
উদ্যোক্তা সিফাত ই জাহান এবং সোহাগ
দিনাজপুরের মেঠো পথ ধরে বেড়ে ওঠা এক তরুণী, যার দুচোখ ভরা ছিল নতুন কিছু সৃষ্টির স্বপ্ন। তিনি সিফাত ই জাহান। ইংরেজি সাহিত্যে উচ্চশিক্ষা আর নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির এমবিএ ডিগ্রি যাঁর ঝুলিতে, তিনি চাইলে কর্পোরেট জগতের মোহে নিজেকে বিলীন করতে পারতেন। কিন্তু তাঁর রক্তে ছিল প্রকৃতির হিলিং ক্ষমতা আর শিকড়ের টান। ছোটবেলায় দাদার হাতে ভেষজ লতাপাতার জাদুকরী ব্যবহার দেখে বড় হওয়া সিফাত জানতেন, নিরাময় লুকিয়ে আছে এই প্রকৃতিতেই। সেই বিশ্বাস আর সৃজনশীলতার হাত ধরেই আজ ডালপালা মেলেছে তাঁর উদ্যোগ ‘সেরেন বাংলাদেশ’।
সিফাতের এই গল্পের শুরুটা ছিল অনেকটা রূপকথার মতো। এক বান্ধবীর প্রবাসী ভাবির চুল পড়ার সমস্যার সমাধানে নিজের হাতে পরম মমতায় কিছু ভেষজ মিশিয়ে তৈরি করে দিলেন তেল। মাত্র ২৮০ টাকার সেই সামান্য বিনিয়োগই ছিল তাঁর জীবনের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। সেই তেলের গুণাগুণে মুগ্ধ হয়ে ফিনল্যান্ড থেকে যখন ৩০ লিটারের বিশাল এক অর্ডার এল, তখন সিফাত বুঝলেন—তাঁর হাতের ছোঁয়ায় আছে বিশদ এক সম্ভাবনা। শিক্ষকতা আর আইন পেশার ব্যস্ততার মাঝেও তিনি বেছে নিলেন অর্গানিক পণ্যকে বিশ্বের দ্বারে পৌঁছে দেওয়ার কঠিন অথচ সুন্দর পথ। ২৮০ টাকার বিনিয়োগে শুরু হলেও বর্তমানে লাখ টাকার উপরে সেল রয়েছে সিফাতের এইসকল অর্গানিক পন্যের।

তবে এই বন্ধুর পথে সিফাত একা ছিলেন না। তাঁর পাশে ছায়ার মতো দাঁড়িয়েছেন জীবনসঙ্গী সোহাগ। আরএমজি সেক্টরের অভিজ্ঞ এই মানুষটি তাঁর দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক জ্ঞান আর বাজার গবেষণার প্রজ্ঞা দিয়ে স্ত্রীর স্বপ্নকে দিয়েছেন এক শক্তিশালী ভিত্তি। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিএ করা এই দম্পতি যখন এক হলেন, তখন ‘সেরেন বাংলাদেশ’ হয়ে উঠল এক আস্থার নাম।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া এই ব্র্যান্ডটি আজ কেবল দেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই; ফিনল্যান্ড থেকে কাতার, থাইল্যান্ড থেকে যুক্তরাষ্ট্র—বিশ্বের ১৪টি দেশে পৌঁছে গেছে বাংলার ভেষজ সুবাস এবং পেয়েছেন বিএসটিআই এর অনুমোদন।

অসুস্থতার সেই কঠিন সময়টিতে যখন কেমিক্যাল পণ্যের আড়ালে মানুষ নিজের অস্তিত্ব হারাচ্ছিল, তখনই সিফাত ব্রত নিলেন সবাইকে অর্গানিক পণ্যের স্বাদ দেওয়ার। দেশ-বিদেশের ট্রেনিং আর আয়ুর্বেদের জ্ঞানকে পুঁজি করে তিনি তৈরি করেছেন ১৭টি জাদুকরী পণ্য। এর মধ্যে আছে হেয়ার অয়েল, হেয়ার প্রোটিন প্যাক, ফেস প্যাক, বডি স্মুদিং প্যাক, ক্রীম, স্পা সোপ। প্রতিটি পণ্যই সিফাতের ঘরে তৈরি, যেখানে বজায় থাকে শতভাগ পরিচ্ছন্নতা আর বিশুদ্ধতা। ২১ জন নিবেদিত কর্মীর শ্রম আর সিফাত-সোহাগের মমতায় প্রতিটি মোড়ক হয়ে ওঠে এক একটি ভরসার প্রতীক।
সিফাত মনে করেন, প্রকৃতিতে যে উপকরণগুলো অবহেলায় পড়ে থাকে, সেগুলোই হতে পারে আমাদের ত্বক ও চুলের শ্রেষ্ঠ পথ্য। গ্লোবাল মার্কেটে বাংলাদেশকে রিপ্রেজেন্ট করাই এখন এই উদ্যোক্তা দম্পতির মূল লক্ষ্য। বর্তমানে কাস্টমাইজড পণ্য নিয়ে কাজ করলেও, আগামীতে জেনেরিক পণ্যের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে বাংলার হেরিটেজ ছড়িয়ে দিতে চান তাঁরা। তাঁদের স্বপ্ন অনেক বড়—বাংলাদেশ হবে অর্গানিক স্কিন কেয়ারের বিশ্বস্ত হাব।

একটি স্বপ্ন, সামান্য কিছু ভেষজ আর এক জোড়া মানুষের অবিচল বিশ্বাস—এই তিনে মিলেই রচিত হচ্ছে ‘সেরেন বাংলাদেশ’-এর জয়গাথা। প্রকৃতির আঁচলে নিজেদের সঁপে দিয়ে সিফাত ও সোহাগ প্রমাণ করেছেন, সততা আর পরিশ্রম থাকলে শিকড় থেকেই শিখরে পৌঁছানো সম্ভব।
বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প














































