বৃহস্পতিবার । মার্চ ৫, ২০২৬
বাংলা টেলিগ্রাফ ডেস্ক জাতীয় ১ অক্টোবর ২০২৫, ১১:৩৪ পূর্বাহ্ন
শেয়ার

জাতিসংঘে বিশ্বের কাছে রোহিঙ্গাদের আর্তনাদ, ন্যায়বিচার কোথায়?


rohingya

মিয়ানমারের রাখাইন অঙ্গরাজ্যে চলমান সংঘাত ও নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) এক উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে বক্তব্য রেখেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে মঙ্গলবার (৩০ সেপ্টেম্বর) অনুষ্ঠিত এ সভায় তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

রোহিঙ্গা স্টুডেন্ট নেটওয়ার্কের প্রতিষ্ঠাতা মং সাওয়েইদ্দুল্লাহ ইউএনজি’র বিশাল হল থেকে লাইভ ভাষণে রোহিঙ্গাদের উদ্দেশে বলেন, প্রিয় ভাই ও বোনেরা, তোমরা ভুলে যাওয়া মানুষ নও। হয়তো মনে হচ্ছে বিশ্ব তোমাদের কষ্ট দেখছে না, কিন্তু রোহিঙ্গারা তোমাদের দেখছে।

তিনি বিশ্বনেতা ও জাতিসংঘের উদ্দেশে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন, রোহিঙ্গা গণহত্যা প্রকাশ্যে আসার পর আট বছরের বেশি কেটে গেছে। রোহিঙ্গাদের জন্য ন্যায়বিচার কোথায়? এরপর তিনি আগস্ট ২০২৪-এ আরাকান আর্মির ড্রোন হামলায় নিহত কয়েকজনের মৃতদেহের ছবি প্রদর্শন করেন এবং এটিকে ‘পদ্ধতিগত নিপীড়ন’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

মানবিক সহায়তা অবরুদ্ধ
উইমেনস পিস নেটওয়ার্ক-মিয়ানমারের নির্বাহী পরিচালক ও রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী ওয়াই ওয়াই নু এ সম্মেলনকে ‘ঐতিহাসিক মুহূর্ত’ আখ্যা দিয়ে বলেন, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের কাছে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো অবরুদ্ধ হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের রোহিঙ্গাদের জীবন রক্ষা করতে হবে।’ পাশাপাশি, মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মিসহ দায়ীদের বিরুদ্ধে লক্ষ্যভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ ও বৈশ্বিক অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি।

জাতিসংঘের সতর্কতা
জাতিসংঘ মহাসচিবের চিফ অব ক্যাবিনেট আর্ল কার্টনি জানান, বৃহৎ পরিসরে তহবিল সংকোচন রোহিঙ্গাদের দুর্দশা আরও বাড়িয়ে তুলেছে। গত ১৮ মাসে আরও এক লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সভায় বলেন, গণহত্যা শুরু হওয়ার আট বছর পরও রোহিঙ্গাদের দুর্দশা অব্যাহত। বাংলাদেশ এ সংকটের শিকার। তিনি জানান, বাংলাদেশকে এখনো বিশাল আর্থিক, সামাজিক ও পরিবেশগত খরচ বহন করতে হচ্ছে।

camp

বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার একটি রোহিঙ্গা ক্যাম্প

ইউনূস বলেন, তহবিল কমে যাওয়ায় একমাত্র শান্তিপূর্ণ সমাধান হলো রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরু করা। যারা নতুন করে বাংলাদেশে এসেছে, তাদের দ্রুত ফিরিয়ে নেওয়া জরুরি। তিনি আরও জানান, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের কারণে থাইল্যান্ডের মতো রোহিঙ্গাদের কাজের সুযোগ দেওয়া সম্ভব নয়।

আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি
মার্কিন বিশেষ দূত চার্লস হার্ডার বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডকে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানান। তিনি ঘোষণা দেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য ৬ কোটি ডলারের সহায়তা দেবে। তবে এ সহায়তা বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির সঙ্গে যুক্ত থাকবে বলে জানান তিনি। একইসঙ্গে তিনি সতর্ক করে দেন, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার দায়িত্ব দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্র বহন করবে না, অন্যান্য রাষ্ট্রকেও এগিয়ে আসতে হবে।

এদিকে যুক্তরাজ্য রোহিঙ্গাদের জন্য ৩ কোটি ৬০ লাখ ডলার সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক আদালতের মামলা
গাম্বিয়ার ন্যায়বিচারমন্ত্রী দাউদা জ্যালো জানান, তার দেশ রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগে ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক আদালতে (আইসিজে) মামলা করেছে। আগামী জানুয়ারি ২০২৬-এ মামলার মৌখিক শুনানি শুরু হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। ‘মিয়ানমার রোহিঙ্গা গণহত্যার জন্য দায়ী এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য—এ দাবিই আমরা আদালতে উপস্থাপন করব,’ বলেন জ্যালো।

প্রেক্ষাপট
২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর জাতিগত নিধনযজ্ঞ থেকে বাঁচতে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। বর্তমানে কক্সবাজার বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবিরে পরিণত হয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়া, রাজনৈতিক সমাধানের অভাব ও রাখাইনে নতুন সংঘাত—সব মিলিয়ে রোহিঙ্গা সংকট আরও জটিল আকার ধারণ করছে।

আল জাজিরা অবলম্বনে