
সভ্যতার ঊষালগ্নে মানুষ যখন আগুনের পাশে গোল হয়ে বসে উপকথা শুনত, তখন হয়তো কেউ ভাবেনি হাজার বছর পর এই ‘গল্প বলা’ বা স্টোরিটেলিংই হয়ে উঠবে বিশ্বসেরা প্রতিষ্ঠানগুলোর করপোরেট স্ট্র্যাটেজির তুরুপের তাস। একসময় যা ছিল দাদী-নানীর রূপকথা, আজ তা গুগল-মাইক্রোসফটের মতো টেক জায়ান্টদের দপ্তরে ‘হেড অব স্টোরিটেলিং’ বা ‘কাস্টমার স্টোরিটেলিং ম্যানেজার’-এর মতো গ্ল্যামারাস পদবি। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদন বলছে, বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন এমন লোক খুঁজছে, যাঁদের কাজ হবে ‘করপোরেট ন্যারেটিভের মালিকানা নেওয়া’।
চাকরির বাজারে নতুন দিগন্ত ও বৈশ্বিক সম্ভাবনা
লিঙ্কডইন-এর তথ্য অনুসারে, গত ২৬ নভেম্বর পর্যন্ত আগের এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে চাকরির বিজ্ঞাপনে ‘স্টোরিটেলার’ শব্দটির ব্যবহার আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছে। এই বিপুল চাহিদার পেছনে রয়েছে কয়েকটি বিশেষায়িত খাত:
- টেক জায়ান্ট ও এআই সেক্টর: গুগল ক্লাউড ইতিমধ্যে একটি আলাদা স্টোরিটেলিং টিম গড়ে তুলেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ডেটা এবং সাইবার নিরাপত্তার মতো জটিল প্রযুক্তিকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজ ও বিশ্বাসযোগ্য গল্পে রূপ দেওয়াই এদের প্রধান কাজ। একইভাবে মাইক্রোসফটের নিরাপত্তা বিভাগ ‘ন্যারেটিভ ও স্টোরিটেলিং’ দেখভালের জন্য জ্যেষ্ঠ পরিচালক নিয়োগ দিচ্ছে।
- ফিনটেক ও কমপ্লায়েন্স: কমপ্লায়েন্স প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘ভান্তা’ (Vantaa) তাদের স্টোরিটেলিং প্রধানের বার্ষিক বেতন ধরেছে সর্বোচ্চ ২ লাখ ৭৪ হাজার ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২ কোটি ২৫ লাখ টাকা।
- রিটেইল ও ফুড ইন্ডাস্ট্রি: ব্রিটিশ খুচরা বিক্রেতা মার্কস অ্যান্ড স্পেন্সার (M&S) খুঁজছে ‘ফুড ব্র্যান্ড স্টোরিটেলার’। তাদের কাজ হবে বিভিন্ন মাধ্যমে খাবার ঘিরে আলাদা ও আকর্ষণীয় ধারণা তৈরি করে ক্রেতাকে আকৃষ্ট করা।
- কমিউনিকেশন ও ইউনিফাইড টিম: উৎপাদনশীলতা বিষয়ক অ্যাপ ‘নোশন’ তাদের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক যোগাযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ইনফ্লুয়েন্সার টিমকে একত্র করে একটি শক্তিশালী ‘স্টোরিটেলিং ইউনিট’ গঠন করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পণ্য ও প্রযুক্তি যত জটিল হচ্ছে, সাধারণ মানুষের কাছে সেগুলোকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে তত বেশি প্রয়োজন হচ্ছে স্পষ্ট, মানবিক ও বিশ্বাসযোগ্য গল্পের। ফলে প্রচলিত বিজ্ঞাপন বা কপিরাইটিংয়ের গণ্ডি পেরিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো এখন দীর্ঘমেয়াদি বিশ্বাস তৈরির দিকে ঝুঁকছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, মানবসভ্যতার প্রাচীনতম দক্ষতা ‘গল্প বলা’ আজ করপোরেট কৌশলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হয়ে উঠেছে। তবে গল্পের শেষে ‘তারা সুখে শান্তিতে বসবাস করল’ এমন সমাপ্তি থাকবে কি না তার নিশ্চয়তা না থাকলেও এই পেশায় ক্যারিয়ার গড়লে আর্থিক সমৃদ্ধির নিশ্চয়তা যে মিলছে, তা বলাই বাহুল্য।
একজন সফল করপোরেট স্টোরিটেলার হতে হলে কেবল সুন্দর করে কথা বলাই যথেষ্ট নয় বরং এর পেছনে কাজ করে কিছু কৌশলগত দক্ষতা। বর্তমান চাকরির বাজারের চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় দক্ষতাগুলোর একটি তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
১. ন্যারেটিভ ডিজাইন (Narrative Design): এটি কেবল একটি কাহিনী বলা নয় বরং একটি সুদূরপ্রসারী ‘ন্যারেটিভ’ বা বয়ান তৈরি করা। কোম্পানির ভিশন বা লক্ষ্যকে এমনভাবে সাজানো যাতে সাধারণ মানুষ বা গ্রাহক নিজেকে সেই গল্পের অংশ মনে করে।
২. ডেটা স্টোরিটেলিং (Data Storytelling): কঠিন সব পরিসংখ্যান এবং চার্টকে আকর্ষণীয় গল্পে রূপান্তর করার ক্ষমতা। সংখ্যা দিয়ে মানুষকে মুগ্ধ করা কঠিন, কিন্তু সেই সংখ্যা কেন গুরুত্বপূর্ণ তা গল্পের মাধ্যমে বুঝিয়ে বলাই হলো ডেটা স্টোরিটেলিং।
৩. টেকনিক্যাল এম্প্যাথি (Technical Empathy): জটিল প্রযুক্তি (যেমন: AI, Cloud Computing বা Cybersecurity) সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করার ক্ষমতা। সাধারণ মানুষের জুতোয় পা দিয়ে চিন্তা করা যে, তারা ঠিক কোন ভাষায় প্রযুক্তিটিকে বুঝতে চায়।
৪. মাল্টি-প্ল্যাটফর্ম কন্টেন্ট ক্রিয়েশন: একই গল্প সোশ্যাল মিডিয়া (যেমন: LinkedIn, Twitter), প্রেজেন্টেশন স্লাইড, এমনকি ইন্টারনাল মেমোতে কীভাবে ভিন্ন ভিন্ন ঢঙে প্রকাশ করা যায়, সেই দক্ষতা থাকা জরুরি।
৫. সাইকোলজি ও বিহেভিয়ারাল ইকোনমিক্স: মানুষের মস্তিষ্ক কীভাবে গল্পের প্রতি সাড়া দেয় এবং গল্পের মাধ্যমে কীভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলা যায়, সেই মনস্তাত্ত্বিক জ্ঞান স্টোরিটেলারদের অন্যদের চেয়ে এগিয়ে রাখে।
৬. ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলিং: শুধু শব্দ দিয়ে নয়, ছবি, ভিডিও বা গ্রাফিক্স ব্যবহার করে একটি পূর্ণাঙ্গ আবহ তৈরি করা। মানুষের চোখে যা ভাসে, তা সে বেশি মনে রাখে।
একজন সফল করপোরেট স্টোরিটেলার হওয়ার জন্য যে কোর্সগুলো বা এই বিষয়ভিত্তিক কোর্সগুলো করতে পারেন:
- Storytelling for Business (Coursera/Udemy/LinkedIn Learning)
- Data Storytelling and Visualization (Google Data Analytics/Tableau)
- Strategic Narratives (Section4/HBR)
- Narrative Economics (Yale University/Coursera)
- Creative Writing for Business and Communications
- Brand Storytelling and Content Strategy (Northwestern University)
- Persuasive Writing and Public Speaking (Harvard University)
- Visual Storytelling (Design-focused courses/Canva/Adobe)
- Digital Marketing and Content Management (HubSpot Academy)
প্রযুক্তির জয়জয়কারের এই যুগে যান্ত্রিকতা যখন তুঙ্গে, তখন মানুষ আবারও সেই আদিম মানবিক ছোঁয়াই খুঁজছে। করপোরেট দুনিয়ায় ‘স্টোরিটেলিং’ পদের এই অভাবনীয় উত্থান কেবল একটি সাময়িক ট্রেন্ড নয়, বরং এটি ব্যবসায়িক যোগাযোগের এক নতুন দর্শন। কোম্পানিগুলো এখন বুঝতে পেরেছে যে, গ্রাহকের কাছে শুধু ফিচারের তালিকা দিয়ে নয়, বরং হৃদয়ে জায়গা করে নিতে প্রয়োজন একটি শক্তিশালী জীবনঘনিষ্ঠ গল্প। সুতরাং, আগুনের পাশে বসে শুরু হওয়া সেই আদিম গল্প বলার শিল্পটিই এখন আধুনিক পৃথিবীর সবচেয়ে দামি ও স্মার্ট পেশা। গল্পের লুপে ঘুরতে থাকা এই পৃথিবীতে যারা সহজ করে সত্য বলার জাদুকরী ক্ষমতা রাখেন, ভবিষ্যতের বৈশ্বিক বাজার নিশ্চিতভাবেই তাদের দখলে থাকবে।








































