sentbe-top

দুই কোরিয়ার দুই গাছ ও দুই নদীর গল্প

SOUTHKOREA-NORTHKOREA/SUMMIT
সীমান্তের শূন্যরেখা সামনে রেখে অপেক্ষায় ছিলেন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জে-ইন (ডানে)। হাত বাড়িয়ে এগিয়ে গেলেন উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উন। সাড়ে ছয় দশক পর গতকাল সাক্ষাৎ হয় দুই কোরিয়ার নেতাদের। ছবি: এএফপি

দুই কোরিয়ার নেতা এক ঐতিহাসিক বৈঠকে মিলিত হয়ে কোরীয় উপদ্বীপকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছেন। এ সময় নেতারা সদ্ভাবের প্রতীক হিসেবে বৃক্ষরোপণ করেন। তবে গাছ নিয়ে দুই কোরিয়ার মধ্যে এটিই প্রথম ঘটনা নয়; আরেকটি ঘটনা ঘটেছিল প্রায় ৪২ বছর আগে।

বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে জানানো হয়, ১৯৭৬ সালে একটি পপলারগাছ নিয়ে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল। দুই কোরিয়ার সীমান্তবর্তী বেসামরিক এলাকায় থাকা ওই গাছের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জাতিসংঘের সেনাদল ভালোভাবে দেখতে পারছিল না। কৌশলগত কারণে তাই ওই গাছ কাটলে চলছিলই না! কিন্তু সেই গাছ কাটা নিয়েই উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে শুরু হয়ে গিয়েছিল যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব।

১৯৫৩ সালে কোরীয় যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর থেকেই দুই প্রতিবেশীর মধ্যে এই উত্তেজনা চলে আসছে। উত্তর ও দক্ষিণের মধ্যকার সম্পর্ক এতটাই তিতকুটে ছিল যে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি। এর বদলে যুদ্ধবিরতি জারি ছিল উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে।

দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষে বরাবরই ছিল যুক্তরাষ্ট্র। গত শতকের সত্তরের দশকে পপলারগাছ কাটার সময়ও দক্ষিণ কোরিয়ার পাশে দাঁড়িয়েছিল মার্কিন সরকার। সেটি পুরোদস্তুর এক অভিযান। নাম দেওয়া হয়েছিল ‘অপারেশন পল বানিয়ান’।

বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, সেটি ছিল গাছ কাটার সবচেয়ে ব্যয়বহুল ঘটনা। এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন ৮১৩ জন সেনা, ২৭টি হেলিকপ্টার, বি-৫২ বোমারু বিমান ও জঙ্গি বিমান। এ ছাড়া কোরীয় উপদ্বীপে ছিল যুদ্ধবিমান বহনকারী একটি সামরিক জাহাজ। ওই অভিযানে মোট ৪৫ মিনিট সময় লেগেছিল। এর আগে গাছে হাত দিয়ে উত্তর কোরিয়ার সেনাদের হাতে প্রাণ হারিয়েছিলেন দুই মার্কিন সেনা। এরপরই তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড যৌথ অভিযানের ঘোষণা দেন। কোরীয় উপদ্বীপের সব দক্ষিণ কোরীয় সেনাকে সতর্ক অবস্থায় রেখে সেই পপলারগাছ কাটা হয়েছিল। আর অভিযান চলাকালে প্রতিটি মিনিটে নতুন করে কোরীয় যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কায় ছিলেন সংশ্লিষ্ট সবাই। শেষ পর্যন্ত কোনো গোলাগুলি ছাড়াই পপলারগাছটি কেটে সরানো হয়।

৪২ বছর আগের গাছ কাটার সেই ঘটনায় জড়িত ছিলেন দক্ষিণ কোরিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট মুন জে-ইন। তখন তিনি দেশের সামরিক বাহিনীর একজন কর্মকর্তা ছিলেন। এত বছর পর আবার দুই দেশের উদ্যোগে গাছ লাগানোর গল্পের মূল কুশীলব হলেন তিনি। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে চালানো প্রচারণায় মুন বলেছিলেন, গাছ কাটার সেই টান টান উত্তেজনার সময়ই দেশপ্রেমের ভিত পোক্ত করেছিলেন তিনি। কিন্তু এখন আর উত্তরের সঙ্গে স্নায়ুক্ষয়ী ভীতিকর সম্পর্ক চান না মুন জে-ইন। এর বদলে শান্তি চান তিনি।

গতকাল শুক্রবার স্থানীয় সময় সকালে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উন সীমান্তবর্তী পানমুনজম গ্রামে পা রাখেন। বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, সীমান্তে কিমকে স্বাগত জানিয়ে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। পানমুনজমের পিস হাউসে তিনি বৈঠক করেন দক্ষিণ কোরিয়ার নেতা মুন জে-ইনের সঙ্গে। বৈঠকের আগে দুই নেতা হাসিমুখে পরস্পরের সঙ্গে হাতও মেলান। পরে বিকেলের অধিবেশনে দুই নেতা সীমান্তে বৃক্ষরোপণ করেন।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, কিম জং-উন ও মুন জে-ইন হাতে সাদা রঙের হাতমোজা পরে গাছ লাগাচ্ছেন। জানা গেছে, পাইনগাছ লাগিয়েছেন এই দুই নেতা। দুই কোরিয়া থেকে আনা পাহাড়ের মাটি দেওয়া হয় পাইনের গোড়ায়। গাছ লাগানোর পর সবুজ রঙের ক্যান দিয়ে পানিও ছিটিয়েছেন তাঁরা।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, এই গাছ লাগানোর মধ্য দিয়ে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার নেতা ‘শান্তি ও সমৃদ্ধির বীজ বপন’ করেছেন। গাছের কাছে স্থাপিত একটি পাথরের ফলকে এ কথা লেখা হয়েছে।

এএফপি বলছে, গাছ লাগানোর পর দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জে-ইন উত্তর কোরিয়ার পিয়ং ইয়ংয়ের তায়েদং নদী থেকে আনা পানি ছিটিয়ে দেন গাছের গোড়ায়। অন্যদিকে, কিম জং-উন দক্ষিণের সিউলের হান নদীর পানি ছেটান।

গাছ লাগানোর পর কিম বলেছেন, ‘আমরা কোরীয়রা বলে থাকি, পাইনগাছ খুব শক্তিশালী এবং প্রায় পুরো বছরই সবুজ থাকে। এমনকি শীতকালেও সবুজ পাতার অভাব থাকে না পাইনগাছে। আমাদের চলার রাস্তায় যত প্রতিবন্ধকতাই আসুক না কেন, আমরা তা কাটিয়ে উঠব। ঠিক এই গাছের মতো।’

অথচ কয়েক মাস আগেই দুই কোরিয়ার মধ্যে যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে শুরু হয়েছিল উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়। আর দক্ষিণের জন্য কিমের বরাদ্দ ছিল হুমকি। কথার লড়াইয়ে দক্ষিণও জবাব দিচ্ছিল বেশ। এখন সব ভুলে দুই দেশই হাত মিলিয়েছে। এর সঙ্গে অবশ্য সবুজ ট্রেনে চড়ে কিমের ঝটিকা চীন সফরের যোগসূত্র খুঁজছেন অনেকে।

তবে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের কাজ দেশ দুটি কীভাবে এগিয়ে নেবে, সে সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো ধারণা পাওয়া যায়নি। এ বিষয়টি আদৌ আর এগোবে কি না এবং উত্তর কোরিয়া তাতে সক্রিয়ভাবে অংশ নেবে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ আছে বিশ্লেষকদের।

সন্দেহ ও অবিশ্বাসের দোলাচল যতই থাকুক না কেন, কোরীয় উপদ্বীপের মানুষ আশা দেখছেন। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে একটি স্বাভাবিক সম্পর্কে ফিরতে চান তারা। দুই কোরিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানের শরীরী ভাষায় অন্তত সেটিই ফুটে উঠেছে।

সুত্রঃ প্রথম আলো

sentbe-top