
যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্প প্রশাসন যে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল, এখন সেগুলো অনেকটাই বাস্তবতা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সামরিক সংঘাত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন জনমত জরিপ বলছে, অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক এই যুদ্ধ দ্রুত শেষ হোক সেটাই চান। একই সঙ্গে তারা বিশ্বাস করছেন না যে যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র বড় কোনো কৌশলগত সাফল্য অর্জন করতে পারবে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্প প্রশাসন যে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল, এখন সেগুলো অনেকটাই বাস্তবতা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। ফলে সম্মান রক্ষা করে সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার পথ ক্রমেই সংকীর্ণ হয়ে পড়ছে।
যুদ্ধ নিয়ে ক্লান্ত মার্কিন জনগণ
সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, বেশিরভাগ আমেরিকান দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান সমর্থন করছেন না। ফক্স নিউজের এক জরিপ অনুযায়ী, নিবন্ধিত ভোটারদের মাত্র ৩৯ শতাংশ মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়া উচিত। বিপরীতে ৬১ শতাংশ চান নির্দিষ্ট সীমিত সময়ের মধ্যে যুদ্ধ শেষ করা হোক।
অন্যদিকে নিউইয়র্ক টাইমস-সিয়েনা কলেজের জরিপে ৫২ শতাংশ ভোটার বলেছেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চুক্তি না হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান বন্ধ করা উচিত।
মাত্র ৩৭ শতাংশ ভোটার বলেছেন, কোনো সমঝোতা না হলে আবারও সামরিক অভিযান শুরু করা উচিত।
সফলতা নিয়ে বড় সংশয়
জরিপগুলোতে আরও দেখা গেছে, আমেরিকানদের বড় অংশ বিশ্বাস করেন না যে এই যুদ্ধ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি থামাতে কার্যকর হবে। নিউইয়র্ক টাইমস-সিয়েনা জরিপে মাত্র ২২ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, যুদ্ধ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করতে ‘খুব সফল’ হবে। আরও ১৮ শতাংশ বলেছেন ‘কিছুটা সফল’ হতে পারে। তবে অর্ধেকের বেশি মানুষ মনে করেন, শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধ ব্যর্থ হবে।
ওয়াশিংটন পোস্ট-এবিসি নিউজের আরেক জরিপে ৬৫ শতাংশ আমেরিকান বলেছেন, যুদ্ধ শেষের সম্ভাব্য কোনো চুক্তি ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে থামাতে পারবে—এ বিষয়ে তারা আত্মবিশ্বাসী নন।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ীও, অধিকাংশ মানুষ ইরান ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য অর্জন নিয়ে সন্দিহান।
জরিপে অংশ নেওয়া ভোটারদের ৫৫ শতাংশ মনে করেন, এই যুদ্ধের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূল্য যুক্তরাষ্ট্রের জন্য লাভজনক হবে না। মাত্র ২১ শতাংশ বলেছেন, যুদ্ধের খরচ গ্রহণযোগ্য হতে পারে।
অনেকের মতে, যুদ্ধ বরং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।
ওয়াশিংটন পোস্ট-এবিসি নিউজের জরিপ অনুযায়ী—
৬১ শতাংশ মনে করেন, এই যুদ্ধ আমেরিকানদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী হামলার ঝুঁকি বাড়িয়েছে
৫৬ শতাংশের মতে, এতে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে
৪৯ শতাংশ মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা আরও খারাপ হবে
ট্রাম্পের অবস্থানের পরিবর্তন
সংঘাতের শুরুতে ট্রাম্প ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ ছাড়া কিছু মেনে নেবেন না বলে মন্তব্য করেছিলেন। এছাড়া তিনি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করা এবং হামাস ও হিজবুল্লাহর মতো গোষ্ঠীগুলোর অর্থায়ন বন্ধ করার কথাও বলেছিলেন।
কিন্তু সাম্প্রতিক আলোচনার শর্তগুলো দেখে বিশ্লেষকদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র এখন আগের কঠোর অবস্থান থেকে অনেকটা সরে এসেছে।
সমালোচকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের বড় দুটি ভুল ছিল—
১. যুদ্ধ শেষ করার জন্য শুরু থেকেই বাস্তবসম্মত ও পরিষ্কার পরিকল্পনা না থাকা।
২. মার্কিন জনগণের কাছে যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা যথেষ্টভাবে তুলে ধরতে ব্যর্থ হওয়া।
বিশ্লেষকদের ভাষায়, ট্রাম্প এত উঁচু মাত্রার সাফল্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে এখন তা অর্জন করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে রিপাবলিকান পার্টির জন্যও তা বড় রাজনৈতিক বোঝা হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে যদি প্রত্যাশিত ফল না আসে, তাহলে আগামী নির্বাচনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এ অবস্থায় অনেকের ধারণা, দ্রুত কোনো সমঝোতায় পৌঁছে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসাই ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে কম ক্ষতিকর পথ হতে পারে।
সিএনএন
বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প








































