বুধবার । মে ২৭, ২০২৬
বাংলা টেলিগ্রাফ ডেস্ক দেশজুড়ে ২৭ মে ২০২৬, ১০:৫৫ পূর্বাহ্ন
শেয়ার

গুপ্তধনের লোভে কোটি টাকা হারিয়ে নিঃস্ব সৌদি প্রবাসী নুরুল আলম


arrest

গুপ্তধনের প্রলোভনে সৌদি প্রবাসীর কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে গ্রেফতার ৩

“৩৪ বছরের প্রবাস জীবনের সব সঞ্চয় ও ব্যবসা হারিয়ে আমি এখন দিশেহারা। প্রতারকদের কারণে আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছি।” চট্টগ্রামের আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেওয়ার সময় এভাবেই কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিজের জীবনের সর্বনাশের কথা বলছিলেন সৌদি প্রবাসী ব্যবসায়ী মো. নুরুল আলম (৫৫)। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে মরুভূমির তপ্ত বালুতে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে যে স্বপ্ন তিনি বুনেছিলেন, এক সুপরিকল্পিত প্রতারণার জালে পড়ে আজ তা সম্পূর্ণ ধ্বংস।

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী থানায় দায়ের হওয়া একটি আলোচিত প্রতারণা ও অপহরণ মামলায় (মামলা নং-০৪, তারিখ: ০২/০৫/২০২৬) সম্প্রতি তিনি আদালতে এই জবানবন্দি দেন। দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় দায়ের হওয়া এই মামলার তদন্তে উঠে এসেছে, কীভাবে একজন রেমিট্যান্স যোদ্ধার সরলতার সুযোগ নিয়ে তাঁর কোটি কোটি টাকা, জমি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হাতিয়ে নিয়েছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র।

ভিকটিম মো. নুরুল আলম চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার বাসিন্দা। একসময় তিনি ছিলেন কঠোর পরিশ্রমি এক প্রবাসী উদ্যোক্তা। প্রবাসে থেকে প্রতি মাসে দেশে পাঠাতেন কষ্টার্জিত রেমিট্যান্স। সেই অর্থেই দেশে গড়ে তুলেছিলেন মাথা গোঁজার ঠাঁই, কিনেছিলেন জমি ও দোকান। কিন্তু প্রধান আসামি মোহাম্মদ শুয়াইব তাঁর আত্মীয় হওয়ায় শুরু থেকেই তাঁর ওপর অন্ধ বিশ্বাস ছিল নুরুল আলমের। সেই আস্থার সুযোগ নিয়ে ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত জমি কেনা ও ব্যবসার কথা বলে ধাপে ধাপে বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয় শুয়াইব।

২০২৩ সালের শেষ দিকে প্রতারক শুয়াইব প্রবাসীকে তাঁর “ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার” টোপ ফেলে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদের একটি ট্রাভেল অফিসে নিয়ে যায়। সেখান থেকে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় চকরিয়া ও ডুলাহাজারার পাহাড়ি এলাকায়। সেখানে একটি বিশেষ বোতল দেখিয়ে সেটিকে অত্যন্ত মূল্যবান ‘গুপ্তধন’ বলে দাবি করে চক্রটি। আলোতে ধরলে বিশেষ কৌশলে আলো নিভে যাওয়ার মতো বৈজ্ঞানিক ট্রিকস ব্যবহার করে প্রবাসীর মনস্তত্ত্ব নিয়ে খেলা করে তারা। দীর্ঘদিন প্রবাসে কাটানো সরলমনা নুরুল আলম বুঝতেই পারেননি এটি একটি সুপরিকল্পিত ফাঁদ।

এরপর শুরু হয় টাকার চাপ। পাহাড়ি লোক ও বিদেশি ক্রেতাদের খরচের দোহাই দিয়ে প্রথমে ১ কোটি এবং পরে ধাপে ধাপে আরও প্রায় ৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় চক্রটি। আগের বিনিয়োগ করা টাকা ফেরত পাওয়ার আশায় তিনি নিজের আগ্রাবাদের ১০৬ নম্বর দোকানটি পর্যন্ত ৬৫ লাখ টাকায় বিক্রি করে প্রতারকদের অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেন। এরপরও ক্ষান্ত হয়নি তারা; টেরিবাজারের চারটি দোকান এবং কক্সবাজারের খুরুশকুল এলাকার ২৪ শতক জমি তিন মাসের জন্য বন্ধক দিতে বাধ্য করা হয় এই প্রবাসীকে। আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, গুপ্তধন বিক্রি হলেই সব ফেরত দেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে সেসব আমমোক্তারনামা ও দলিলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় চক্রটি।

চলতি বছরের ২৬ এপ্রিল আগ্রাবাদ হোটেলে বিদেশি ক্রেতার সঙ্গে বৈঠকের কথা বলে এই প্রবাসীকে চট্টগ্রামে আনা হয়। পথে মইজ্জারটেক এলাকায় বাস থামিয়ে ১০–১২ জন মিলে তাঁকে অপহরণ করে জঙ্গলে নিয়ে যায়। সেখানে প্রবাসীকে প্রচণ্ড মারধর করে তাঁর কাছ থেকে তথাকথিত ‘গুপ্তধন’, ১৮০০ মার্কিন ডলার, ২২৩০ সৌদি রিয়াল, নগদ টাকা এবং ব্যাংকের চেকবই ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায় তারা।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কর্ণফুলী থানার এসআই পরিতোষ দাশ জানান, এটি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র। চক্রের অন্যতম হোতা মাহফুজুর রহমানের ১৪টি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও চেকবই উদ্ধার করা হয়েছে, যেখানে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের প্রমাণ মিলেছে। এই ঘটনায় পুলিশ ইতিমধ্যেই প্রধান আসামি মোহাম্মদ শুয়াইবসহ মাহফুজুর রহমান ও আমিন হোসেন নামের তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে। প্রধান আসামি শুয়াইব আদালতে নিজের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দিও দিয়েছেন।

দীর্ঘ ৩৪ বছর পরদেশে পড়ে থেকে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখা মো. নুরুল আলম আজ নিজের দেশে এসেই নিঃস্ব। আদালতে দেওয়া তাঁর জবানবন্দির প্রতিটি বাক্যে ফুটে উঠেছে একজন প্রবাসীর দীর্ঘ জীবনের কষ্ট, বিশ্বাসভঙ্গের বেদনা এবং সর্বস্ব হারানোর হাহাকার। সব হারিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়া এই রেমিট্যান্স যোদ্ধা এখন শুধু আদালতের বারান্দায় ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় দিন গুনছেন।