সোমবার । এপ্রিল ২০, ২০২৬
নিয়াজ মাহমুদ সাকিব ফিচার ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫, ৩:৪৫ অপরাহ্ন
শেয়ার

ইন্টারনেটের নীরব অভিধান: বলা যায়না যেসব শব্দ


Internet Word

এই নীরবতাই ইন্টারনেটের সবচেয়ে জোরালো ভাষাইন্টারনেট শব্দে ভরা-
তবু এখানে কিছু শব্দ আছে, যেগুলো বলা যায় না।
কথা বলার জন্যই তো এই বিশাল ডিজিটাল জগৎ। পোস্ট, কমেন্ট, রিল, স্টোরি- সবই ভাষার উৎসব। অথচ এই শব্দের মহাসাগরের মাঝখানেই তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত নীরবতা। কিছু শব্দ লিখলেই পোস্ট উধাও হয়ে যায়। কিছু বাক্য বললেই অ্যাকাউন্ট “রেস্ট্রিক্টেড” হয়ে পড়ে। কিছু সত্য উচ্চারণ করলেই অ্যালগরিদম চোখ নামিয়ে নেয়।

এই নীরবতাই ইন্টারনেটের সবচেয়ে জোরালো ভাষা।

একসময় সেন্সরশিপ ছিল দৃশ্যমান-কালি দিয়ে ঢেকে দেওয়া লাইন, কেটে ফেলা অনুচ্ছেদ। এখন সেন্সরশিপ স্মার্ট। এখানে কেউ আপনাকে চুপ করায় না; আপনাকে অদৃশ্য করে দেয়। আপনার শব্দ থাকে, কিন্তু পৌঁছায় না। আপনার কণ্ঠ থাকে, কিন্তু প্রতিধ্বনি হয় না।

“কিছু শব্দ কমিউনিটি গাইডলাইন ভাঙে।”
এই বাক্যটি এখন আমাদের সময়ের সবচেয়ে নিরীহ অথচ সবচেয়ে ক্ষমতার ঔদ্ধত্যপূর্ণ অভিরুচিময় উক্তি।

কিন্তু প্রশ্ন হলো- কোন শব্দ? কেন?
রাজনীতি, যুদ্ধ, গণহত্যা, দখল, নিপীড়ন-এই শব্দগুলো আজ আর শুধু শব্দ নয়; এগুলো ঝুঁকি। কিছু দেশে এগুলো বলা মানে দেশদ্রোহ। কিছু প্ল্যাটফর্মে বলা মানে শ্যাডো ব্যান। সত্য এখানে আর নিরপেক্ষ নয়; সত্য এখন অস্বস্তিকর।

ইন্টারনেট আমাদের কথা বলার সুযোগ দিয়েছে, কিন্তু শর্তসহ।
তুমি কথা বলতে পারো- যদি তোমার কথা বিজ্ঞাপনবান্ধব হয়।
তুমি প্রতিবাদ করতে পারো- যদি তা খুব বেশি তীক্ষ্ণ না হয়।
তুমি কাঁদতে পারো- যদি তা কাউকে অস্বস্তিতে না ফেলে।

এখানে ভাষা শুধু ভাব প্রকাশের মাধ্যম নয়; এটি একটি ক্যালকুলেটেড রিস্কের হিসাব।

সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো- আমরা ধীরে ধীরে এই নীরবতাকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিচ্ছি। আমরা বাক্য ঘুরিয়ে বলছি। শব্দ বদলে নিচ্ছি। সত্যকে কোমলতার আবেশে পরিবেশন করছি। আমরা নিজেরাই নিজেদের সম্পাদক হয়ে উঠছি-অ্যালগরিদমের আগেই।

একটা সময় ছিল, যখন মানুষ ভয়ের কারণে চুপ থাকতো।
এখন মানুষ চুপ করে- রিচ কমে যাবে বলে।

Internet Word Inner 1

এই আত্ম-নিয়ন্ত্রণই ডিজিটাল যুগের সবচেয়ে সফল সেন্সরশিপ।

তবু কিছু শব্দ আছে, যেগুলো বলা না গেলেও লেখা বন্ধ হয় না। সেগুলো ফিসফিস করে ছড়িয়ে পড়ে। কবিতায় ঢুকে যায়। রূপকে আশ্রয় নেয়। গল্পের ভেতর লুকিয়ে থাকে। ইতিহাস বলে- যে শব্দ যতো বেশি নিষিদ্ধ, সে শব্দ ততো বেশি জেদি ঘোড়ার বেগে ছোটে।

ইন্টারনেট হয়তো কিছু শব্দ মুছে দিতে পারে,
কিন্তু মানুষের ভেতর থেকে ভাষাকে মুছে দেওয়া এত সহজ নয়।

কারণ শেষ পর্যন্ত,
যে শব্দ বলা যায় না-
সেই শব্দই সবচেয়ে বেশি সত্য।

যে শব্দগুলো বলা যায় না (বা বলা বিপজ্জনক)
ইন্টারনেটে নিষিদ্ধ শব্দের কোনো আনুষ্ঠানিক তালিকা নেই।
কারন নিষেধাজ্ঞা এখানে লেখা হয় না—অ্যালগরিদমে আকারে-ইঙ্গিতে সুযোগ মতো ঢুকিয়ে দেওয়া হয়।
তবু সবাই জানে, কিছু শব্দ উচ্চারণ করলেই ঝুঁকির শুরু।

গণ*হত্যা (Ge*nocide)
এই শব্দ কেবল মৃত্যু বোঝায় না; বোঝায় দায়। কে মা/রছে, কার নির্দেশে- এই প্রশ্নগুলো এই শব্দের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে লেগে থাকে।

দ*খল (Occ*upation)
দ*খল মানে কেবল ভূখণ্ড দ*খল নয়; দ*খল মানে ইতিহাসের উপর নিয়ন্ত্রণ। এই শব্দ বললে মানচিত্র প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

উপ*নিবেশবাদ (Colo*nialism)
অতীতের গল্প নয়। আজ-কালের বৈষম্যের শিকড় এ শব্দ। এই শব্দ উচ্চারণ মানেই বর্তমান ক্রিয়াশীল ব্যবস্থার বৈধতা প্রশ্ন করা।

রাষ্ট্রীয় সন্ত্রা*স (State Terro*rism)
স*ন্ত্রাস সবসময় রাষ্ট্রবিরোধী নয়; কখনো রাষ্ট্রই স/ন্ত্রাসের উৎস।

নি/পীড়ন (Op*pression)
কাঠামোগত। ব্যক্তিগত ভুল নয়, নীতির ফল।

স্বৈ/রতন্ত্র (Auth*oritarianism)
এ শব্দ বলে দেয়-সমস্যা একজন ব্যক্তি নয়, একটি ব্যবস্থা।

শ/রণার্থী (Ref*ugee)
শব্দটি মনে করিয়ে দেয়-কেউ স্বেচ্ছায় ঘর ছাড়ে না। এই শব্দ বললেই প্রশ্ন ওঠে, ঘর ভাঙলো কে আসলে?

গণ*গ্রেপ্তার (Mass Arrest)
শব্দটি আইন নয়; বরং ভয় ছড়ানোর কৌশল।

নি/খোঁজ (Enforced Dis*appearance)
এখানে অনুপস্থিতিও এক রাজনৈতিক কর্ম।

সং/খ্যালঘু (Mi*nority)
শব্দটি কেবল সংখ্যার কথা বলে না; ক্ষমতার অসমতার কথা বলে।

বাক/স্বাধীনতা (Freedom of Speech)
শব্দটি যতো বেশি উচ্চারিত হোক না কেন, বাস্তবে সহ্য করা হয় ঠিক ততোটাই কম।

প্রতি*রোধ (Resi*stance)
কারণ কে স/ন্ত্রাসী, আর কে প্রতিরোধকারী—তা এই শব্দের সংজ্ঞার ওপর নির্ভর করে।

যুদ্ধা*পরাধ (War Crimes)
এই শব্দ উচ্চারণ মানে ……।।

এই শব্দগুলো নিষিদ্ধ নয়- অস্বস্তিকর। সবার জন্য নয়, কারো কারো জন্য। কারা এই শব্দগুলো নিয়ে বেশি অস্বস্তিতে ভুগতে পারে। কারোই অজানা নয়।

এগুলো বলা যায়, কিন্তু তার মূল্য আছে। পরিণতি আছে।
রিচ কমে যায়। পোস্ট গায়েব হয়। অ্যাকাউন্ট স্থগিত হয়ে থাকা।

এভাবেই ইন্টারনেট শেখায়-
কোন সত্য বলা নিরাপদ, আর কোন সত্য বলা ব্যয়বহুল।

তবুও ছোট একটা তালিকা না হয় দিয়েই দেয়া যাক আপনাদের জন্য-

Internet Word Inner 2