sentbe-top

কবরের সঙ্গে বসবাস!

koborকবরের সঙ্গে বসবাস! কথাটি কেমন যেন অবাক মনে হচ্ছে। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য ঝালকাঠির কাঁঠালিয়া উপজেলার আমুয়া গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সরদার বাড়িতে তিনশ’ পরিবারের প্রায় আটশ’ লোক বসবাস করছেন কবরের সঙ্গে।

কোথায়ও ঘরের পাশে আবার কোথাও ঘরের ভেতর কবর। আর সেখানেই রান্না থেকে শুরু করে খাওয়া ও ঘুম সব কিছুই হয় কবরের ওপরে না হয় কবরের পাশে। অদ্ভুত ও চরম অমানবিক হলেও এ রীতিই সত্য।

ইসলামের বিধান অনুসারে মৃত্যুর পর একজন মুসলিমের লাশ কবরস্থানে দাফনের নিয়ম থাকলেও ঝালকাঠির কাঁঠালিয়ার আমুয়া গ্রামের সরদার পাড়ায় নিজ ঘরেই দাফন করা হচ্ছে স্বজনদের লাশ। জমির অভাব ও সামাজিক বৈষম্যের কারনেই যুগযুগ ধরে ঘরের ভেতর কবরের এ রীতি চলে আসছে এ জনপদে।

স্থানীয়দের সাথে আলাপকালে জানা গেছে, প্রায় শত বছর পূর্বে বিষখালী নদী তীরবর্তী এই স্থানে ১৮০ শতাংশ জমির উপরে বসতি শুরু করেন সরদার বংশের লোকজন। এদের সবারই পেশা ছিল মাছ ধরা ও বিক্রি করা। বিষখালী নদীতে জাল ফেলে মাছ ধরা ও পাশ্ববর্তী আমুয়া বাজারে তা বিক্রি করা। এর মধ্য দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করত তারা।

koborনদীর পারের এই মৎস্যজীবীরা আগে ছিলো বেদে সম্প্রদায়ের মানুষ। প্রায় একশ’ বছর আগে একযোগে সবাই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে বসবাস শুরু করেন এই সরদার পাড়ায়। সে সময় সামাজিক বৈষম্যের কারণে স্থানীয় গোরস্থানে কবর দেয়া হতো না সরদার পাড়ার কারও মরদেহ। তখন থেকেই স্বজনদের লাশ আঙিনায় কবর দেয়ার রেওয়াজ চালু হয় গ্রামে।

দীর্ঘদিন ধরে এই নিম্ন আয়ের মানুষগুলো এক খন্ড জমির অভাবে প্রিয়জনকে দাফন করছেন নিজের ঘরেই। বিষ্ময়করভাবে কারও কারও আঙিনায় একাধিক কবরের দেখা মেলে ।

জায়গা না থাকায় গাদাগাদি করে একই ঘরে দু’/তিন পরিবারও বসবাস করছে। পার্শ্ববর্তী চরে কোন জায়গা না থাকায় বাধ্য হয়ে শুরু থেকে কেউ মারা গেলে ঘরের আশেপাশে দাফন করা হতো। পরবর্তীতে নিজ ঘরের মধ্যেই মৃত স্বজনকে কবর দিয়ে ওই ঘরেই বসবাস করতে হচ্ছে তাদের।

তখনকার সময় শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত ছিল এরা। অজ্ঞতার কারণে বেশি সন্তান জন্মদিয়ে দ্রুত বংশ বৃদ্ধি ঘটানোর কারনে অল্পতেই জনসংখ্যা বেড়ে যায় এই তাদের। তবে বাড়েনি জমির পরিমান। অর্থনৈতিক দৈন্যদশার কারনে পাশ্ববর্তী স্থানে কোন জমি ক্রয় করতে পারেনি তারা। এ জন্য বাধ্য হয়ে প্রথমে ঘরের পাশে, উঠানের কোনে দাফন দেয়া শুরু করে স্বজনদের। এর পরবর্তীতে জায়গা না থাকায় ওই কবরের ওপরেই বসত ঘর নির্মাণ করে বসবাস শুরু করে। বর্তমানে ওই বাড়ি চিত্র এমন হয়েছে যে, রান্নাঘর থেকে শুরু করে শোবার ঘর পর্যন্ত সবখানেই কবর।

এতে সরদার বাড়ির শিশুদের মধ্যে অতঙ্ক বিরাজ করে। অজানা ভয় নিয়ে বসবাস করে প্রতিনিয়ত। এর ফলে শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশ বাঁধাগ্রস্ত হচ্ছে। অধিকাংশ সময় বিশেষ করে রাতে এখানকার শিশুরা চলাফেরায় ভয় পায়।

নিজের মায়ের কবরের পাশে বসেই রান্না করছেন সরদার পাড়ার হাজেরা বেগম (৪৫)। জমি সংকটের কারনে রান্নাঘরেরই মাকে সমাহিত করা হয়েছিল কয়েকমাস আগে। তার ঘরের মেঝেতেও রয়েছে একাধিক কবর।

ওই বাড়ি মো. মোস্তফার (৫২) বাবা তোফাজ্জেল হোসেন কয়েক বছর পূর্বে মারা যান। তাকে দাফন করা হয় ঘরের বেড়ার পাশেই। প্রতিনিয়তই দেখতে হচ্ছে স্বজনের কবর। শুধু মোস্তফা একা নন এখানকার প্রায় সবাই বসবাস করছেন কবরের পাশে।

প্রবীন ব্যাক্তি মো. নুরুল হক (৬০) আক্ষেপ করে বলেন, ‘ আমাদের এখানে স্কুল কলেজ সবই আছে, নেই শুধু কবর দেওয়ার জায়গা।’

এনামুল সরদার (৪৩) বলেন, ‘দুঃখ কষ্ট বুকে নিয়ে স্বজনদের কবরের সঙ্গে আমরা বসবাস করছি। এটার জাতির জন্য কলঙ্কের। আমাদের পাশ্ববর্তী মসজিদ সংলগ্ন স্থানে ৭৩ শতাংশ জমি রয়েছে। সরদার বাড়ির পক্ষ থেকে এই জমি কবরস্থানের জন্য বরাদ্দ দেওয়ার দাবি করছি সরকারের কাছে।’

১৪ বছরের রাশেদ সরদার এই বলে আক্ষেপ করে যে, তাদের বেড়ে ওঠার জন্য যে স্বাভাবিক ও সুন্দর পরিবেশ নেই। সব সময় অজানা অতঙ্কের মধ্যে বসবাস করতে হয় তাদের। এ থেকে তারা মুক্তি চায়।

স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন মীর বহর বলেন, এ ব্যাপারটি ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসকসহ উর্ধ্বতন মহলে অবহিত করা হয়েছে। কবরের জায়গা পাওয়া গেলে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে গোরস্থান নির্মাণের ব্যাপারে সার্বিক সহযোগিতার কথা জানালেন তিনি ।

ঝালকাঠির জেলা প্রশাসক রবীন্দ্রশ্রী বড়ুয়া বলেন, ‘এই বিষয়টি আমার নজরে আসার পরে স্থানীয় উপজেলা নির্বহী কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করে দুইটি স্থান নির্বাচন করা হয়েছে। আমি ঘটনাস্থলে যাব। আশা করছি খুব শিগগিরই এদের জন্য একটি কবর স্থানের জায়গা নির্ধারণ করতে পারব।’

sentbe-top