শনিবার । জুন ২০, ২০২৬
নিয়াজ মাহমুদ সাকিব ওয়ার্ল্ডকাপ গোল গ্রাফ ২০ জুন ২০২৬, ৮:৫৮ পূর্বাহ্ন
শেয়ার

হাইতি কি দুর্বল দল?


হাইতি জাতীয় ফুটবল দল- বিশ্বকাপ ২০২৬

হাইতি জাতীয় ফুটবল দল- বিশ্বকাপ ২০২৬

বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে ব্রাজিলের কাছে ৩-০ গোলে হারলো হাইতি। স্কোরলাইন দেখলে অনেকে হয়তো বলবেন— ‘এতে আর নতুন কী? ব্রাজিল তো ব্রাজিল, হাইতি তো হাইতি!’

কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়।

হাইতি কি সত্যিই দুর্বল দল?

রাষ্ট্র হিসেবে? হয়তো। অর্থনীতি হিসেবে? নিঃসন্দেহে। কিন্তু ফুটবল দল হিসেবে? সে উত্তর এতো সহজ নয়।

এই মুহূর্তে দুনিয়ার সবচেয়ে দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি নামই সম্ভবত হাইতি। আর এই অতি গরীব দেশের প্লেয়াররা খেলছে বিশ্বকাপে, ব্রাজিলের মতো একটা দলের সাথে!

আজকের পৃথিবীতে হাইতি এমন এক দেশ, যার নাম শুনলেই দারিদ্র্য, রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর মানবিক সংকটের ছবি চোখে ভেসে ওঠে। বহু বছর ধরে রাষ্ট্রটি যেন বেঁচে থাকার সংগ্রামেই ব্যস্ত। এমন একটি দেশের ফুটবলাররা বিশ্বকাপে খেলছে— সেটাই তো আসলে এক বিস্ময়।

আর সেই বিস্ময়ের পেছনের গল্পটা আরও অবিশ্বাস্য।

হাইতির নিজস্ব অবকাঠামো এত দুর্বল যে অনেক সময় জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক প্রস্তুতি কিংবা প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তাও নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই বিশ্বকাপেও তো আলাদা কিছু হয়নি। অর্থাভাবে নিজ দেশে খেলোয়াড়দের প্রশিক্ষণ দিতে পারেনি হাইতি, খুঁজে পায়নি স্পনসর!  তাদেরকে স্পনসর করা হয়েছে, তথা কলোম্বিয়া, ডমিনিকান রিপাব্লিক সহ আরো কিছু ক্যারেবিয়ান রাষ্ট্রগুলো থেকে এই খরচ এসেছে। ক্যারেবিয়ান দ্বীপ আছে এমন প্রতিটি রাষ্ট্রই আসলে দরিদ্র, তারা চলে মূলত আমেরিকান টুরিস্টদের ওপর নির্ভর করে। অথচ তাদের ভাতৃত্ব বোধ এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ঐ অঞ্চলের ভালো টিম হাইতি। তাই ক্যারিবীয় বাকিরা অর্থ সহযোগিতা নিশ্চিত করে বিশ্বকাপের মঞ্চে আলো জ্বালাবার সুযোগ করে দেয় হাইতিকে। ফুটবলের ভাষায় এটাকে বলে “সংহতি”।

একটি দেশের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে আশেপাশের সবার হাত বাড়িয়ে দেওয়া। বিশ্বকাপে হাইতির উপস্থিতি তাই একটি অঞ্চলের সম্মিলিত স্বপ্নের কাব্যমালা।

কিন্তু হাইতির ইতিহাস আরও গভীর।

১৮০৪ সালে হাইতি বিশ্বের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রজাতন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। দাস বিদ্রোহের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করে তারা এমন এক ইতিহাস রচনা করেছিল, যা সেই সময়ের উপনিবেশবাদী শক্তিগুলোর কাছে ছিল ভয়ংকর এক দুঃস্বপ্ন। পরের বছর তারা দাসপ্রথা বিলোপ করে।

অন্যদিকে ব্রাজিল— যে দেশের বিরুদ্ধে তারা মাঠে নেমেছিল— পশ্চিমা বিশ্বের বড় দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পরে, ১৮৮৮ সালে, দাসপ্রথা বিলোপ করে।

দুই দেশের ইতিহাস যেন একই নদীর দুই তীর।

একদিকে বিদ্রোহ করে স্বাধীন হওয়া হাইতি।
অন্যদিকে দাসশ্রমের উপর দাঁড়িয়ে গড়ে ওঠা ব্রাজিল।

তবু ইতিহাসের পরিহাস দেখুন।

আজ হাইতি বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর একটি, আর ব্রাজিল বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি।

কিন্তু ব্রাজিলের এই অবস্থানে পৌঁছানোর পথও মোটেই মসৃণ ছিল না।

দাসপ্রথা বিলোপের পর লাখো মুক্ত মানুষ জমি, শিক্ষা কিংবা অর্থনৈতিক নিরাপত্তা কিছুই পায়নি। সেই বঞ্চনা থেকে জন্ম নেয় ফাভেলা। পাহাড়ের ঢালে গড়ে ওঠা সেই বস্তিগুলো থেকেই পরে উঠে আসে পেলে, রোনালদো, রোনালদিনহো, আদ্রিয়ানো, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র কিংবা গ্যাব্রিয়েল জেসুসদের মতো তারকারা।

ব্রাজিলের ফুটবল তাই সামাজিক প্রতিরোধের ভাষা।

ফাভেলার ধুলোবালি থেকে জন্ম নেওয়া “জোগো বোনিতো”— সুন্দর ফুটবলের দর্শন— একসময় পুরো পৃথিবীকে মুগ্ধ করেছে।

এই কারণেই ব্রাজিল বনাম হাইতি ম্যাচ ইতিহাসের সঙ্গে ইতিহাসের সাক্ষাৎ।

একটি দেশ, যে দাসত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে স্বাধীন হয়েছিল।
আরেকটি দেশ, যে দাসত্বের ক্ষত থেকে উঠে এসে ফুটবলকে জাতীয় পরিচয়ের অংশ বানিয়েছে।

হ্যাঁ, মাঠে ব্রাজিল জিতেছে ৩-০ গোলে।

কুনিয়ার জোড়া গোল আর ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের গোলের সামনে শেষ পর্যন্ত টিকতে পারেনি হাইতি।

স্কোরবোর্ড বলে ব্রাজিল জিতেছে।

কিন্তু বিশ্বকাপে পৌঁছে যাওয়াটাই যে হাইতির জন্য এক ধরনের জয়, সেটা স্কোরবোর্ড বলে না।

স্কোরবোর্ড বলে না, একটি দেশ যার অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে, যার মানুষ প্রতিদিন অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়ছে, সেই দেশের ছেলেরা বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চে দাঁড়িয়ে ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ হয়ে জাতীয় সংগীত গেয়েছে।

স্কোরবোর্ড বলে না, বিশ্বকাপের আলোয় দাঁড়ানো সেই খেলোয়াড়দের অনেকেই এমন বাস্তবতা থেকে উঠে এসেছে, যেখানে ফুটবল স্বপ্নের চেয়েও বড় বিলাসিতা।

তাই প্রশ্নটা আবার করা যাক—

হাইতি কি দুর্বল টিম?

যদি শুধু অর্থ, অবকাঠামো আর তারকার সংখ্যা দিয়ে বিচার করেন, তাহলে হয়তো হ্যাঁ।

কিন্তু যদি সাহস, ইতিহাস, সংগ্রাম আর অসম্ভবকে সম্ভব করার ক্ষমতা দিয়ে বিচার করেন, তাহলে উত্তরটা একেবারেই ভিন্ন।

কারণ বিশ্বকাপের আসল সৌন্দর্য ট্রফিতে নয়।

আসল সৌন্দর্য এই যে, একদিন পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী ফুটবল সাম্রাজ্যের সামনে দাঁড়িয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বিপর্যস্ত দেশগুলোর একটি বলতে পারে—

আমরাও এখানে আছি।

আর কখনও কখনও, সেটাই সবচেয়ে বড় জয়।

তবে দুঃখ হাইতির এটাই হয়তো, প্রথম দল হিসেবে ২০২৬ বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়তে যাচ্ছে তাঁরা। স্কটল্যান্ড আর ব্রাজিলের সাথে পরপর দু ম্যাচ হেরে প্রথম দল হিসেবে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিচ্ছে তাঁরা।

তবুও ৫২ বছর পর এসে বিশ্বকাপের এই যাত্রা এই গ্রুপ পর্বে থেমে গেলেও, এ যাত্রা নিশ্চয়ই গর্বের।