
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান
বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক ইতিহাসে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এমন এক ব্যক্তিত্ব, যার অবদান কেবল রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তিনি স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, উৎপাদনমুখী উন্নয়ন এবং বেসরকারি খাতভিত্তিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম স্থপতি। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার বর্তমান ভিত্তি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মুক্তবাজার অর্থনীতির যে দর্শন আজ দেশের অর্থনৈতিক নীতিমালার মূলধারায় পরিণত হয়েছে, তার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি নির্মাণে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ ছিল একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্র। অবকাঠামো ধ্বংসপ্রাপ্ত, শিল্প উৎপাদন স্থবির, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সীমিত এবং খাদ্য নিরাপত্তা ছিল অনিশ্চিত। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মাধ্যমে উন্নয়নের চেষ্টা করা হলেও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জিত হয়নি। এমন এক বাস্তবতায় রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে জিয়াউর রহমান উপলব্ধি করেন যে অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন জনগণের সৃজনশীল শক্তিকে কাজে লাগানো, উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা এবং বাজারভিত্তিক অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা।
তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো পরিকল্পিতভাবে বেসরকারি খাতকে জাতীয় উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, সরকার উন্নয়নের সহায়ক শক্তি হতে পারে, কিন্তু উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের প্রধান চালিকাশক্তি হবে জনগণ এবং উদ্যোক্তা সমাজ। এই উপলব্ধি থেকেই শিল্প ও ব্যবসা খাতে সরকারি নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা হয় এবং ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার জন্য নীতিগত সংস্কার শুরু হয়।
জিয়াউর রহমানের অর্থনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল আত্মনির্ভরশীলতা। তিনি বারবার উল্লেখ করেছেন যে একটি জাতি তখনই সত্যিকারের স্বাধীন হতে পারে, যখন তার অর্থনীতি নিজস্ব শক্তির ওপর দাঁড়াতে সক্ষম হয়। তাই বিদেশি সাহায্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় সম্পদ, শ্রমশক্তি এবং উৎপাদন সক্ষমতাকে কাজে লাগানোর ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। তার সময়ে কৃষি, ক্ষুদ্র শিল্প এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়।
বাংলাদেশের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে তার অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি কৃষকদের উৎপাদন বৃদ্ধিতে উৎসাহিত করেন, সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ, উন্নত বীজ ব্যবহার এবং কৃষি উপকরণের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তার শাসনামলে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে কৃষি খাতে নতুন গতি সৃষ্টি হয় এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তার ভিত্তি শক্তিশালী হতে শুরু করে।
গ্রামীণ উন্নয়ন ছিল তার অর্থনৈতিক কৌশলের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে বাংলাদেশের প্রকৃত অর্থনীতি শহরে নয়, গ্রামে অবস্থান করে। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির ওপর জোর দেন। উপজেলা ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ এবং স্থানীয় উন্নয়ন কার্যক্রমে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। পরবর্তীকালে গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশ এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার শক্তিশালীকরণের ক্ষেত্রে এই পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
শিল্পায়নের ক্ষেত্রেও জিয়াউর রহমান একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রবর্তন করেন। তিনি শিল্প খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য নীতিগত সহায়তা প্রদান করেন এবং উদ্যোক্তাদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করেন। এর ফলে দেশে নতুন শিল্পোদ্যোক্তা শ্রেণির উত্থান ঘটে। আজ বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প, ওষুধ শিল্প, কৃষি-প্রক্রিয়াজাত শিল্প এবং অন্যান্য রপ্তানিমুখী খাত যে শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছেছে, তার প্রাথমিক ভিত্তি এই সময়েই নির্মিত হতে শুরু করে।
রপ্তানিমুখী অর্থনীতির ধারণাকেও তিনি উৎসাহিত করেছিলেন। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের উপস্থিতি বৃদ্ধির জন্য তিনি উৎপাদন ও রপ্তানির ওপর গুরুত্ব দেন। তার সময়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং বৈদেশিক সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কূটনীতির নতুন ধারা সূচিত হয়। বাংলাদেশকে বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করার যে প্রক্রিয়া পরবর্তীকালে আরও বিস্তৃত হয়েছে, তার সূচনালগ্নে তার অবদান ছিল তাৎপর্যপূর্ণ।
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও তিনি বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেন। প্রযুক্তি, মূলধন এবং ব্যবস্থাপনা দক্ষতা অর্জনের জন্য বিদেশি বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা তিনি উপলব্ধি করেছিলেন। একইসঙ্গে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করার নীতিও গ্রহণ করেন। আজকের বৈদেশিক বিনিয়োগবান্ধব বাংলাদেশের ভিত্তি নির্মাণে এই চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
তার অর্থনৈতিক দর্শনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল উৎপাদনশীল মানবসম্পদ গঠন। তিনি কর্মমুখী শিক্ষা, কারিগরি দক্ষতা উন্নয়ন এবং যুবসমাজকে উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। দেশের উন্নয়নকে তিনি কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং মানবসম্পদ উন্নয়নকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন।
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জাতীয় অর্থনীতির প্রায় পুরো প্রবৃদ্ধির প্রধান উৎস হচ্ছে বেসরকারি খাত। দেশের অধিকাংশ কর্মসংস্থান, শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি আয় এবং বিনিয়োগ কার্যক্রম ব্যক্তিখাতের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এই বাস্তবতা প্রমাণ করে যে জিয়াউর রহমান যে অর্থনৈতিক দর্শন ও নীতির ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, তা সময়ের পরীক্ষায় টিকে গেছে এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির একটি শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ থেকে উন্নত অর্থনীতির দিকে অগ্রসর হওয়ার লক্ষ্যে কাজ করছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার যুগে দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য উদ্যোক্তা সৃষ্টি, উদ্ভাবন এবং ব্যক্তিখাতের বিকাশ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে জিয়াউর রহমানের আত্মনির্ভরশীলতা, উৎপাদনশীলতা এবং মুক্তবাজারভিত্তিক অর্থনৈতিক দর্শন নতুন তাৎপর্য লাভ করেছে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে মূল্যায়ন করতে হলে তাকে কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে নয়, বরং একজন দূরদর্শী অর্থনৈতিক সংস্কারক হিসেবেও দেখতে হবে। তিনি এমন এক সময়ে মুক্তবাজার অর্থনীতি, বেসরকারি খাতের বিকাশ এবং আত্মনির্ভরশীলতার দর্শন সামনে এনেছিলেন, যখন এসব ধারণা বাংলাদেশের জন্য ছিল নতুন এবং চ্যালেঞ্জিং। তার সাহসী নেতৃত্ব, বাস্তবমুখী চিন্তা এবং উন্নয়নমুখী নীতির ফলেই বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি নতুন পথের সন্ধান পেয়েছিল।
আজ তার ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করতে গিয়ে বলা যায়, তিনি শুধু স্বাধীনতার ঘোষক নন; তিনি ছিলেন আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি, উৎপাদনশীল সমাজ এবং উদ্যোক্তানির্ভর বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা। তার অর্থনৈতিক দর্শন ও উন্নয়নচিন্তা আগামী প্রজন্মের জন্যও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
ড. মো. শরিফুল ইসলাম দুলু: মার্কেটিং গবেষক, উন্নয়ন বিশ্লেষক ও ব্যবস্থাপনা পরামর্শক।












































