
গত কয়েক দশকে তাইওয়ান যুক্তরাষ্ট্র থেকে যুদ্ধবিমান, ট্যাংক, ক্ষেপণাস্ত্র ও নৌ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সহ কয়েক বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র কিনেছে
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি হলো তাইওয়ান। বিশেষ করে তাইওয়ানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রি দীর্ঘদিন ধরেই বেইজিংয়ের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে আছে।
সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকের পর বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। বৈঠকে শি সতর্ক করে বলেছেন, তাইওয়ান ইস্যু ভুলভাবে পরিচালিত হলে তা ‘খুবই বিপজ্জনক পরিস্থিতি’ তৈরি করতে পারে।
এর মধ্যেই ট্রাম্প তাইওয়ানের জন্য কংগ্রেস অনুমোদিত ১৪ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র চুক্তিতে সই স্থগিত রেখেছেন। তিনি এটিকে চীনের সঙ্গে আলোচনায় একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ দর-কষাকষির হাতিয়ার’ হিসেবে দেখছেন বলে জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের একজন মুখপাত্র অবশ্য বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে পেন্টাগন নিজেদের অস্ত্র মজুত নিশ্চিত করতেই চুক্তি অনুমোদনে দেরি করছে। তবে তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বিলম্বের কথা জানায়নি।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ তাইওয়ান?
চীন তাইওয়ানকে নিজের ভূখণ্ডের অংশ মনে করে এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার কথাও প্রায়শ উচ্চারণ করে।
১৯৭৯ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের প্রশাসন তাইপের পরিবর্তে বেইজিংকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেয়। তাইপের সরকার তখন যেমন আনুষ্ঠানিকভাবে ‘রিপাবলিক অব চায়না (ROC)’ নামে পরিচিত ছিল, এখনও তেমনই রয়েছে। অন্যদিকে বেইজিং পরিচিত ‘পিপলস রিপাবলিক অব চায়না (PRC)’ নামে। এই সিদ্ধান্তের ফলে ওয়াশিংটন ও তাইপের মধ্যকার পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির অবসান ঘটে। বিষয়টি সে সময় মার্কিন কংগ্রেসের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি করে। পরে কংগ্রেস দ্রুত ‘তাইওয়ান রিলেশনস অ্যাক্ট’ পাস করে, যাতে তাইওয়ান প্রণালিকে ঘিরে সম্পর্কের বিষয়ে নিজেদের ভূমিকা নিশ্চিত করা হয়।
অস্ত্র সরবরাহে দীর্ঘ বিলম্ব
গত কয়েক দশকে তাইওয়ান যুক্তরাষ্ট্র থেকে যুদ্ধবিমান, ট্যাংক, ক্ষেপণাস্ত্র ও নৌ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সহ কয়েক বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র কিনেছে। তবে এসব অস্ত্রের অনেকগুলোই সময়মতো পৌঁছায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, বেশিরভাগ অস্ত্র অর্ডারের পর তৈরি করতে হয়। ফলে উৎপাদন সক্ষমতা, যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব সামরিক চাহিদা ও বৈশ্বিক অগ্রাধিকার অনুযায়ী সরবরাহে দীর্ঘ সময় লাগে।
উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালে অর্ডার করা অ্যাব্রামস ট্যাংক তাইওয়ানে পৌঁছাতে সময় লেগেছে সাড়ে সাত বছরেরও বেশি সময়। একইভাবে এফ-১৬ যুদ্ধবিমান সরবরাহও এখনো সম্পূর্ণ হয়নি।
বর্তমানে তাইওয়ানের প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র সরবরাহ এখনো বাকি রয়েছে বলে জানা গেছে।
চীনের আপত্তি কোথায়?
চীন মনে করে, তাইওয়ানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রি ‘এক চীন নীতি’ লঙ্ঘন করছে এবং এটি আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে, এসব অস্ত্র কেবল তাইওয়ানের আত্মরক্ষার জন্য দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বিলম্ব তাইওয়ানের সামরিক সক্ষমতায় তাৎক্ষণিক বড় প্রভাব ফেলবে না। কারণ নতুন অস্ত্র সরবরাহ যেকোনোভাবেই কয়েক বছর সময় নিত। তবে এটি ভবিষ্যৎ সামরিক পরিকল্পনা ও প্রতিরক্ষা সংস্কারে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ও ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অস্ত্র চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় তাইওয়ানের অর্ডার আরও পিছিয়ে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।


































