শনিবার । মে ২, ২০২৬
বাংলা টেলিগ্রাফ ডেস্ক জাতীয় ২ মে ২০২৬, ২:৩৬ পূর্বাহ্ন
শেয়ার

খেটে খাওয়া মানুষ ভালো থাকলে বাংলাদেশ ভালো থাকবে: প্রধানমন্ত্রী


খেটে খাওয়া মানুষ ভালো থাকলে বাংলাদেশ ভালো থাকবে: প্রধানমন্ত্রী

শ্রমিক সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান

সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ যখন ভালো থাকবে তখনই এই দেশ ভালো থাকবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

তিনি বলেন,  আমরা জানি এই দেশে কলকারখানা তৈরি হলে এই দেশের শ্রমিকরা কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে। আমরা জানি, শ্রমিকরা যদি ভালো থাকে তাহলে বাংলাদেশ ভালো থাকবে। আমরা জানি কৃষকরা যদি ভালো থাকে তাহলেই বাংলাদেশ ভালো থাকবে।

শুক্রবার (১ মে) মহান মে দিবস উপলক্ষে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল আয়োজিত এক শ্রমিক সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, অতীতের এই সামান্য কয়েক বছর আগের ঘটনার কথা, দুই থেকে তিন বছর আগের ঘটনার কথা, আজ এখানে আমরা শান্তিপূর্ণভাবে এই সমাবেশের করছি। কিন্তু মাত্র কয়দিন আগের কথা এই রাজপথ এই আশেপাশের দালানকোঠা এই এলাকার প্রতিবেশী ভাইয়ের বোনেরা সকলে সাক্ষী আছেন এখানে যখন বিএনপি শ্রমিক দল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক, ছাত্রদল, মহিলা দল যারাই যখন সমাবেশ করেছে আমাদেরকে তখন আতঙ্কিত থাকতে হতো কখন সেই স্বৈরাচারের বাহিনী হামলা করে বসে। নিশ্চয়ই আপনাদের মনে আছে। আপনারা কি ভুলে গিয়েছেন? সেই ঘটনা ভুলে যাননি।

তিনি বলেন, আজ থেকে দু’ বছর আগের ঘটনা প্রায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের মানুষ স্বৈরাচারকে ছাত্র জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে বিদায় করে দিয়েছে এই দেশ থেকে। সেই স্বৈরাচারের বিগত প্রায় এক যুগের বেশি সময় আমরা কি দেখেছি? আমরা দেখেছি শুধু যে শ্রমিককে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে তা নয়, শুধু যে ছাত্রদেরকে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে তা নয়, শুধু যে শিক্ষকদেরকে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে তা নয়, শুধু যে নারীদেরকে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে তা নয়। এই দেশের প্রত্যেকটি খেটে খাওয়া মানুষকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এই দেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার থেকে দেশের মানুষকে বঞ্চিত করা হয়েছে। বঞ্চিত করা হয়েছিল তাদেরকে তাদের অর্থনৈতিক অধিকার থেকে।

গত দেড় দশকে ফ্যাসিস্ট শাসনামলে অর্থনৈতিক লুটপাটের চিত্রও তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা দেখেছি কিভাবে দেশের শিল্প কলকারখানাগুলোকে ধীরে ধীরে বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল এবং একপর্যায়ে গিয়ে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছিল এবং বিদেশি জিনিস এনে কিভাবে এই দেশে আমদানি নির্ভর করা হয়েছিল। এই দেশের পুরো অর্থনীতিকে কিভাবে ধীরে ধীরে আমদানি নির্ভর করে গড়ে তোলা হয়েছিল। আমরা দেখেছি কিভাবে স্বৈরাচারের সময় এই দেশ থেকে এই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছিল। আমরা দেখেছি এই দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে স্বৈরাচারের এক যুগ সময়ে কিভাবে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছিল। যে কয়টি সেক্টরের কথা আপনাদের সামনে আমি তুলে ধরলাম এই প্রত্যেকটি সেক্টরে হাজারো লাখ কোটি শ্রমিক কাজ করে এবং এভাবেই দেশের প্রত্যেকটি সেক্টরকে ধ্বংস করার মাধ্যমে বাংলাদেশের সকল শ্রেণীর মানুষকে আঘাত করা হয়েছিল বাংলাদেশের শ্রমিকদের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হয়েছিল। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে বন্ধ কলকারখানা খুলে দেয়া নিয়ে সরকারের উদ্যোগের কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ইনশাআল্লাহ বাংলাদেশের অনেকগুলো কলকারখানা যেগুলো বন্ধ হয়ে গিয়েছে বিগত বছরগুলোতে পর্যায়ক্রমিকভাবে আমরা সেই কারখানাগুলোকে আবার চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। শুধু এই বন্ধ কলকারখানা চালু হলেই সকল শ্রমিকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে না আমরা জানি। এই শ্রমিকদের পাশাপাশি আরো লাখ লাখ বেকার এখন এই দেশে রয়ে গিয়েছে। তাদের জন্য দেশে আমাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদেরকে বিদেশে তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে এবং সেইজন্যই আমরা বিদেশী বিনিয়োগকারীসহ দেশীয় বিনিয়োগকারীদের সাথে এরই ভেতরে আলোপ আলোচনা শুরু করেছি। আমরা তাদেরকে উৎসাহ প্রদান করছি। আমরা তাদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছি। যাতে করে সে বিনিয়োগকারীরা সে দেশীই হোক অথবা বিদেশই হোক এই দেশে কলকারখানা তৈরি করে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার বিএনপি সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার এবং সেইজন্য এই সরকার গঠিত হওয়ার পরে সাথে সাথেই আমি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরকে সাথে নিয়ে বসেছি এবং নির্দেশনা দিয়েছি এবং আপনারা জানলে খুশি হবেন এই সপ্তাহে গত এক মাস আগে আমি নির্দেশনা দিয়েছি যে, কিভাবে আমরা কত দ্রুত বন্ধ কলকারখানার কোনটি কোনটি চালু করতে পারব। যাতে আবার সেই সকল শ্রমিক যারা কর্মসংস্থান হারিয়ে বেকার হয়ে গিয়েছিল সেই সকল শ্রমিকের কর্মের ব্যবস্থা আমরা করতে পারি।

উচ্ছেদ হওয়া হকারদের পুনর্বাসন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা দেখেছেন আমরা বিষয়টি সম্পর্কে ওয়াকিফহাল আছি ঢাকা শহরের বিভিন্ন রাস্তায় আপনারা দেখেছেন হকার ভাইয়েরা ছিল। কিন্তু যানজটসহ সাধারণ মানুষের চলাফেরার অসুবিধার জন্য আমরা হকার ভাইদেরকে সরিয়ে দিয়েছি কিন্তু আমরা এটাও বুঝি তারাও মানুষ তাদেরও পরিবার আছে তাদেরকেও চলতে হবে খেয়ে পড়ে তাদেরকেও বাঁচতে হবে। সেজন্যই আমি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সাথে সাথে নির্দেশনা দিয়েছি যে, হকার উচ্ছেদ করলে শুধু হবে না এই মানুষগুলো যাতে খেয়ে পরে বাঁচতে পারে কর্মসংস্থান হয়, ব্যবসা করতে পারে তারও ব্যবস্থা করতে হবে এবং আপনারা দেখেছেন এরই মধ্যে তার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, আমরা জানি সকলকে হয়তো একসাথে আমরা ব্যবস্থা করে দিতে পারব না, পর্যায়ক্রমিকভাবে আমরা ব্যবস্থা করব কিন্তু ইনশাআল্লাহ আপনাদের নির্বাচিত সরকার অবশ্যই মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবে এবং সে কারণেই আপনারা দেখেছেন গতকাল থেকে উত্তর মহানগরী এবং দক্ষিণ মহানগরীতে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছে। আমরা পর্যায়ক্রমিকভাবে যারা হকার ভাই তারা যাতে শান্তিতে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে হয় কোনোরকম বিশৃঙ্খলার মধ্যে যাতে তাদেরকে পড়তে না হয় সেজন্য বিভিন্ন জায়গা ঠিক করে তাদেরকে ধীরে ধীরে সেই জায়গায় আমরা পুনর্বাসনের চেষ্টা করছি।

দেশ গড়তে নিজেকে এবং নিজের মন্ত্রিসভাকে শ্রমিক হিসেবে ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, আজ কথা একটাই, কাজ একটাই, সেটি হচ্ছে দেশ গড়া। সেজন্যই শ্রমিকরা কেউ কারখানায় কাজ করেন, কেউ ইমারত নির্মাণ করেন, কেউ জুটমিলে কাজ করেন, কেউ পোশাক শিল্পে কাজ করেন, কেউ হয়ত রেস্টুরেন্টে কাজ করেন, কেউ হয়তো পরিবহনে কাজ করেন। বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন শ্রেণীতে শ্রমিক ভাইয়েরা আছেন। আজ সেই সকল শ্রমিক ভাইদের উদ্দেশে আমি বলতে চাই, আপনারা যেমন বিভিন্ন সেক্টরে কাজ করেন। আপনাদের খাতায় আমি আমার নামটি লেখাতে চাই একজন শ্রমিক হিসেবে।’

এর কারণ ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনি যেরকম ইমারত শ্রমিক হিসেবে এই ইমারতটি গড়ে তুলছেন, এই দালানটি গড়ে তুলছেন, আপনি একজন পাট শ্রমিক হিসেবে পাঠকলের উৎপাদন বৃদ্ধি করছেন, আপনি একজন পোশাক শিল্প শ্রমিক হিসেবে পোশাক শিল্পের উৎপাদন বৃদ্ধি করছেন। ঠিক একইভাবে আপনার খাতায় নাম লিখিয়ে আমিও দেশ গড়ার কাজে নিয়োজিত করতে চাই নিজেকে। একইসাথে আমি মন্ত্রিপরিষদের সকল সদস্যের নাম শ্রমিক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে চাই। কারণ আপনারা যেমন একেকটি জিনিস গড়ে তুলছেন আমরা আপনাদের পাশে থেকে দেশ গড়ার কাজে হাত দিতে চাই, দেশকে গড়তে চাই।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, দেশের মানুষ পরিশ্রম করে যেভাবে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে তাদের সাথে থেকে তাদের পাশে থেকে আমরা দেশকে গড়ে তুলতে চাই। এজন্যই আমাদের নির্বাচনের সময় স্লোগান ছিল ‘করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’। এটি হচ্ছে আমাদের স্লোগান, এটি হচ্ছে আমাদের বর্তমান স্লোগান, এইটি হচ্ছে আমাদের ভবিষ্যৎ স্লোগান। যেই স্লোগানের বলে বলিয়ান হয় ইনশাআল্লাহ আমরা এই প্রিয় মাতৃভূমিকে আমাদের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলতে পারব।

তিনি বলেন, আজকের এই মহান আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসে আসুন, আমরা আজকে প্রত্যেকে এখানে প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করি, প্রত্যেকে শপথ গ্রহণ করি যেই বাংলাদেশের প্রত্যাশা প্রত্যেকটি নারী পুরুষ, প্রত্যেকটি মানুষের মনে রয়েছে সেই প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য আসুন আমরা প্রত্যেকে একেকজন দেশগড়া শ্রমিক হিসেবে আমাদের জীবনের বাকি দিনগুলোকে আমরা অতিবাহিত করব।

সমাবেশের শ্রমিকদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কি ভাইয়েরা আমরা কি এই প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করতে পারি? দেশ গড়ায় শ্রমিক হিসেবে কি আপনারা নাম লেখাতে রাজি আছেন?

শ্রমিকরা সমস্বরে ‘হ্যাঁ’ সূচক জবাব দিলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আলহামদুলিল্লাহ। মনে রাখতে হবে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সেই একটি কথা- প্রথম বাংলাদেশ আমার, শেষ বাংলাদেশ। জীবন বাংলাদেশ আমার, মরণ বাংলাদেশ। আসুন এই বাংলাদেশই আমাদের প্রথম ঠিকানা, এই বাংলাদেশই আমাদের শেষ ঠিকানা। এটি আমাদের প্রথম এবং শেষ ঠিকানা। আজ আবারো দেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে, দেশ গড়ার শপথ ব্যক্ত করছি।

শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসেনের সভাপতিত্বে ও প্রচার সম্পাদক মনজরুল ইসলাম মনজুর সঞ্চালনায় সমাবেশে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য আমান উল্লাহ আমান, আবদুস সালাম, শ্রমিক দলের প্রধান সমন্বয়কারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, বিএনপি মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনু, উত্তরের আহ্বায়ক আমিনুল ইসলাম, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টন, যুবদলের সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন, ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব, বিএনপির হুমায়ুন কবির খান, ফিরোজ উজ জামান মামুন মোল্লা, শ্রমিক দলের সালাহউদ্দিন সরকার, মেহেদী আলী খান, মোস্তাফিজুল করীম মজুমদার, আবুল খায়ের খাজা, সুমন ভূঁইয়া প্রমুখ বক্তব্য দেন।

লালটুপি মাথায় হাজারো নেতাকর্মী ব্যানার নিয়ে এই সমাবেশে উপস্থিত হয়। কাকরাইল থেকে ফকিরাপুল মোড় পর্যন্ত হাজার হাজার শ্রমিকদের উপস্থিতিতে সমাবেশে জনসমুদ্রে রুপ নেয়।

বক্তব্যের শুরুতে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে এবং ৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, গত দেড় দশকে ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আন্দোলন নিহত শ্রমিকদের রূহের মাগফেরাত কামনা করে তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন প্রধানমন্ত্রী।