বুধবার । এপ্রিল ২৯, ২০২৬
বাংলা টেলিগ্রাফ ডেস্ক উদ্যোগ ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ৩:৪১ অপরাহ্ন
শেয়ার

ফরিদার শীতলপাটির ব্যাগ এখন গ্লোবাল ফ্যাশন


ফরিদা পারভীন

ফরিদা পারভীন

একসময় গ্রামবাংলার প্রতিটি ঘরে বাঁশ, বেত আর মাটির আসবাবের যে স্নিগ্ধতা ছিল, সময়ের আবর্তে প্লাস্টিক আর পলিথিনের আগ্রাসনে তা যেন আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। কিন্তু এই কৃত্রিমতার যুগেও কেউ কেউ স্বপ্ন দেখেন প্রকৃতির হারানো ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনার। তেমনই একজন স্বপ্নদ্রষ্টা নারী, যিনি চেয়েছিলেন এমন কিছু করতে যা কেবল নিজের জন্য নয় বরং বদলে দেবে আরও দশটা মানুষের জীবন। যার হাত ধরে বরিশালের ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটি আজ পাড়ি জমাচ্ছে সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারে।   

প্রকৃতির প্রতি এক অদ্ভুত টান নিয়ে বড় হওয়া সেই মেয়েটির দিন কাটত মা আর বড় বোনদের নিপুণ হাতের কাজ দেখে। কখনো সুই-সুতার ফোঁড়ে নকশা তোলা, কখনো আবার স্কুলের কো-কারিকুলাম ক্লাসে সেলাই শেখার প্রবল আগ্রহ—সবই যেন ছিল ভবিষ্যতের এক নীরব প্রস্তুতি। বাবার উৎসাহে ঘরে আসা প্রথম সেলাই মেশিনটিই হয়ে উঠেছিল তার স্বপ্ন বোনার প্রথম হাতিয়ার। প্রকৃতির সবুজ আর মাটির সোঁদা গন্ধে বেড়ে ওঠা কিশোরী, যার দুচোখে ছিল হাজারো মানুষের জীবন বদলে দেওয়ার এক অস্পষ্ট কিন্তু দৃঢ় সংকল্প। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষিতে স্নাতক আর পরিবেশ বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর শেষ করা সেই মেয়েটির নাম ফরিদা পারভীন।

শীতল পাটির ব্যাগ

২০০৯ সালে বিয়ের পিঁড়িতে বসা এবং পরে মা হওয়ার পর সংসারের চার দেওয়ালে নিজেকে কিছুটা গুটিয়ে নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু মনের কোণে সুপ্ত থাকা সেই স্বাবলম্বী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা তাকে শান্তি দিত না। তিনি অনুভব করেছিলেন, সংসারের সহস্র কাজের বিনিময়েও নিজের পরিচিতি না থাকলে আত্মসম্মান খুঁজে পাওয়া দায়। 

পরিবেশ বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী হিসেবে তিনি জানতেন, পলিথিনের অভিশাপ থেকে পৃথিবীকে বাঁচাতে পারে কেবল আমাদের ঐতিহ্যের সোনালি আঁশ ‘পাট’। ২০২০ সালে যখন করোনা মহামারিতে স্তব্ধ গোটা বিশ্ব, ঠিক তখনই তিনি নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করলেন। পাটের ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণ নিয়ে শুরু করলেন নিয়মিত লেখালেখি। ইন্টারনেটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গবেষণা করে খুঁজে বের করলেন সুপারির খোলের প্লেট কিংবা বাটির মতো পরিবেশবান্ধব পণ্যের বাজার। তবে তার আসল লক্ষ্য ছিল নিজের শিকড় নিজ জেলা বরিশাল।

শীতল পাটি

শীতল পাটির পার্টি ব্যাগ

স্বামীর দেওয়া দেনমোহর থেকে দুই লাখ টাকা নিয়ে তিনি শুরু করলেন নতুন উদ্যোগ। যে শীতলপাটি কেবল মেঝেতে বিছানোর সামগ্রী হিসেবে পরিচিত ছিল, ফরিদা পারভীন তাকে রূপ দিলেন আধুনিক ফ্যাশনে। পাটির বুননে তৈরি করলেন অপূর্ব সব ‘বোনা ব্যাগ’। শীতলপাটি আর পাটের বহুমুখী ব্যবহারের এই মেলবন্ধন ছিল এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। শুরুতে দক্ষ কারিগর আর ডেলিভারি সমস্যা থাকলেও নিজের ওপর অগাধ বিশ্বাস তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি।

একসময় যে পাটিকর গোষ্ঠী জীবিকার তাগিদে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছিল, ফরিদার এই উদ্যোগ তাদের আবার ফিরিয়ে এনেছে আপন পেশায়। আজ  তার অধীনে ১৬ জন দক্ষ কর্মী নিয়মিত কাজ করছেন। যেখানে একটি বড় পাটি বুনতে এক সপ্তাহ সময় লাগে, সেখানে ফরিদার নকশায় একজন কারিগর দিনে গড়ে দুটি মাঝারি সাইজের আকর্ষণীয় ব্যাগ তৈরি করতে পারছেন। এই পরিবর্তন কেবল অর্থনৈতিক নয় বরং একটি বিলুপ্তপ্রায় শিল্পের পুনর্জন্ম। 

শীতল পাটি

শীতল পাটির টিস্যু বক্স

ইতিমধ্যে তিনি অর্ধশতাধিক ডিজাইনের ব্যাগ তৈরি করেছেন। ফরিদার তৈরি এই দেশীয় নান্দনিক পণ্যের কদর এখন কেবল ঢাকা বা চট্টগ্রামেই সীমাবদ্ধ নেই। বন্ধু ও ক্রেতাদের হাত ধরে তার এই ব্যাগ পৌঁছে গেছে আমেরিকা, লন্ডন, জার্মানি ও ইতালির মতো দেশে। এখন তিনি স্বপ্ন দেখছেন আনুষ্ঠানিক রপ্তানির। কয়েকটি দেশে ইতোমধ্যে স্যাম্পল পাঠানো হয়েছে।

ফরিদা পারভীনের এই গল্প কেবল একজন সফল উদ্যোক্তার নয় বরং এক অদম্য নারীর হার না মানা লড়াইয়ের আখ্যান। তিনি প্রমাণ করেছেন, মেধা আর সদিচ্ছা থাকলে দেনমোহরের সামান্য টাকা দিয়েও বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখা সম্ভব। তার এই শীতলপাটির বুনন আজ বাংলার হাজারো পাটিকরের ঘর আলোকিত করছে আর প্রকৃতি ফিরে পাচ্ছে তার হারানো প্রাণ।

বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প