sentbe-top

রাজধানীতে ভিক্ষুকের হাট!

bigger-main

পুরানো ঢাকার সাতরওজার বাসিন্দা সোবহান। শুক্রবার বাদ জুমা তার মায়ের চেহলাম। তাই বৃহস্পতিবার বিকেলে এসেছেন হাইকোর্টর মাজারে। উদ্দেশ্য কিছু ফকির মিসকিনকে খাওয়াবেন। কিন্তু মাজারে এসে জানলেন, ভিক্ষুকদের দাওয়াত দিলেই হবেনা। তাদের নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। আসা-যাওয়ার রিকশা ভাড়া আগাম দিতে হবে।

কারণ, এটা ভিক্ষুকের হাট! এই হাট থেকে ভিক্ষুক ‘কিনতে’ হয়। ভিক্ষুকদের টিম লিডার জানিয়ে দিয়েছেন, ৫০ জন ভিক্ষুকের ব্যবস্থা তিনি করে দেবেন, তবে টাকা লাগবে ৫ হাজার। জনপ্রতি ১০০ টাকা করে। শুনেতো সোবহানের মাথায় হাত! রাজধানীর শিক্ষা ভবনের বিপরীতে হাইকোর্ট মাজারের গেট এলাকা দিয়ে যেসব পথচারী যাতায়াত করেন তারা প্রায় প্রত্যেকেই কিছুক্ষণের জন্য এই নির্দিষ্ট স্থানে এসে থমকে দাঁড়ান। ভাগ্য বিড়ম্বনার শিকার কিছু মানুষের জন্য দী্র্ঘনি:শ্বাস ছাড়েন। পরক্ষণেই আবারো ছুটে চলেন আপন গন্তব্যে। কিন্তু অবহেলিত সেই সব মানুষ পলকহীন চোখে তাকিয়ে থাকেন কারো কারো করুণার প্রতিক্ষায়! যাদেরকে আমরা ভিক্ষুক বলি!

বলছিলাম হাইকোর্ট মাজার গেটে সাহায্যের আশায় বসে থাকা ভিক্ষুকদের কথা। একজন দু’জন নয়, প্রায় অর্ধশতাধিক ভিক্ষুক প্রতিদিনই এখানে বসেন। তারা প্রায় প্রত্যেকেই বিকলাঙ্গ। কারো হাত নেই, কেউবা পা হারিয়ে অসহায়। কেউ হুইল চেয়ারে, কেউ ঠেলাগাড়িতে শুইয়ে কিংবা বসে আছে। তাদের প্রত্যেকের সঙ্গেই এক-দুইজন করে সাহয্যকারী রয়েছেন। অনেকেই এই স্থানটিকে ‘ভিক্ষুকের হাট’ হিসেবে পরিচিতি দিয়েছেন।

bigger2

এ প্রতিবেদক প্রায় চার ঘণ্টা তাদের সঙ্গে কাটিয়ে জানতে পেরেছেন হাসিখুশির আড়ালে অব্যক্ত সব করুণ ইতিহাস। এমন একজন মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার ফাইসতলা গ্রামের হাবিব মোল্লা (৪০)। জন্ম থেকেই বিকলাঙ্গ। পরিবারের অবস্থা মোটামুটি ভালো। কিন্তু সামাজিক কারণে ৫-৬ বছর বয়সে হাইকোর্টের মাজারে রেখে যায় পরিবারের লোকজন। সেই থেকে মাজার এলাকায় থাকেন হাবিব।

হাবিব জানান, তার পিতা খালেক মোল্লা ছিলেন এক জন পুলিশ সদস্য। বলেন,‘বাবার অপকর্মের কারণেই আজ আমি বিকলাঙ্গ। এ কারণে পথে পথে ভিক্ষা করতে হচ্ছে আমাকে।’

তার ভাষায়, ‘আমি প্রায় ৩৫-৩৬ বছর ধরে এই মাজারে আছি। এখানে সকালে আসি। সন্ধ্যার পর আবার চলে যাই। এ জন্য আমার একজন কর্মচারী আছে। তাকে প্রতিমাসে ১৫শ’ টাকা বেতন দিতে হয়। বেতনের সঙ্গে ওই কর্মচারীকে দৈনিক ১০ টাকা এবং তিন বেলা খাওয়াও দিতে হয়।’

তিনি বলেন, ‘প্রতিমাসে ২০ হাজার টাকা খরচ আছে। টাকা ইনকাম করতে অনেক কষ্ট! মানুষ এতো সহজে তার পকেট থেকে টাকা দেয় না। আমার আত্নীয়স্বজনদের মধ্যে অনেক বড় লোক আছে। আপনি ফেসবুকে লিখবেন না। তারা আমাকে মন্দ বলবে। প্রেসক্লাবের সাংবাদিকও আছে আমার আত্মীয়। হাইকোর্টের ব্যারিষ্টারও আছে। ভাই ফেসবুকে দিয়েন না প্লিজ, আমারে গালাগালি করবে।’

তিনি বলেন, ‘আমার দুইটি পুত্র সন্তান আছে। তারা লেখাপড়ায় খুব ভাল। বড় ছেলে পুরান ঢাকার একটি স্কুল থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষা দেবে। আর ছোট ছেলেটা প্রাইমারী স্কুলে পড়ছে।’

bigger1

হাবিব জানান, ‘এই মাজারে প্রায় ৭০ জন প্রতিবন্ধ ‘ভিক্ষুক’ থাকতো। এরমধ্যে অনেকেই মারা গেছে। কেউ অন্য জায়গায় চলে গেছে। এখন প্রায় ৩৫ জনের মত আছে এখানে। এর বাইরের থেকে প্রতিদিন গড়ে ১৫-২০জন ভিক্ষুক আসে। আমাদের জন্য কেউ কিছু করে না। এদের গাছের নিচেই বাসস্থান। গাছের নিচেই থাকে। আমি একটু চলতে পারি, যেমন চলতে চাই আল্লাহ সেই রকম চালায়।’

তিনি জানান, ‘বিভিন্ন এলাকা থেকে বড়লোকেরা খাওয়ান নিয়ে আসে। আবার কেউ খাওয়ার জন্য দাওয়াত দিয়ে যায়। তোমরা আগামী দিন, ১০-১৫জন আসবে। কেউ মুরগি কাইটা নিয়ে আসে, কেউ বিরানী রাইন্দা নিয়া আহে, আবার কেউ ভাত রাইন্দা নিয়া আসে। তবে এগুলো আমি পছন্দ করিনা, আমি এই জায়গা দিয়া যাই, বাসা দিয়া খাইয়া আই। এহানে যারা থাকে, তারাই বিভিন্ন বাসা বাড়িতে দাওয়াত খায়।’

হাবিবের সঙ্গে কথা বলার সময়ে সেখানে আসেন পুরান ঢাকার ব্যবসায়ী সামাদ হোসেন। পরিবারের পক্ষ থেকে কিছু ভিক্ষুককে খাওয়ানো হবে বলে দাওয়াত দিতে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘হাইকোর্টর মাজারে ভিক্ষুকের হাট বসে। এই জন্য এই হাটে এসেছি ভিক্ষুকদের আমন্ত্রণ জানানোর জন্য।’

মাজারের সামনে থাকা ভিক্ষুকরা জানান, ‘পূর্বে তারা হাইকোর্ট মাজারের সামনে অবস্থান করতেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ এখন আর মাজারের সামনে থাকতে দিচ্ছে না। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে তারা গেটের বাইরেই থাকছেন। এতে কোনো সমস্যা নাই। আগে ভিতরে থাকতাম, এখন বাইরে থাকি। বাবা এখানে আছে বলেই আমরা এখানে আছি।’

তারা আরো বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন ভোর থেকে শুরু হয়ে সারাদিনই শত শত নারী-পুরুষ হাইকোর্ট মাজারে আসেন। তারা আমাদের শাররীক অক্ষমতা এবং আকুতির কারণে টাকা পয়সা দিয়ে থাকে। এখান দিয়ে হাইকোর্টে মামলার কারণে প্রত্যেকদিন বহুলোক যাওয়া আসা করেন। তাদের কাছে হাত বাড়ালে আমাদের হাতে কিছু না কিছু দেয়। উকিল-ব্যারিষ্টাররাও আমাদেরকে টাকা পয়সা দিয়ে থাকে। তবে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার অনেক বেশি ভিড় থাকে। এই দুইদিন আমরা ভাল টাকা পয়সা পেয়ে থাকি। শুক্রবার মাঝে মাঝে বিরানী পেয়ে থাকি। আর ধর্মীয় অনুষ্ঠানের দিন আমরা ভাল সাহায্য পেয়ে থাকি।

bigger

তারা আরো জানায়, এই মাজারে প্রায় ৪০ জন প্রতিবন্ধী ‘ভিক্ষুক’ আছি। বাইরের থেকে আরো ৫০-৬০ জন ভিক্ষুক এখানে আসে।তারা এখানে থাকে না, তারা সকালে আসে, দুপুর পর্যসন্ত থাকে, আবার বিকাল সন্ধ্যা পর্য ন্ত থাকে। ভিক্ষুকরা অভিযোগ করেন, আমদের জন্য সরকার পুর্নবাসন করে। কিন্তু কই? আমাদেরকে পুর্নবাসন করতে কেউ এগিয়ে আসে না।

শরিয়তপুরের ভেদরগঞ্জের বারেক মিয়া এখন ঢাকায় ভিক্ষা করে চলেন। তার এক সময় সবই ছিল। নদী ভাঙ্গণের কারণে ঢাকা চলে আসেন। ঢাকায় এসে দয়াগঞ্জে একটি বাসা ভাড়া নিয়ে স্ত্রী- সন্তান নিয়ে থাকতেন। তিনি বেবিট্যাক্সি চালিয়ে সংসার চালাতেন। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় সময় ওই সমাবেশে ছিলেন তিনি। ওই হামলায় আহত হন। তার মেরুদন্ড ভেঙ্গে যায়। এরপর থেকে তিনি ভিক্ষা করেন বলে দাবি করেছেন।

তিনি বলেন, দেশেতো প্রচুর সরকারী জমি আছে। আমাদের সেই জায়গায় একটু থাকার ব্যবস্থা করা হলেতো এভাবে রাস্তায় পড়ে থাকতে হতো না। পাশেই বসা রবু বেগম তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বলেন, ‘আগে আমাদের ভিতরে থাকতে দিত। এখান ভেতরে থাকতে দেয় না। তাই এহানে আইছি ‘

আট-নয় বছর বয়সে টাইফয়েড জ্বর হয়েছিলো মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ার সেলিম মিয়ার। এরপর থেকেই পঙ্গু। পরিবারের অবস্থা তেমন ভালোনা। দিন আনে দিন খায়। তাই এরপর থেকে ভিক্ষাবৃত্তি বেছে নেন সেলিম। সেলিম বলেন, এখন আমার বয়স ৩০ বছর। বিশ বছর ধরে ভিক্ষা করে চলছি। মানুষ দিলে খাই, না দিলে না খেয়েই থাকি। আগে বাড়ির লোকজন খোঁজ খবর রাখতো, এখন আর রাথে না।

শরীফ নামের আরেক পঙ্গু বলেন, কী কারণে ভিক্ষা করি, কীভাবে এই পথে আইছি এই দুঃখের কথা কেউ শুনতে চায় না। মানুষ আমাদেরকে এইডা ব্যবসা মনে করে। এইডা ব্যবসা নয়, পেডের ঝালাই ভিক্ষার পথে আইছি। আতু-লঙ্গরাদের কেই কাজ দেয় না। দূর দূর করে তাড়ায়ে দেয়। লাথিগুতা খেতে হয়। আমাগো ঘর বাড়ি নাই, রাস্তায় আমাদের ঠিকানা। তারা মনে করে আমরা সমাজের জন্য একটা বোঝা।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সূত্রমতে রাজধানী ঢাকায় এক লাখের বেশি ভিক্ষুক রয়েছে। ঢাকা সিটি করপোরেশন ১০টি এনজিও`র সহযোগিতায় ভিক্ষুকদের নিয়ে একটি জরিপ চালায়। ওই জরিপে ভিক্ষুকদের ৫টি ক্যাটাগরিতে বিভক্ত করা হয়। এগুলো হচ্ছে- মৌসুমি, রেগুলার, প্রতিবন্ধী, নারী ও শিশু ভিক্ষুক।

আর ঢাকাকে ভিক্ষুক মুক্ত করতে ২০১১ সালে ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত জনগোষ্ঠির পুনর্বাসণ ও বিকল্প কর্মসংস্থান নামে একপি প্রকল্প হাতে নেয় সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। কিন্তু ছয় মাসের মাথায় এই প্রকল্পের কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়ে। এই প্রকল্পের আওতায় প্রাথমিকভাবে দুই হাজার ভিক্ষুকের পুনর্বাসনের কথা থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মাত্র ৬৬ জন ভিক্ষুকের পুনর্বাসন করতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু পুনর্বাসিত ভিক্ষুকদেরকে তারা ধরে রাখতে পারেননি।

এদিকে চলতি বছরের ২২ জুলাই রাজধানীর ৭ এলাকায় ভিক্ষুক প্রবেশ নিষিদ্ধ করে সরকার। `ভিক্ষুকমুক্ত এলাকা` হিসেবে ঘোষিত স্থানগুলো হলো- হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, রেডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেন হোটেল, সোনারগাঁও হোটেল, রূপসী বাংলা হোটেল, বেইলি রোড, সংসদ ভবন এবং গুলশান, বারিধারা ও বনানীর কুটনৈতিক এলাকা। কিন্তু এখনও ওই এলাকাগুলোতে ভিক্ষুকদের দেখা যায়।
 

রিপোর্টারঃ কামাল মোশারেফ, সৌজন্যেঃ রাইজিংবিডি

 

sentbe-top