cosmetics-ad

হঠাৎ যে সুখবরটি পেল ৩২ লাখ প্রবাসী

probasi

বিশ্বের কোথাও আগামী ২৪ নভেম্বরের পর হাতে লেখা পাসপোর্ট চলবে না। এ সময়ের মধ্যে সব পাসপোর্ট যন্ত্রে পাঠযোগ্য বা এমআরপি হওয়ার কথা। তবে ২৪ নভেম্বরের মধ্যে এমআরপি না পেলেও বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকরা অবৈধ হয়ে যাবেন না। তাঁরা এক দেশ থেকে আরেক দেশে ভ্রমণ করার ক্ষেত্রে বিপত্তির মুখে পড়তে পারেন। এই ভ্রমণ বিপত্তি দূর করার জন্য কানাডায় আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল তদারকি সংস্থা (আইকাও) ডিফারেন্স ফাইল (ভিন্নমতসংবলিত নথি) খোলার পরামর্শ দিয়েছে।

কিন্তু এ ডিফারেন্স ফাইল কখন ইস্যু করা হবে, তা নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে সরকারের মধ্যে। সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের কেউ কেউ দ্রুত ডিফারেন্স ফাইল ইস্যু করার পক্ষে। আবার শীর্ষস্থানীয় কোনো কোনো কর্মকর্তা মনে করেন, এখনই ডিফারেন্স ফাইল ইস্যু করা হলে এমআরপি দেয়ার কাজটি মুখ থুবড়ে পড়বে। তাই এমআরপি করাটাকেই আপাতত গুরুত্ব দেয়া হবে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

জানা যায়, কানাডায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার কামরুল আহসান সম্প্রতি আইকাওয়ের প্রেসিডেন্ট ও সেক্রেটারি জেনারেলের সঙ্গে দেখা করে এমআরপি করার ডেডলাইন পিছিয়ে দেয়ার অনুরোধ করেছেন বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে। তখন তিনি সময়মতো এমআরপি করার লক্ষ্যে সরকারের নেয়া পদক্ষেপও তুলে ধরেন। কিন্তু আইকাও প্রেসিডেন্ট ও সেক্রেটারি বাংলাদেশের এ অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছেন। একই সঙ্গে সম্ভাব্য জটিল পরিস্থিতি থেকে পার পাওয়ার জন্য আইকাওয়ের কাছে ডিফারেন্স ফাইল পাঠানোর পরামর্শ দিয়েছেন। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন সচিব খোরশেদ আলমের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে কানাডা থেকে বাংলাদেশের হাইকমিশনার এ তথ্য জানিয়ে বলেছেন, ২৪ নভেম্বরের পর বিশ্বের কোথাও হাতে লেখা পাসপোর্ট চলবে না।

এই সময়ের মধ্যে সব প্রবাসী বাংলাদেশির হাতে মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) তুলে দেয়া সম্ভব হবে না। বিষয়টি এখনই আইকাওকে জানানো জরুরি। কারণ এ সময়ের মধ্যে এমআরপি না হলে বিশ্বের বিভিন্ন এয়ারপোর্টে ভ্রমণ জটিলতায় পড়বেন বাংলাদেশিরা। আইকাওকে জানানো হলে তারা তাদের সদস্য ১৯২টি দেশকে বাংলাদেশের অপারগতার কথা জানিয়ে দেবে। এতে হয়রানির হাত থেকে রেহাই পাবেন বাংলাদেশি ভ্রমণকারীরা। প্রতিবেশী দেশ নেপাল, আফ্রিকার দেশ আলজেরিয়ার মতো অনেক দেশই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এমআরপি শেষ করতে পারবে না বলে বিষয়টি আইকাওকে জানিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এ নিয়ে গত ২৯ জুলাই সরকারের উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ছাড়াও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ওই বৈঠকে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এন এম জিয়াউল আলম জানান, এখনো ১৬ লাখ এমআরপি ইস্যু করা হয়নি। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মালয়েশিয়ায় সাড়ে ১১ লাখ এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশে প্রায় সাড়ে চার লাখ এমআরপি ইস্যু করা বাকি। এসব প্রবাসী বাংলাদেশি হাতে লেখা পাসপোর্ট ব্যবহার করছেন। ২৪ নভেম্বরের মধ্যে তাঁদের এমআরপি দেয়া অসম্ভব বলে তিনি সভায় জানিয়েছেন।

এ অবস্থায় বাংলাদেশে আইকাওয়ের প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থা বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান অতিসত্বর ডিফারেন্স ফাইল ইস্যু করার সুপারিশ করে বলেন, আইকাওয়ের সদস্য দেশের মধ্যে যারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এমআরপি করতে পারবে না তাদের কোনো অসুবিধা হবে না। ডিফারেন্স ফাইল ইস্যু করা হলে আইকাও অন্যান্য সদস্য দেশকে তা জানিয়ে দেবে। বৈঠকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মহাপরিচালক বেবিচক চেয়ারম্যানের বক্তব্য সমর্থন করে এখনই ডিফারেন্স ফাইল করার পক্ষে মত দেন।

বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সূত্রে জানা যায়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোস্তফা কামাল উদ্দিন বৈঠকে বলেন, যাঁদের এমআরপি নেই তাঁরা ২৪ নভেম্বরের পর থেকে বাংলাদেশ থেকে বাইরে যেতে পারবেন না। তবে হাতে লেখা পাসপোর্টধারীরা বিশেষ ব্যবস্থায় দেশে ফিরে এমআরপি করে আবার দেশের বাইরে যাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।

তিনি জানান, দেশে এক কোটি ১২ লাখ মানুষের কাছে এমআরপি আছে, তবে হাতে লেখা পাসপোর্টের সংখ্যা বলা যাবে না। এখনই ডিফারেন্স ফাইল ইস্যু করার প্রয়োজন নেই বলেও বৈঠকে মত দেন তিনি।

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ইফতেখার হায়দার বৈঠকে বলেন, বাংলাদেশি কর্মীরা যদি অবৈধ হয়ে না যান তবে এখনই ডিফারেন্স ফাইল করার দরকার নেই। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ বলেন, সরকার এমআরপি করার জন্য প্রবাসীদের বারবার সুযোগ দিয়েছে। কেউ যদি এ সুযোগ না নেন, তাহলে তিনি ব্যক্তিগতভাবে এর জন্য দায়ী থাকবেন। মুখ্য সচিব ডিফারেন্স ফাইল ইস্যু না করে দ্রুত এমআরপি ইস্যু করার কথা বলেন।

বৈঠকে তিনি জানান, ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলোতে এমআরপি করার ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক বিলম্ব হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। যেমন ইতালির রোমে ২০১৬ সালের ২৭ মার্চ একজন এমআরপি আবেদনকারীর আঙুলের ছাপ নেয়ার তারিখ দেয়া হয়েছে। এতে প্রমাণিত হয় ইউরোপ-আমেরিকায় এমআরপি প্রস্তুতের কাজ দ্রুততার সঙ্গে হচ্ছে না। সামগ্রিক আলোচনার পর বৈঠকের সভাপতি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন সিদ্ধান্ত দেন, এখনই ডিফারেন্স ফাইল ইস্যু না করে পাসপোর্ট অধিদপ্তর ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দ্রুত প্রবাসীদের এমআরপি দেবে।

বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ প্রতিবেদককে বলেন, ‘এখনই যদি ডিফারেন্স ফাইল ইস্যু করা হয়, তাহলে এমআরপির কাজটি মুখ থুবড়ে পড়বে। তাই এমআরপি করাটাকেই গুরুত্ব দেয়া হবে। আর এমআরপি করাতে না পারলে প্রবাসীরা অবৈধ হয়ে যাবেন না। তবে তাঁদের ভ্রমণে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। এতে ব্যাপক কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। এমআরপি কার্যক্রম ত্বরান্বিত করার জন্য প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রীকে সভাপতি করে একটি উপদেষ্টা কমিটি এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিবের নেতৃত্বে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি ও টাস্কফোর্স নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে। এ বিষয়ে সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে। বারবার তাগাদা দেয়ার পরও অনেক প্রবাসী বাংলাদেশি সময়মতো এমআরপি করাননি। বুঝতে হবে সাধারণ মানুষের কল্যাণের জন্যই সরকার এমআরপি করাতে চায়।’

জানা যায়, আইকাও ১৬ বছর আগে বাংলাদেশকে এমআরপি চালু করার নির্দেশ দিলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অদক্ষতায় সে কাজ শেষ হয়নি। সরকারের অদক্ষতার পাশাপাশি নানা অনিয়মও এমআরপি না হওয়ার জন্য দায়ী। এমআরপি ইস্যু করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ পাসপোর্ট অধিদপ্তর। মধ্যপ্রাচ্য ও মালয়েশিয়ায় বেশিসংখ্যক বাংলাদেশির বসবাস। সৌদি আরব ও মালয়েশিয়ায় এমআরপি ইস্যু করার কাজ দেয়া হয়েছিল আইরিস করপোরেশনকে। তারা আবার আউটসোর্সিং করেছিল। সব মিলিয়ে সৌদি আরব ও মালয়েশিয়ায় এখনো বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি এমআরপি করাতে পারেননি। সম্প্রতি বিমান ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন যুক্তরাষ্ট্র সফরে গেলে সেখানেও অনেক প্রবাসী বাংলাদেশি এমআরপি করাতে পারেননি বলে মন্ত্রীর কাছে অভিযোগ করেন। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মন্ত্রীকে জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় যুক্তরাষ্ট্রে এমআরপি দিতে দেরি হচ্ছে।-কালের কণ্ঠ