
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস
জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের চার পাইলটের লাইসেন্স ও উড়ানঘণ্টা নিয়ে গুরুতর জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় গঠিত অভ্যন্তরীণ তদন্তে একাধিক অসংগতি ধরা পড়েছে বলে জানা গেছে।
বিমান সূত্রে জানা যায়, মোট সাতজন পাইলটকে ঘিরে অভিযোগ ওঠার পর কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। প্রাথমিক তদন্তে অন্তত চারজন পাইলটের ক্ষেত্রে গুরুতর অসংগতির আলামত পাওয়া গেছে। তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় উড়ানঘণ্টা পূরণ না করেই কমার্শিয়াল পাইলট লাইসেন্স (সিপিএল) নেওয়া, লগবুকে উড়ান সময় বাড়িয়ে দেখানো এবং পরস্পরবিরোধী উড়ান সনদ ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে যেসব পাইলটের নাম এসেছে তারা হলেন— ক্যাপ্টেন আবদুর রহমান আখন্দ, ক্যাপ্টেন ফারিয়েল বিলকিস আহমেদ, ক্যাপ্টেন আনিস, ক্যাপ্টেন বাসিত মাহতাব, ক্যাপ্টেন নুরউদ্দিন আহমেদ, ক্যাপ্টেন ইউসুফ মাহমুদ ও ক্যাপ্টেন মুস্তাফিজুর রহমান। তবে নুরউদ্দিন আহমেদ ও মুস্তাফিজুর রহমান বর্তমানে বিমানের কর্মরত নন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জানা গেছে, গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর একটি অজ্ঞাত পরিচয় ই-মেইলের মাধ্যমে পাইলটদের লাইসেন্স ও উড়ানঘণ্টা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে ২৮ জানুয়ারি চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে বিমান কর্তৃপক্ষ। পরে ৩ ফেব্রুয়ারি জমা দেওয়া প্রাথমিক প্রতিবেদনে একাধিক অসংগতি তুলে ধরা হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি অসংগতি পাওয়া গেছে ক্যাপ্টেন বাসিত মাহতাবের নথিপত্রে। ১৯৯৩ সালে লাইসেন্স পাওয়া এই পাইলটের উড্ডয়ন প্রশিক্ষণ ও রেকর্ডে বিশাল ব্যবধান দেখা গেছে। মাত্র ৫৫ দিনের ব্যবধানে ইস্যু করা দুটি সরকারি সনদে তাঁর উড্ডয়ন ঘণ্টার পার্থক্য পাওয়া গেছে প্রায় ১২১ ঘণ্টা। একইভাবে ক্যাপ্টেন আবদুর রহমান আখন্দের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে, তিনি প্রয়োজনীয় ২৫০ ঘণ্টা উড্ডয়ন অভিজ্ঞতার পরিবর্তে মাত্র ১৫৪ ঘণ্টা উড্ডয়ন করেই লাইসেন্স বাগিয়ে নিয়েছেন। এছাড়া ক্যাপ্টেন ফারিয়েল বিলকিস আহমেদ এবং ক্যাপ্টেন আনিসের ক্ষেত্রেও লগবুকে সময় বাড়িয়ে দেখানো এবং প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ না করেই লাইসেন্স পাওয়ার মতো গুরুতর সব অসংগতির প্রমাণ পেয়েছে কমিটি।
এই স্পর্শকাতর বিষয়টি সামনে আসার পর তদন্ত কমিটি অভিযুক্ত পাইলটদের অবিলম্বে ফ্লাইট ডিউটি থেকে সরিয়ে রাখার সুপারিশ করেছিল। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, কোনো পাইলটের লাইসেন্স বা দক্ষতা নিয়ে তদন্ত চলাকালে তাঁকে বিমান চালানো থেকে বিরত রাখা বাধ্যতামূলক। কিন্তু রহস্যজনক কারণে বিমান কর্তৃপক্ষ সেই সুপারিশ বাস্তবায়ন করেনি। বরং তদন্তাধীন থাকা অবস্থাতেই অভিযুক্ত এই পাইলটরা জেদ্দা, লন্ডন, কুয়ালালামপুর এবং কাঠমাণ্ডুর মতো আন্তর্জাতিক রুটে নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করছেন, যা কয়েক হাজার যাত্রীর জানমালের জন্য প্রত্যক্ষ হুমকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
বিমানের পক্ষ থেকে বর্তমানে এই বিষয়ে অধিকতর তদন্ত চালানো হচ্ছে এবং বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) কাছে নথিপত্র যাচাইয়ের জন্য চিঠি পাঠানো হয়েছে। এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি এই জালিয়াতি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর নজরে আসে, তবে বাংলাদেশের পুরো এভিয়েশন খাতের ওপর বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে। অতীতেও জাল সনদের কারণে বিমানের পাইলটদের চুক্তি বাতিল করার নজির থাকলেও বর্তমান অভিযুক্তদের ক্ষেত্রে কেন শিথিলতা দেখানো হচ্ছে, তা নিয়ে সংস্থাটির ভেতরে-বাইরে নানা প্রশ্ন উঠছে।
তথ্য সূত্র: কালের কণ্ঠ









































