রবিবার । এপ্রিল ৫, ২০২৬
সেতু ইসরাত উদ্যোগ ৫ এপ্রিল ২০২৬, ৩:৩৫ অপরাহ্ন
শেয়ার

প্রকৃতির রঙে সাজানো এক শিউলির অদম্য পথচলা


আফরোজা সুলতানা

উদ্যোক্তা আফরোজা সুলতানা শিউলি

কারো শরীর যখন প্রতি ২১ দিন অন্তর নতুন রক্তের তৃষ্ণায় হাহাকার করে, কারো হাড়ের মজ্জায় যখন বাসা বাঁধে জটিল ব্যাধি—সাধারণত সেখানে স্বপ্নের সমাধি ঘটে। কিন্তু আফরোজা সুলতানা শিউলি সেই নিয়মের ব্যতিক্রম। তিনি এক জাদুকর, যিনি জীবনের ধূসর ক্যানভাসে প্রকৃতির মায়া মেখে এঁকে চলেছেন সাফল্যের আল্পনা। প্রতিবন্ধকতাকে সঙ্গী করেই তিনি গড়ে তুলেছেন তার স্বপ্নের সাম্রাজ্য ‘যারীন’স ক্রিয়েশন’।

গল্পের শুরুটা ১৯৯৭ সালে, এইচএসসি পরীক্ষার টেবিলে যখন সোনালী ভবিষ্যতের স্বপ্ন বোনার কথা, ঠিক তখনই শিউলির শরীরে ধরা পড়ে ‘থ্যালাসেমিয়া’। চিকিৎসকরা জানালেন, তার হিমোগ্লোবিনের আয়ু মাত্র ২১ দিন। প্রতি মাসেই রক্ত নেওয়ার সেই যন্ত্রণাদায়ক অধ্যায় শুরু হলো। বিছানায় শুয়ে থাকা দিনগুলোতে পড়াশোনা থমকে গেলেও থামেনি তাঁর মনের গতি।

afroza sheuli

নবম সাউথ এশিয়া চায়না কুনমিং ফেয়ারে শিউলি

১৯৯৮ সালে মুক্তিযোদ্ধা বাবার অনুপ্রেরণায় যুব উন্নয়ন থেকে ব্লক-বাটিক ও ন্যাচারাল ডাইংয়ের ওপর প্রশিক্ষণ নেন তিনি। ২০০০ সালে বিয়ের পর উপহার হিসেবে নিজের হাতে বানানো কুশন কভার আর ম্যাট দিয়ে যে সৃজনশীলতার যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজও বহমান।

সংসার, সন্তান আর অসুস্থতার ভিড়ে কাজ মাঝে কিছুটা থমকে যায়। কিন্তু ২০১৫ সালে শিউলির জীবনে আসে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। ধরা পড়ে ‘এমডিএস’ (Myelodysplastic Syndromes) নামক অস্থিমজ্জার এক জটিল রোগ। শুরু হয় কেমোথেরাপির ইনজেকশন আর দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা। বিদেশের হাসপাতালে শুয়ে কেমো নিতে নিতেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন—অসুস্থতাকে নয়, নিজের স্বপ্নকেই গুরুত্ব দেবেন।

২০১৫ সালের ডিসেম্বরে দেশে ফিরেই স্বামীর দেওয়া ৫০ হাজার টাকা মূলধন আর নিজের জমানো সামান্য সঞ্চয় নিয়ে মেয়ের নামে শুরু করেন ‘যারীন’স ক্রিয়েশন’, শুরু হয় এক নতুন যুদ্ধ। 

যখন চারদিকে রাসায়নিক রঙের জয়জয়কার, শিউলি তখন বেছে নিয়েছেন সবচেয়ে কঠিন কিন্তু পরিবেশবান্ধব পথ ‘ন্যাচারাল ডাই’। পেঁয়াজের খোসা, হরিতকী, ডালিমের খোসা, নীল (ইন্ডিগো), খয়ের-সুপারি আর গাঁদা ফুলের নির্যাস থেকে তিনি তৈরি করেন মায়াবী সব রঙ। তাঁর তৈরি প্রতিটি মসলিন, এন্ডিসিল্ক কিংবা সুতি শাড়ি যেন একেকটি জীবন্ত ক্যানভাস।

ZARINS CREATION

এশিয়া চায়না কুনমিং ফেয়ারে ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে শিউলির পণ্য

কেমিক্যালমুক্ত এই পোশাকগুলো শুধু শরীর নয়, ছুঁয়ে যায় পরিধানকারীর মনকেও। তার খিলক্ষেতের কারখানায় এখন কাজ করছেন ৭-৮ জন দক্ষ কর্মী। শিউলির কাছে ফ্যাশন মানে শুধু পোশাক নয় বরং প্রকৃতির প্রতি এক পরম দায়বদ্ধতা। 

শিউলির ব্যবসায়িক সাফল্য এখন আর শুধু অনলাইনেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি নিয়মিত অংশ নিচ্ছেন দেশের বড় বড় এসএমই মেলাসহ বিভিন্ন স্বনামধন্য ইভেন্টগুলোতে। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে ২০২৫ সালে তিনি অংশ নেন নবম সাউথ এশিয়া চায়না কুনমিং ফেয়ারে। খিলক্ষেতের ছোট্ট কারখানা থেকে শুরু হওয়া এই সুবাস আজ পৌঁছে গেছে জাপান, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। 

শিউলি গর্বের সঙ্গে বলেন, ‘আজ পর্যন্ত আমার কোনো পণ্য নিয়ে কেউ অভিযোগ করেনি।’ এই সততা আর নিষ্ঠার স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৪ সালে তিনি অর্জন করেন ‘ট্যালি সলিউশন এমএসএমই ওয়ান্ডার ওম্যান অ্যাওয়ার্ড’। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০২৫ সালের ৪ জুলাই ঢাকার গুলশানে ‘ভেনচুরা মল’-এ ডানা মেলেছে তাঁর প্রথম অফলাইন স্টোর।

afroza sheuli

২০২৪ সালে অর্জন করেন ‘ট্যালি সলিউশন এমএসএমই ওয়ান্ডার ওম্যান অ্যাওয়ার্ড’

নিয়মিত ব্লাড ট্রান্সফিউশন আর কেমোর যন্ত্রণাকে জয় করে তিনি আজ শুধু একজন সফল উদ্যোক্তা নন, তিনি লক্ষ প্রাণের অনুপ্রেরণার নাম। তিনি শিখিয়েছেন,অসুস্থতা কোনো দেয়াল নয় বরং জীবনের যুদ্ধে টিকে থাকার এক অজেয় হাতিয়ার। শিউলি আজ শুধু একটি ব্র্যান্ডের রূপকার নন, তিনি এক অদম্য জীবনযোদ্ধা।

বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প