
দেবযানী চ্যাটার্জি
দেড় যুগ আগেও দেবযানী চ্যাটার্জির জীবনটা ছিল অনেকটাই পরিচিত এক মধ্যবিত্ত সুখী সংসারের গল্প। স্বামী, দুই সন্তান আর গোছানো পারিবারিক জীবন – সবই ছিল। কিন্তু ২০১১ সালে হঠাৎ করেই সেই জীবনে নেমে আসে অপ্রত্যাশিত ছন্দপতন। স্ট্রোক করে মারা যান তাঁর স্বামী। মুহূর্তেই বদলে যায় জীবনের দিকনির্দেশনা। ছোট দুই সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে থেমে থাকার সুযোগ ছিল না।
পরের বছরই, ২০১২ সালে, দেবযানী কর্মজীবনে প্রবেশ করেন দেশের একটি স্বনামধন্য ও বহুল প্রচলিত দৈনিক পত্রিকা’র প্রশাসন বিভাগে। একা হাতে সংসার ও চাকরি সামলানো সহজ ছিল না, কিন্তু ধীরে ধীরে নিজেকে গড়ে তোলেন একজন দায়িত্বশীল পেশাজীবী হিসেবে। কর্মদক্ষতা ও ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারের কথা বিবেচনা করে ২০১৭ সালে তিনি সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। এরই ধারাবাহিকতায় একই প্রতিষ্ঠানে প্রশাসন বিভাগ থেকে মানবসম্পদ বিভাগে পদোন্নতি পান তিনি। সব মিলিয়ে প্রায় এক যুগ কেটে যায় তাঁর কর্মজীবনে।
একটি স্থিতিশীল চাকরির সুবাদে দুই সন্তানকে নিয়ে একা একজন মা হিসেবে দেবযানীর জীবন তখন তুলনামূলকভাবে সুসংগঠিত। সংগ্রামের মধ্য দিয়েই তিনি নিজের জায়গা তৈরি করেছিলেন। তবু মাঝবয়সে এসে কোথায় যেন নতুন করে অস্থিরতা জন্ম নেয়। প্রতিদিনের বাঁধাধরা রুটিন আর আগের মতো ভালো লাগছিল না। মনে জন্ম নেয় পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা।

এই সময়েই ই-কমার্স ও উদ্যোক্তা হওয়ার ধারণা তাঁকে ভাবাতে শুরু করে। দীর্ঘ চিন্তাভাবনার পর তিনি চাকরি থেকে ইস্তফা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বিষয়টি প্রথমে গোপনই রাখেন। পরে আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনেরা জানতে পেরে বিস্ময় প্রকাশ করেন যে এত নিশ্চিত একটি চাকরি কেন ছেড়ে দিলেন তিনি! আশেপাশের এই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হতে না চেয়ে নিজেকে কিছুটা গুটিয়েই রেখেছিলেন তিনি।
চাকরি ছাড়ার পর কিছুদিন পুরোপুরি সংসারেই সময় দেন দেবযানী। তাঁর ছেলে তখন এইচএসসি পরীক্ষার্থী। এই সময়টুকু সন্তানকে দিতে পারার সুযোগকে তিনি আশীর্বাদ হিসেবেই দেখেন। তবে কিছুদিন পর আবার ভেতরে অস্থিরতা কাজ করতে শুরু করে। নিয়মবদ্ধ কর্মজীবনকে মিস করতে থাকেন তিনি।
এরপর একটি ছোট প্রতিষ্ঠানে যোগ দিয়ে প্রায় ছয় মাস কাজ করেন। সেখানে তরুণ উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পান। কিন্তু যাতায়াতের দীর্ঘ সময় আর অতিরিক্ত কাজের চাপ তাঁকে আবারও ক্লান্ত করে তোলে। শেষ পর্যন্ত সেখান থেকেও ইস্তফা দিয়ে ঘরে বসেই নতুন সুযোগের খোঁজ শুরু করেন।
এই সময়টায় হতাশা তাকে আচ্ছন্ন করে। আগের কর্মজীবনের দিনগুলোর কথা বারবার মনে পড়তে থাকে। দেবযানীর ভাষায়, প্রতিদিন সকালে অন্যদের অফিসে যেতে দেখে মন খারাপ হতো। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সিভি পাঠাতেন, সাক্ষাৎকারও দিতেন। কিন্তু আত্মবিশ্বাসের অভাব প্রকট হয়ে ওঠে। নতুন অ্যাপ ও যোগাযোগ প্রযুক্তি নিয়ে প্রশ্ন এলে উত্তর দিতে পারতেন না। একসময় সিভি পাঠাতেই ভয় পেতে শুরু করেন।
দেবযানীর এই অভিজ্ঞতা একান্ত ব্যক্তিগত হলেও এর সঙ্গে দেশের বহু নারীর কর্মজীবনের বাস্তবতার মিল রয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বাড়লেও নেতৃত্বের পর্যায়ে পৌঁছানো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। আত্মবিশ্বাসের সংকট, দরকষাকষিতে পিছিয়ে থাকা, ঝুঁকি নিতে অনীহা এবং সামাজিক অদৃশ্য দেয়াল—সব মিলিয়ে অনেক নারীর কর্মজীবন মাঝপথে থমকে যায়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪ সালের জরিপ অনুযায়ী, দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪৪ শতাংশ নারী। ২০১৭ সালে এই হার ছিল ৩৬ শতাংশ। অর্থাৎ অংশগ্রহণ বেড়েছে, কিন্তু কাজের মান ও মর্যাদা তেমন বাড়েনি। এসব নারীর প্রায় ৯৭ শতাংশই কাজ করেন অনানুষ্ঠানিক খাতে—যেমন কৃষি, গৃহকর্ম, চা-বাগান কিংবা ছোট দোকান ও কারখানায়—যেখানে শ্রম আইন ও সামাজিক সুরক্ষার সুযোগ সীমিত।
এই প্রেক্ষাপটেই দেবযানীর সামনে আসে ওয়াটারএইড বাংলাদেশের ‘ওমেন্স রিটার্নশিপ’ কর্মসূচি। তিনি একে কর্মক্ষেত্রে ফেরার একটি কার্যকর সুযোগ হিসেবে দেখেন। দেবযানীর ভাষায়, এই কর্মসূচিতে অংশ নেয়াটা ছিল তার জীবন বদলে দেওয়ার মতো। শুরুতে কিছুটা সংকোচ থাকলেও দ্রুত বুঝতে পারেন, প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া নারীদের অধিকাংশই প্রায় একই রকম অভিজ্ঞতা নিয়ে এসেছেন।
এই কর্মসূচিতে তার পরামর্শক ছিলেন রেজওয়ানা রহমান। তাঁর কাছ থেকেই কর্মক্ষেত্রে সাহসী হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা পান দেবযানী। প্রশিক্ষকদের মধ্যে কাজী কন্সাল্ট্যান্স-এর কাজী এম আহমেদ এবং ওয়াটারএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর হাসিন জাহানের ভূমিকার কথাও তিনি বিশেষভাবে স্মরণ করেন তিনি। তাদের সহায়তায় দেবযানীর আত্মবিশ্বাস নতুন করে গড়ে ওঠে। ইন্টারভিউভীতি কেটে যায়, সিভি তৈরির কৌশলও নতুনভাবে শিখে নেন। এর ফলও আসে দ্রুত, তিনি নতুন চাকরি পেয়ে যান।
প্রশিক্ষণের আগে ও পরের নিজের অবস্থান তুলনা করে দেবযানী বলেন, আগে নিজেকে গুটিয়ে রাখতেন। এখন নিজেকে একজন পেশাদার মানুষ মনে হয়। সময়মত মতামত দিতে পারেন, কার্যকর সমাধানও দিতে পারেন। তাঁর মতে, এই কর্মসূচি তার জীবনে বড় পরিবর্তন এনেছে।
ওয়াটারএইড বাংলাদেশের ‘ওমেন্স রিটার্নশিপ’ কর্মসূচি মূলত মধ্যম পর্যায়ের নারী পেশাজীবীদের ক্ষমতায়নের লক্ষ্য নিয়ে পরিচালিত একটি রূপান্তরমূলক উদ্যোগ। বিশেষ করে যেসব নারী কর্মজীবনে বিরতির পর আবার কাজে ফিরতে চান, তাঁদের জন্য এটি একটি কার্যকর সহায়তা। মেন্টরশিপ, দক্ষতা উন্নয়ন, অনানুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকার ও ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার কোচিংয়ের সমন্বিত এই শেখার যাত্রা নারীদের শুধু কাজে ফিরতেই নয়, নেতৃত্বের ভূমিকায় এগিয়ে যেতেও প্রস্তুত করছে।
দেবযানীর ভাষায়, ‘ওমেন্স রিটার্নশিপ’ কর্মসূচিটি তাঁর কাছে শুধু প্রশিক্ষণ কর্মসূচি নয়, এটি ছিল তার আত্মবিশ্বাস পুনুরুদ্ধারের ও বিরতির পর কর্মজীবনে ফেরার এক সাহসয় যাত্রা।
বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প













































