
মমতা কী দলবল নিয়ে ফিরে যাবেন নিজের পুরোনো ঘরে, যেই কংগ্রেস পার্টি থেকেই একসময় উত্থান হয়েছিল তার!
একটি কথা এখন ভারতের রাজনীতির অলিন্দে ঘুরে ফিরেই আসছে। মমতা ব্যানার্জীর দল তৃণমূল কংগ্রেস কি ভারতীয় ন্যাশনাল কংগ্রেসের সাথে একিভূত হয়ে যাবে? মমতা ব্যানার্জী কী দলবল নিয়ে ফিরে যাবেন নিজের পুরোনো ঘরে, যেই কংগ্রেস পার্টি থেকেই একসময় উত্থান হয়েছিল তার!
ফিসফাঁস থেকে প্রশ্নটি ধীরে ধীরে জোরালো হচ্ছে। আর জোরালো হওয়ার পেছনে কিছু ক্রিয়া এবং তার পাল্টা প্রতিক্রিয়া কাজ করছে। একদিকে মমতা ব্যানার্জীর দল তৃণমূল কংগ্রেসের বিদ্রোহিরা যখন দল গোছাচ্ছে, নিজেরা নিজেদের মধ্যে ঘনিষ্ট হচ্ছে তখন মমতা ব্যানার্জী তার সবেধন ভাইপো অভিষেক ব্যানার্জীকে নিয়ে ঘনিষ্ট হচ্ছেন, কিংবা ঘনিষ্ট হওয়ার চেষ্টা করছেন কংগ্রেস নেতৃত্বের সঙ্গে। সেই কংগ্রেস, যে কংগ্রেস তার পুরনো দল, সেই কংগ্রেস, যে কংগ্রেস ভেঙে তৃণমূল কংগ্রেস করেছেন তিনি এবং তারপর কংগ্রেসের কাঁধে ভর রেখে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা এসে কংগ্রেসকেই ভেঙে-চুরে করেছেন ছন্নছড়া।
এতো গেলো পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কংগ্রেসের কথা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিনি জাতীয় পর্যায়েও কংগ্রেসকে নানা ইস্যুতে নাকানি-চুবানি খাইয়েছেন। ভারতে ২০২৪-এর সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে তৃণমূলের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গে জোট করতে চেয়েছিল কংগ্রেস। কিন্তু কংগ্রেসের সেই প্রস্তাব সে সময় অনেকটা অসম্মানের সঙ্গেই উড়িয়ে দিয়েছিলেন মমতা।
কিন্তু দিন বদলেছে। শুধু বদলায়্নি, মমতার এখন ঘোর দুর্দিন। ফলে যে মমতাকে একসময় ডেকেও পাওয়া যেত না, সেই মমতাই এখন স্বউদ্যোগে যাচ্ছেন দিল্লির দশ জনপথ রোডে কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধীর বাড়িতে। দেখা করছেন তার সঙ্গে। বৈঠক করছেন রাহুল গান্ধীর সঙ্গেও। শুধু মমতাই নন, তার ভাতিজা অভিষেকও রাহুল গান্ধীর সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিচ্ছেন। দুর্দিনে কংগ্রেসকে আঁকড়ে ধরে আবারও ঘুরে দাঁড়াতে চাইছেন মমতা ও অভিষেক।
কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর সঙ্গে মমতা ব্যানার্জীর সম্পর্ক কখনোই তেমন উষ্ণ ছিল না। যা অনেকবারই প্রকাশ্যেও এসেছে। তবে সোনিয়া গান্ধীর ক্ষেত্রে বিষয়টি ব্যতিক্রম। কংগ্রেসে থাকাকালীন রাজীব গান্ধীর অত্যন্ত প্রিয়পাত্রী ছিলেন মমতা। সেই সূত্র ধরেই সনিয়ার সঙ্গে মমতার রসায়ন বরাবরই ভাল। ১৯৯৮ সালে কংগ্রেস ভেঙে তৃণমূল গড়লেও গান্ধী পরিবারের সঙ্গে তার সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে যায়নি। কংগ্রেস পার্টি এবং রাহুল গান্ধীকে নানা সময়ে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে আক্রমণ করলেও সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে বরাবরই সুসম্পর্ক বজায় রেখেছেন মমতা।
ইদানিংকালে অবশ্য কংগ্রেসের রাজনীতিতে সোনিয়া গান্ধী খুব একটা সক্রিয় নন। তবে, সক্রিয় না থাকলেও কংগ্রেসে এখনো শেষ কথা ওই সোনিয়া গান্ধীই। কংগ্রেসের মতো একটি বিশাল এবং পুরনো ও নতুন নেতৃত্বের জটিল রসায়নের দলে সোনিয়া গান্ধী হচ্ছেন সংযোগ সেতুর মতো। ব্যক্তি মানুষ হিসেবে অত্যন্ত উদার সোনিয়া সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে চলতে পছন্দ করেন। এই সুযোগটিই হয়তো নিতে চাইছেন মমতা। কতোটা সফল হবেন তা হয়তো সময়ই বলবে।
কারণ এক্ষেত্রে কিছু প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে চলে আসবে।
মাস খানেক আগে শেষ হওয়া পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে মমতার দল ৮০ আসনে জয়লাভ করে। সেই ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ষাটজনই মমতার হাত ছেড়ে আলাদা হয়ে গেছেন। ভারতের লোকসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের এমপি’র সংখ্যা ২৮ জন। যাদের মধ্যে অন্তত কুড়িজন ঘোষণা দিয়ে মমতার সঙ্গে নেই, হাত মিলিয়েছে ক্ষমতাসীন দল বিজেপি ও তার জোট এনডিএ’র সঙ্গে। ভারতের রাজ্যসভায় দলটির সদস্য ১২ জন। যাদের মধ্যে দুইজন ইতিমধ্যে পদত্যাগ করেছেন। শোনা যাচ্ছে আরও কয়েকজন একই পথে হাঁটবেন। সব মিলিয়ে বিধানসভা, লোকসভা এবং রাজ্যসভায় মমতার দলটি তিন ভাগ হয়েছে। আর তাদের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যই মমতার সঙ্গে নেই। বাকি যারা আছেন তারাও ঠিক কতোটা আছেন তাও স্পষ্ট নয়। কারণ তাদের অনেকেই মুখে কুলুপ এঁটে আছেন। ফলে দলবলসহ কংগ্রেসে যাওয়ার কথা উঠলে সেই দলে আসলে কতজন আছে সেটা বড় প্রশ্ন।
এরপর আসে বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন। কংগ্রেসকে ঘিরে মমতা ব্যানার্জী এবং তার দলের অতীত কর্মকাণ্ডের খতিয়ান নিয়ে যখন সোনিয়া গান্ধী এবং রাহুল গান্ধী বসবেন তখন সন্দেহাতীতভাবে বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নটি সামনে আসবে। মমতা ব্যানার্জীকে কি বিশ্বাস করা যায়? এই পরীক্ষায় মমতা ব্যানার্জীর পাস করার সম্ভাবনা কম। তবে এক্ষেত্রে মমতার সামনে একমাত্র আশার আলো হচ্ছে সোনিয়া গান্ধীর উদার মনোভাব।
কিন্তু এতেও প্রশ্ন শেষ হয়না। মমতার প্রতি সোনিয়া-রাহুল মমতা দেখাতে চাইলেও এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাঁধা হবে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য কংগ্রেসের নেতা-কর্মীরা। যারা মমতার বিগত পনেরো বছরের শাসনামলে তার নানা নিপীড়ন ও অত্যাচার সহ্য করে কংগ্রেসকে রাজ্যটিতে টিকিয়ে রেখেছেন। পনেরো বছরে কংগ্রেসকে ছোট করতে করতে একেবারে শেষ করে দিয়েছেন মমতা। রাজ্যটিতে যারা এখনো কংগ্রেসের পতাকা ধরে আছেন তারা কোনোভাবেই মমতার কংগ্রেসে মিশে যাওয়াকে মেনে নিতে চাইবেন না। তাদের কাছে কংগ্রেস আর তৃণমূল কংগ্রেস তেল আর জলের মতো। যা কখনোই মেশে না, মিশতে পারে না।
কংগ্রেসের দলের নেতা-কর্মীদের আকাঙ্খাকে পাশ কাটিয়ে রাহুল-সোনিয়া কি সেই অসাধ্য সাধন করতে চাইবেন?
রাজনীতিতে অবশ্য শেষ কথা বলে কিছু নেই।
পলাশ মাহবুব: কথাসাহিত্যিক ও নাট্যকার। সম্পাদক, বাংলা টেলিগ্রাফ।















































