদের সাথে খুনসুটি। ছেলেরা জানে আমি কখন ফোন দেব তাই ওই সময় ওরা মোবাইল ওদের মায়ের হাতে দেয় না। আমি যদি মোবাইলে এক ছেলেকে ডাক দেই অপর ছেলে অভিমান করে দেওয়ালে মাথা ঠুকে চোখ দুটি ছল ছল করে তাকিয়ে থাকে। তাই দুই ছেলেকে একসাথেই ডাক দেই।

অন্যদিনের মতো আজকেও কল দিলাম। কিন্তু আমার বউ কল রিসিভ করছে না। পরপর কয়েকবার কল দেওয়ার পরও কল রিসিভ না করাতে চিন্তিত হয়ে পড়লাম। অজানা আশঙ্কায় কপালে শিশিরবিন্দুর মত ঘাম জমতে লাগল। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। এমন তো হবার কথা নয়। প্রতিদিন রিং হবার সাথে সাথেই কল রিসিভ করা হয়।

অনেক সময় নির্ধারিত সময় কল দিতে না পারলে বউ কল দিয়ে অনুযোগের স্বরে বলে, তোমার বউ ছেলে কেহ নাই নাকি? আমি স্বহাস্যে জবাব দেই, আরে এইমাত্র কল দিতাম আমি কল দেবার আগেই তুমি কল দিয়ে দিলে। বউ বলে, জানো কাজ শেষে তোমার সুস্থভাবে বাসায় ফেরার অপেক্ষায় আমরা বসে থাকি। দুই ছেলে মায়ের সাথে স্বর মিলিয়ে বলে হ আব্বু হ। আম্মু একটুও মিথ্যা বলছে না।

মোবাইলে ম্যাসেজ আসার শব্দ শুনে মোবাইল স্কিনে তাকিয়ে দেখি বউ ম্যাসেজ পাঠিয়েছে। সে লিখেছে, আমি এখন হাসপাতালে। কথা বলা যাবে না। সাফি এক্সিডেন্ট করেছে।

ম্যাসেজ পড়ে আমার হাত থেকে মোবাইলটা পড়ে গেল। মোবাইলটা ধরে রাখার মতো শক্তি পেলাম না। নিজের অজান্তে চোখের কোনায় পানি জমে গেল। ইচ্ছে করছে এই মুহূর্তে ছেলের কাছে ছুটে যাই। একটু পর বউ আবার ম্যাসেজ দিল মারাত্মক কিছু হয়নি শুধু পা ভেঙেছে। বউয়ের কথা বিশ্বাস হলো না। ও জানে আমি ছেলেদের কত ভালোবাসি। হয়ত আমাকে শান্ত্বনা দেবার জন্য মিথ্যা কথা বলছে সাথে সাথে আমার এক বন্ধুকে কল দিয়ে বললাম, হাসপাতালে গিয়ে খোঁজ নিয়ে আমাকে প্রকৃত ঘটনা জানানোর জন্য।

এই মুহূর্তে নিজেকে প্রবাসী পিতা হিসেবে অক্ষম ও অসহায় মনে হচ্ছে। বউ আবারও ম্যাসেজ দিল আমার কাছে একটাকাও নাই। ডাক্তার বলছে অনেক টাকা লাগবে।

আমি সাথে সাথে এক বন্ধুর মাধ্যমে বিকাশ করে করে হাসপাতালে কিছু টাকা পাঠালাম। আর বউকে ম্যাসেজ দিলাম, ‘তুমি টাকার চিন্তা কর না। যত টাকা লাগে আমি পাঠাচ্ছি। তুমি ছেলের চিকিৎসার জন্য উন্নত হাসপাতালে নিয়ে যাও।’

হাসপাতাল থেকে বন্ধু কল দিয়ে জানাল, ‘তেমন মারাত্মক না শুধু পায়ের একটা হাড় ভেঙেছে। ডাক্তার ব্যান্ডেজ করে দিয়েছে কয়েকদিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে যাবে। ‘তার কথা শুনে কিছুটা স্বস্তি পেলাম। তবুও মন মানছে না। অফিসে কল দিয়ে ম্যানেজারকে সব খুলে বললে সে বলল, ঠিক আছে তুমি বাড়ি যাও সাতদিন পর চলে এসো।

সমস্যা হলো টাকা নিয়ে আমার হাতে কোনো টাকা নেই কীভাবে বাড়ি যাব! এক রুমমেট রাসেল আর সহকর্মী আকরামের কাছ সব খুলে বললে তারা আমাকে কিছু টাকা ধার দিতে রাজি হলো। বাড়ি যাবার সব প্রস্তুতি শেষ। এমন সময় বউ কল দিলো।

আমি কল রিসিভ করতেই ছেলে বলল, ‘আব্বু জানো আমার পা ভেঙে গেছে।’ তার কথা শুনে নিজের অসহায়ত্বের জন্য দু’চোখ বেয়ে অশ্রু বইতে লাগল। নিজেকে সংযত করে বললাম, ‘বাবা ঠিক হয়ে যাবে।’ ছেলে বলল, ‘বাবা তুমি বাড়ি এসে ড্রাইভারকে ইচ্ছেমতো বকে দিও।’ আমি বললাম, ‘আচ্ছা বাবা তাকে আমি মেরে দেব।’ আমার কথা শুনে ছেলের মুখে হাসি ফুটে এলো।

ছেলের কাছ থেকে মোবাইল নিয়ে বউ বলল, ‘তুমি নাকি বাড়ি আসবে? শোনো এখন বাড়ি আসার দরকার নেই। তুমি বাড়ি এলে ছেলের পা ভালো হতে সময় লেগে যাবে ও এই অসুস্থ পা নিয়েই তোমার সাথে ঘোরাঘুরি করতে চাইবে।’ আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে বউ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিল।

বউ ঠিকই বলেছে। গত বছর যখন ছুটিতে বাড়ি গিয়েছিলাম তখন ছোট ছেলে সবসময় আমার সাথেই থাকত। সে যখন দেখত আমি ফ্রেশ হচ্ছি সে তার মাকে বলত নতুন জামা পরিয়ে দিতে তার মা জিজ্ঞেস করত কেন? সে বলত, ‘আমি আব্বুর সাথে বাহিরে যাব।’ আমি বলতাম আমি নেব না। সে অভিমানে কেঁদে দিত। তার অভিমান আর কান্না দেখে সারাক্ষণ আমার সাথে রাখতাম। বাসায় ফিরে আমার শান্তি ছিল না।

তার প্রিয় খেলনাগুলো নিয়ে আমার সাথে খেলতে বসে পড়ত। বড় ছেলে এসে বলত, আব্বু আমাকে না সাফিকে বেশি ভালোবাসে। তার কথা শুনে আমি হাসতাম তার অভিমান ভুলিয়ে দুই ছেলেকে নিয়ে একসাথে খেলতে বসতাম।

মাঝে মাঝে বাহিরে বের হবার সময় হলে ঘরে বসে থাকতাম আর চুপিচুপি ছোট ছেলের মতিগতি খেয়াল করতাম। যদি বাহিরে বের হবার সময় হত সে বিরক্তিকরভাবে আমার সামনে এসে দাঁড়াত। আমি হেসে দিতাম। সে নিজেই কাপড় রাখার আলনা থেকে আমার জন্য আর তার জন্য জামা এনে আমার হাতে তুলে দিয়ে আমাকে জামা গায়ে দিতে বলত আর তাকে পড়িয়ে দিতে বলত।

আমি নিজে জামা পরে আর তাকে পরিয়ে দিয়ে অবুঝের মতো দাঁড়িয়ে থাকতাম। সে আমাকে টেনে ড্রেসিং টেবিলের সামনে নিয়ে গিয়ে গায়ে সুগন্ধি মাখতে অনুরোধ করত। আমার সুগন্ধি মাখা হলে তাকেও সুগন্ধি মেখে দেওয়া লাগত।

সুগন্ধি মাখার পর টেবিলের ড্রয়ার খুলে ওয়ালেটটা আমার দিকে এগিয়ে দিত আর ড্রয়ারে রাখা খুচরো দুই টাকা তার পকেটে রেখে হাত দিতে পকেট চেপে ধরে রাখত যাতে কেহ টাকা নিতে না পারে। আমাকে টেনে দরজার বাহিরে নিয়ে গিয়ে জুতা এগিয়ে দিয়ে নিজেও জুতা পায়ে দিত। যেন আমি কিছুই জানি না তার নির্দেশমতো সব করতাম আর মুচকি মুচকি হাসতাম।

মাত্র দুই বছরের বাচ্চা এত নিখুঁত বুদ্ধি দেখে আমার বউ পেছনে দাঁড়িয়ে মুচকি মুচকি হাসত আর বলত, দেখো তোমার ছেলের কর্মকাণ্ড তুমি বিদেশ চলে গেলে এদের সামলাতে আমার কত কষ্ট হয় বুঝেছো? আমি কৃতজ্ঞতায় বউয়ের দিকে তাকাই আর তাকে ধন্যবাদ দেই।

জুতা পরা শেষ হলে ছেলে আমার আঙুল ধরে টেনে আস্তে আস্তে সিঁড়ি দিয়ে নামিয়ে নিচে নামতে থাকে। ওর মা পিছন থেকে বলত, সাফি কোথায় যাও আব্বুর সাথে আমাকে আর রাফিকে নেবে না। সাফি রাগান্বিত হয়ে বলল, ‘না না। আমরা তোমাদের নেব না।’ তার কথা শুনে বউ আর আমি দু’জনেই হেসে দিতাম। ভাগ্যিস বড় ছেলেটা ওই সময় মাস্টারের কাছে পড়তে যায়।

রাস্তায় বের হয়ে ছেলে রিকশা দেখিয়ে বলত রিকশা নাও। বাপ ছেলে রিকশায় বসতাম। এই সময় তাকে খুব উৎফুল্ল দেখাত। একটু দূরে যাবার পর সে আমাকে রাস্তার পাশে চটপটির দোকানে থামতে বলত, সেখানে বাপ ছেলে দু’জনে বসে মজা করে চটপটি খেতাম। খাওয়া শেষে ছেলে বলল, বাবা মা আর বড় ভাইয়ের জন্য নেবে না। তার এই বুদ্ধিদীপ্ত কথায় আনন্দে আমি তার চোখে মুখে চুমো খেতাম আর সে উল্লাসে ফেটে উঠত।

ভাবতে ভাবতে মনটা খারাপ হয়ে গেল। আমার ছেলেটা এখন বাড়ি গেলে সত্যি তাকে ঘরে রাখা যাবে না। সে ভাঙ্গা পা নিয়েই বাবার সাথে বের হয়ে যাবে। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম। ছেলে সুস্থ হলেই বাড়ি যাব।

মাঝেমধ্যে নিজেকে প্রশ্ন করি আমার মত একজন প্রবাসীর ঘরে রাজপুত্রের মত দুটি সন্তান কেন এলো। এদের জন্ম হওয়া উচিৎ ছিল কোন রাজা-বাদশার ঘরে। তাহলে ওদের পিতাহীন একদিনও থাকতে হত না। আমি ওদের চাহিদা মেটাতে পারি না, ওদের খেলার সাথী হতে পারি না, অসুস্থ হলে পাশে থাকতে পারি না। তবে আমার সমস্ত ভালোবাসা ওদের জন্য। ওরা হাসলেই আমি হাসি, ওরা কাঁদলেই আমি কাঁদি। ওরা আমার শরীরের অংশে পরিণত হয়ে। প্রতিটি শ্বাসপ্রশ্বাসে ওদের অনুভব করি।

লেখক- ওমর ফারুকী শিপন, সিঙ্গাপুর থেকে