
বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক জটিল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। একদিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক সংঘাত, মূল্যস্ফীতি এবং জ্বালানি সংকট; অন্যদিকে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও সামাজিক ন্যায্যতার প্রশ্ন। এমন বাস্তবতায় প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট কেবল একটি আর্থিক দলিল নয়, বরং রাষ্ট্রের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক দর্শনের একটি সুস্পষ্ট ঘোষণা।
এই বাজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো উন্নয়নকে কেবল অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ না রেখে জনগণের কল্যাণ, কর্মসংস্থান, সুশাসন এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের সঙ্গে যুক্ত করার প্রচেষ্টা। অর্থমন্ত্রী যে চারটি নীতিকে বিনিয়োগ ও সম্পদ ব্যবস্থাপনার ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, তা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চিন্তাধারায় একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
দীর্ঘদিন ধরে আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনায় প্রকল্প গ্রহণের সংখ্যা ও ব্যয়ের পরিমাণকে সাফল্যের সূচক হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কিন্তু এবার ‘ভ্যালু ফর মানি’ বা সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ কার্যকর ব্যবহারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এটি মূলত রাজনৈতিক অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেয়—জনগণের অর্থ জনগণের জন্য কতটা কার্যকরভাবে ব্যয় হচ্ছে।
বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রায় বহু বড় প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে, কিন্তু সব প্রকল্প সমান অর্থনৈতিক সুফল বয়ে আনেনি। ফলে আরওআই বা রিটার্ন অফ ইনভেস্টমেন্ট অর্থাৎ বিনিয়োগের অর্থনৈতিক প্রতিফল মূল্যায়নের বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর মাধ্যমে উন্নয়ন ব্যয়ের রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার পরিবর্তে অর্থনৈতিক কার্যকারিতাকে মূল্যায়নের সংস্কৃতি গড়ে উঠতে পারে।
কর্মসংস্থানকে বাজেটের অন্যতম কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা বর্তমান বাস্তবতায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী একদিকে সবচেয়ে বড় শক্তি, অন্যদিকে সঠিক কর্মসংস্থান না হলে এটি সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণও হতে পারে। তাই সরকারি বিনিয়োগের সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রত্যক্ষ সম্পর্ক স্থাপনের প্রচেষ্টা অর্থনীতির পাশাপাশি সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবেশগত বিবেচনাকে বিনিয়োগ নীতির অংশ করা বাংলাদেশের জন্য একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। ফলে উন্নয়ন ও পরিবেশকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরিপূরক হিসেবে দেখার এই দৃষ্টিভঙ্গি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।
বাজেটের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো সরকারের ঘোষিত থ্রি আর স্ট্র্যাটেজি। রাজনৈতিক অর্থনীতির ভাষায় এটি মূলত একটি ধাপে ধাপে রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠন কর্মসূচি।
প্রথম ধাপ ‘রিকভারি এন্ড স্টাবিলাইজেশন’ মূলত সংকট মোকাবিলার কর্মপরিকল্পনা। অর্থনীতিতে আস্থা ফিরিয়ে আনা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এই পর্যায়ের মূল লক্ষ্য। বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি সরকারের জন্য সবচেয়ে তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
দ্বিতীয় ধাপ ‘রেস্টোরেশন’ অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো দূর করার উদ্যোগ। ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি ছাড়া এই ধাপ সফল করা সম্ভব নয়।
তৃতীয় ধাপ ‘রিকন্সট্রাকশন ফর এসকেলেরশন’ সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী কর্মসূচি। এর লক্ষ্য শুধু প্রবৃদ্ধি অর্জন নয়, বরং এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামো নির্মাণ করা যা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সক্ষম হবে। উন্নয়নশীল দেশ থেকে উন্নত অর্থনীতির পথে বাংলাদেশের যাত্রার জন্য এই ধাপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাজেটে নির্ধারিত দশটি অগ্রাধিকার বিশ্লেষণ করলে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের রূপরেখা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, কর্মসংস্থান, জ্বালানি নিরাপত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি, পরিবেশ এবং সুশাসনকে একই কাঠামোর মধ্যে আনা হয়েছে।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো ‘ডিরেগুলেশন’ বা বিনিয়ন্ত্রণকরণের ওপর গুরুত্বারোপ। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। যদি এই সংস্কার কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ উভয় ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
একই সঙ্গে আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্বারোপও সময়োপযোগী। খেলাপি ঋণ, দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক খাতের সুশাসনহীনতা দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের কারণ। এই খাতে দৃশ্যমান সংস্কার ছাড়া বাজেটের অন্যান্য লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।
তবে এই বাজেটের সবচেয়ে গভীর রাজনৈতিক তাৎপর্য নিহিত রয়েছে ‘অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন’ ধারণার মধ্যে। বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রায় প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে, কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধির সুফল সব শ্রেণির মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন মূলত সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার একটি প্রচেষ্টা।
ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড (জনমিতিক লভ্যাংশ: কোনো দেশের জনসংখ্যার বয়স কাঠামোর পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা) অর্জনের মাধ্যমে তরুণ জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা, লংজিভিটি ডিভিডেন্ডের (মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে অর্থনীতি ও সমাজে প্রাপ্ত সুবিধা) মাধ্যমে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতাকে কাজে লাগানো এবং ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের (জনমিতিক লভ্যাংশ বা জনবৈজ্ঞানিক মুনাফা) মাধ্যমে উন্নয়নের সুফলকে আরও বিস্তৃত জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় ক্ষেত্রেই সুদূরপ্রসারী।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা স্মরণ রাখা প্রয়োজন। বাজেটের সাফল্য কখনোই কেবল পরিকল্পনার ওপর নির্ভর করে না; বরং নির্ভর করে বাস্তবায়নের সক্ষমতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা এবং জবাবদিহিতার ওপর। বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে নীতিগত ঘোষণার তুলনায় বাস্তবায়নই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সুতরাং, প্রস্তাবিত বাজেটকে একটি নতুন রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক চুক্তি হিসেবেও দেখা যেতে পারে, যেখানে রাষ্ট্র উন্নয়নকে কেবল প্রবৃদ্ধির পরিমাপে নয়, বরং কর্মসংস্থান, সামাজিক ন্যায়বিচার, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে মূল্যায়ন করতে চায়।
যদি ঘোষিত থ্রি আর কৌশল, বিনিয়োগের চার মূলনীতি, দশটি অগ্রাধিকার এবং অর্থনীতির গণতন্ত্রায়নের লক্ষ্যসমূহ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে এই বাজেট বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে একটি নতুন যুগের সূচনা করতে পারে। অন্যথায় এটি আরেকটি উচ্চাভিলাষী কিন্তু অপূর্ণ সম্ভাবনার দলিল হিসেবেই ইতিহাসে স্থান পাবে।














































