
যে নারকেলের ছোবড়াকে এক দশক আগেও উনুন জ্বালাবার সামান্য উপাদান কিংবা স্রেফ আবর্জনা ভাবা হতো, সময়ের ব্যবধানে আজ তা-ই হয়ে উঠেছে রূপালী অর্থনীতির অন্যতম হাতিয়ার। উপকূলীয় জেলা লক্ষ্মীপুরে ফেলনা এই কাঁচামালকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক বিশাল বাণিজ্যিক বাজার, যা পুরো জেলার অর্থনৈতিক চালচিত্র বদলে দিতে শুরু করেছে। জাজিম, তোশক, বিলাসী সোফার গদি থেকে শুরু করে আধুনিক কৃষির দড়ি ও জুতো—সবখানেই এখন রাজত্ব করছে নারকেলের এই আঁশ।
কৃষি দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, লক্ষ্মীপুরের প্রায় ২ হাজার ৭৩৫ হেক্টর দীর্ঘ নারকেল বাগান এবং গ্রামীণ বসতবাড়ির আঙিনা থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রায় ২৬ হাজার মেট্রিক টন নারকেল উৎপাদিত হয়েছে। শুধু ডাব ও শুকনো নারকেল বিক্রি করেই যেখানে বছরে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা ঘরে তুলছেন স্থানীয়রা, সেখানে এই ছোবড়ার উপজাত বা বাই-প্রোডাক্ট যোগ করছে এক নতুন মাত্রা।
বর্তমানে সদর উপজেলার দালাল বাজার, মান্দারী, চন্দ্রগঞ্জ থেকে শুরু করে রায়পুরের হায়দরগঞ্জ, রামগঞ্জের মীরগঞ্জ, পানপাড়া এবং কমলনগরের হাজিরহাট ও রামগতির আলেকজান্ডারের মতো উপকূলীয় এলাকাগুলোতে প্রায় ৩০টি ছোট-বড় প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা গড়ে উঠেছে। এসব কারখানায় স্থানীয় আড়তদারদের কাছ থেকে মাত্র ২-৩ টাকায় প্রতিটি কাঁচা ছোবড়া কিনে তা যন্ত্রের সাহায্যে কেটে কুচি করা হয়।

এরপর নারী ও পুরুষ শ্রমিকদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় পৃথক করা হয় ফাইবার বা আঁশ। সেই আঁশ রোদে শুকিয়ে ২০ কেজির বিশেষ গাঁট বা ‘বেল’ তৈরি করে ট্রাকভর্তি করে চলে যায় ঢাকা, খুলনা, কক্সবাজার কিংবা শরীয়তপুরের বড় বড় গদি ও তোশক উৎপাদনকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানে। প্রতি ট্রাক আঁশ বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকায়।
ব্যবসায়িক সূত্রগুলো বলছে, একেকটি কারখানা থেকে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৩ লাখ টাকার আঁশ ও উপজাত বিক্রি হয়। সেই হিসাবে এই ৩০টি কারখানা থেকে বছরে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকার অপ্রচলিত পণ্যের অভ্যন্তরীণ বাজার তৈরি হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, আঁশ ছাড়ানোর পর যে বিপুল পরিমাণ গুঁড়ো বা ‘কোকোডাস্ট’ বের হয়, তা এখন ছাদবাগান এবং মাটিহীন আধুনিক কৃষিকাজে দারুণ সাড়া ফেলেছে। সরকারি তথ্যমতে, এই পরিবেশবান্ধব পণ্যটি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে, যা থেকে আসছে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা।
এই সম্ভাবনাময় খাতের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে জেলা বিসিক কার্যালয়। ব্যবসায়ীদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির পাশাপাশি নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ক্ষুদ্রঋণ, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং বিসিকের অধীনে নিবন্ধনের বিশেষ সুযোগ রাখা হয়েছে। সঠিক সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা আর আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে, নারকেলের এই বর্জ্যই আগামী দিনে দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাত হয়ে উঠবে বলে আশা করছেন স্থানীয় সংশ্লিষ্টরা।
বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প











































