জার্মানিতে কেমন আছেন বাংলাদেশি প্রবাসীরা

mobarakইউরোপের শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ হিসেবে পরিচিত জার্মানি। প্রায় বারো হাজার প্রবাসী বাংলাদেশী জার্মানিতে নানা ধরনের কাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। জার্মান সরকার চাকরিজীবী ছাড়াও এশিয়ার বিভিন্ন দেশের ছাত্রদের জন্য রেখেছে নানান সুযোগ।

জাতিগতভাবে খুব বেশি আবেগী নয় জার্মানিরা। তারা সম্পর্কের ক্ষেত্রে কাজকেই প্রাধান্য দেয়। প্রবাসী বাংলাদেশিরা পরিশ্রমী হওয়ায় সহজেই সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে জার্মানের লোকজনের সঙ্গে। আর এই সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে দু’দেশেরই অর্থনীতি লাভবান হওয়ার ব্যাপক সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন জার্মানিতে বাঙালি ব্যবসায়ী ও জার্মান আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মোবারক আলী ভূঁইয়া বকুল।

সম্প্রতি তার আলাপচারিতায় প্রবাস জীবনের নানা বিষয় উঠে এসেছে। সাক্ষাতকার নিয়েছেন একুশে টেলিভিশন অনলাইনের প্রতিবেদক আলী আদনান। তো চলুন দেখে নেয়া যাক সাক্ষাতকাটি-

প্রশ্ন: আপনি দীর্ঘদিন জার্মানিতে বসবাস করছেন। সেখানে ব্যবসা, রাজনীতি ও সামাজিক জীবনেও প্রবাসী বাংলাদেশিদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সব মিলিয়ে জার্মানিতে প্রবাসী বাংলাদেশিরা কেমন আছেন?

উত্তর: ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় জার্মানিতে বাংলাদেশিরা ভালো আছেন। সেখানে সামাজিক নিরাপত্তা আছে। তাদের জীবন মানে একটা নিশ্চয়তা আছে। মানুষের যে পাঁচটি মৌলিক অধিকার সেটার নিশ্চয়তা আছে এবং সেক্ষেত্রে তেমন কোনো বৈষম্য নেই। সেখানে যারা দীর্ঘদিন বসবাস করছেন তাদের সাধ ও সাধ্যের মধ্যে পার্থক্য নেই। সেখানে বসবাসরত একজন বাংলাদেশি হয়তো মার্সিডিজ চালাতে পারবে না বা পারছে না কিন্তু চার চাকার একটা প্রাইভেটকার রাখার সামর্থ্য তাদের কম বেশি সবার আছে।

প্রশ্ন: বর্তমানে আনুমানিক কী পরিমাণ বাংলাদেশি জার্মানিতে আছেন? তারা কর্মক্ষেত্রে কোনো ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন?

উত্তর: বর্তমানে জার্মানিতে প্রায় ১২ হাজার বাংলাদেশী আছেন। কর্মক্ষেত্রে ভাষা তাদের প্রধান সমস্যা। কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোতে সাধারণত ইংরেজি জানা থাকলে সুবিধা করা যায়। কিন্তু জার্মানিতে বিষয়টি একেবারেই উল্টো। দ্বিতীয়ত, জার্মানিতে চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে একটা বড় সমস্যা হলো তাদের কোম্পানিগুলো নিশ্চয়তা চায়। যখন তারা দেখে কেউ দুই বছরের জন্য ভিসা পেয়েছে তখন তাদের চাকরি দিতে জার্মান কোম্পানীগুলো কার্পণ্য করে না। কিন্তু ভিসা না থাকলে দ্বিধাবোধ করে। কারণ, দেখা গেল কাউকে চাকরি দিল, সে কোম্পানীতে কাজ শেখা শুরু করল। কোম্পানির ভালো মন্দ জানল। এর পরপরই ভিসা জটিলতায় তাকে দেশে ফিরতে হলো। তখন কিন্তু ঘুরে ফিরে কোম্পানির ক্ষতি। তাই তারা তাকেই নিতে আগ্রহী হয় যার সেখানে থাকার নিশ্চয়তা আছে। আর এই দুই বছরের ভিসা পাওয়ার জন্য অনেক সংগ্রাম করতে হয়। এখন অবশ্য তেমন কষ্ট করতে হয় না। মোটামুটি তাড়াতাড়ি হয়ে যায়।

প্রশ্ন: এখন জার্মানিতে ভিসা ছাড়া আছেন এমন বাংলাদেশির সংখ্যা কত? ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে কী কী জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে?

উত্তর: বর্তমানে জার্মানিতে ভিসা ছাড়া তেমন কেউ নেই। দু`একজন থাকলেও থাকতে পারে। সেটা চোখে পড়ার মতো না। ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে সেখানে এগিয়ে আছে স্টুডেন্টরা। তারা নির্দিষ্ট শর্তগুলো মেনে চললেই ভিসা পেয়ে যায়। পড়াশুনা শেষ করে কোন চাকরি ম্যানেজ করতে পারলেই দুই বছরের ভিসা পেয়ে যায়। তবে ২০০৫ এর আগে এই সুবিধা ছিল না। ছিল না এজন্যই, জার্মান সরকারের যুক্তি ছিল, তোমরা ছাত্র হিসেবে আমাদের দেশে এসেছ। পড়াশুনা করে নিজেকে তৈরি করে নিজ দেশে গিয়ে দেশের কাজে লাগ। অর্থাৎ এটা পরোক্ষভাবে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সাহায্য করা। কিন্তু তারা একটা পর্যায়ে খেয়াল করলো বাংলাদেশি ছেলেরা সেখানে পড়াশুনা শেষ করে নিজ দেশে তো ফেরেই না, বরং কেউ তারা ইউরোপ- আমেরিকার অন্যান্য বড় বড় দেশে চলে যাচ্ছে। অন্যদিকে জার্মানির বড় বড় কোম্পানিগুলোতে দক্ষ জনশক্তির অভাব। তখন জার্মান সরকার আইন করে এ সুবিধাটা দিল, কেউ যদি পড়াশুনা শেষ করে জার্মানে চাকরি ম্যানেজ করতে পারে তাহলে তাকে রাখা হবে।

প্রশ্ন: জার্মানিতে বাংলাদেশিরা সাধারণত কী ধরনের কাজ করে? বাংলাদেশী টাকায় তাদের গড় আয় কেমন?

উত্তর: শতকরা পঞ্চাশভাগ লোক শ্রমিক। কেউ কেউ সেই অবস্থা উত্তোরণ করে এসে ব্যবসা বানিজ্য করছেন। অনেকে খুব ভাল জায়গায় কাজ করছেন। বাংলাদেশি টাকায় এখানে বসবাসরত বাংলাদেশিদের গড় আয় দেড় থেকে দুই লাখ টাকা।

প্রশ্ন: জার্মানে বসবাসরত বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিটেন্স আমাদের অর্থনীতিতে কতটা ভূমিকা রাখছে?

উত্তর: আমি মনে করি, মধ্যপ্রাচ্যে যেসব বাংলাদেশী আছেন, রেমিটেন্সে তাদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। ইউরোপ- আমেরিকায় বসবাসরত প্রবাসীদের ভূমিকা এক্ষেত্রে কম। এর পেছনে একটা ব্যাখ্যা আছে। যারা মধ্যপ্রাচ্যে আছেন তাদের একটা তাগাদা থাকে। ভিসার মেয়াদ শেষ হলে দেশে ফিরতে হবে। যেহেতু দেশে ফিরতে হবে তাই দেশে তারা একটা প্রস্তুতি রাখেন। জায়গা কে না, বাড়ি করা। বা প্রতিমাসে স্ত্রী পুত্রের জন্য ভরণ-পোষণ পাঠানো। কিন্তু যারা ইউরোপে বসবাস করেন তারা সেখানে একটা নিশ্চয়তা পায়। চাকরি করতে করতে ভিসার মেয়াদ বাড়ায়, নাগরিকত্ব পায়। বা সেখানে বিয়ে করে। সন্তানরা স্কুলে যায়। ওখানকার ব্যস্ত, প্রতিযোগীতাময় ও নিরাপদ জীবনে অভ্যস্ত হয়ে যায়। তখন সে বাড়ির করার কথা চিন্তা করলে ইউরোপে যেখানে বসবাস করছে সে জায়গাটাকেই প্রাধান্য দেয়। যেহেতু দেশে ফেরার তাগিদ তার থাকে না সেহেতু দেশে সে টাকা পাঠাতে তেমন একটা উৎসাহী হয় না। আমি সবার কথা বলছি না, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমার এটা মনে হয়।

প্রশ্ন: জার্মানে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির ব্যপারে জার্মান সরকারের মনোভাব কেমন?

উত্তর: জার্মানের নিজস্ব একটা সমস্যা আছে। তা হলো তাদের জনসংখ্যা ঘাটতি। ২০০০ সালে জার্মান সরকার উদ্যোগ নিয়েছিল এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে লোক এনে সেই ঘাটতি পূরণ করবে। কিন্তু তাদের সেই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। না হওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ হলো ভাষাগত সমস্যা। এ কারণে কেউ তেমন উৎসাহ দেখায় নি। সেজন্য বর্তমানে জার্মান সরকার বিভিন্ন দেশে জার্মান ভাষা শেখার সুযোগ করে দিয়েছে। আমাদের বাংলাদেশেও অনেকগুলো স্কুল জার্মান ভাষা শেখাচ্ছে। অনেকগুলো ভাষা শিক্ষা কেন্দ্র বা ইনস্টিটিউটে জার্মান ভাষা শেখানো হচ্ছে। জার্মান দূতাবাস এই ব্যপারে সহায়তা দিচ্ছে। সত্যি কথা হচ্ছে, জার্মানিরা কারো প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন হয় না আবার শত্রুভাবাপন্নও হয়না। ওরা কাজ পাগল জাতি। কাজ বুঝে। আমাকে দিয়ে ওদের কী কাজ হবে সেটাই বুঝে। গিভস এন্ড টেকস নীতিতে সেই কাজ ওরা বুঝে নেয়। এখানে আবেগের কোনো মূল্য নেই।

প্রশ্ন: জার্মান- বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক কেমন?

উত্তর: জার্মান- বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্পর্ক ভাল। গত দশ বছরে এই সম্পর্কের যথেষ্ট উন্নয়ন হয়েছে। একসময় কিন্তু জার্মান টেকনোলজি বাংলাদেশে আসত না। জার্মান টেকনোলজি আইনে সে সুযোগ ছিল না। এখন কিন্তু জার্মানসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশগুলো চাচ্ছে তাদের টেকনোলজি আমাদের দেশে আসুক। তারা আমাদের উৎপাদিত পণ্য কিনতে রাজি। কিন্ত শর্ত হচ্ছে তাদের প্রযুক্তি আমাদের ব্যবহার করতে হবে। আমাদের গার্মেন্টসের উৎপাদিত শার্ট- প্যান্ট তারা কিনবে যদি আমরা গার্মেন্টসে ব্যবহৃত মেশিন তাদের কাছ থেকে কিনি। শুধু জার্মান কেন, পুরো ইউরোপেই এখন বাংলাদেশি পণ্যের বাজার বাড়ছে। এক্ষেত্রে এক নম্বরে আছে গার্মেন্ট পণ্য। বুলগেরিয়া, হাঙ্গেরিতে এখন আমাদের ইলেক্ট্রনিক্স পণ্য যাচ্ছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মৎস্য রফতানি হচ্ছে, সবজি রফতানি হচ্ছে।

প্রশ্ন: জার্মানের কোন কোন প্রযুক্তির সম্ভাবনা ভাল, যা আমরা কাজে লাগাতে পারি?

উত্তর: ইউরোপের বিভিন্ন দেশের তুলনায় Power development – এ অনেক এগিয়ে আছে। যেমনঃ ছোট একটা উদাহরণ দিই। আজকের পৃথিবীতে যেভাবে পানি ব্যবহৃত হচ্ছে, এর ফলে পানির স্তর খুব দ্রুত নিচে নেমে যাবে। বিজ্ঞানীরা ধারনা করছেন, কোন এক সময় পৃথিবীতে পানির সংকট দেখা দেবে। জার্মানরা এ বিষয়ে ভাল কাজ করছে। আমরা প্রতিবার কমোড ফ্ল্যাশ করলে পনের – বিশ লিটার পানি খরচ হয়। জার্মানের বিজ্ঞানীরা সেই পানি পুনরায় প্রক্রিয়াজাত করে বিশুদ্ধ করছে। এর ফলে বর্জ্যগুলো অপসারিত হয়ে চলে যাচ্ছে এবং পানিটা আবার বিশুদ্ধ পানি হিসেবে খাওয়া- পরায় ব্যবহার হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা গ্যারান্টি দিচ্ছেন, আগের তুলনায় এই পানি আরও বেশি বিশুদ্ধ। পুরো ইউরোপে এই প্রযুক্তি কাজে লাগানো হচ্ছে। আমাদের এখানেও এটা কাজে লাগানো উচিত। আমরা মোচড় দিয়ে পানির ট্যাপ খুলি। সেখানে সব সংক্রিয়ভাবে খোলা বন্ধ হয়। ট্যাপ খোলার পর কিছু পানি ছিটকে পড়ে। সেই ছিটকে পড়া পানি জারে সংরক্ষণের ব্যবস্থা আছে। এরকম ছোট অনেক প্রযুক্তি আমরা কাজে লাগাতে পারি যেগুলো আমাদেরকে অনেক বড় ভবিষ্যত সংকট থেকে বাঁচাবে।

প্রশ্ন: জার্মানির প্রযুক্তি আমরা কিভাবে কাজে লাগাতে পারি?

উত্তর: জার্মানরা খুব শৃংখলাবদ্ধ, দেশপ্রেমিক ও পরিশ্রমী জাতি। একটা প্রস্তাব আমি সবসময় করি। ওদের প্রযুক্তি ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমগুলো আমরা টিম পাঠিয়ে শিখিয়ে এনে এখানে প্রচার করতে পারি বা বাস্তবায়ন করতে পারি। এতক্ষণ প্রযুক্তি সংক্রান্ত যা বললাম, তা ওদের বিশেষজ্ঞ টিম এনে আমাদের লোকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে এখানে বাস্তবায়ন সম্ভব।

সৌজন্যে- একুশে টেলিভিশন