sentbe-top

সৌদি থেকে শূন্য হাতে দেশে ফিরছেন বাংলাদেশি শ্রমিকরা

saudi-bdচলতি বছরের সেপ্টেম্বরের মাসের মাঝামাঝি থেকে সৌদি আরবের বিভিন্ন এলাকায় বিদেশি শ্রমিকদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অজুহাতে ধরপাকড় চলছে। আর এ সময়ে সৌদি পুলিশ ঢালাওভাবে বাংলাদেশিদের আটক করছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। পুলিশের অভিযানে সৌদিতে আটককৃত পুরুষ শ্রমিকদের জোর করে দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফেরার সময় তাদের কোনো মালামাল এমনকি আয়ের টাকা-পয়সাও দেশে আনতে দেওয়া হচ্ছে না। শ্রমিকেরা শূন্য হাতে দেশে ফিরছেন। গত কয়েকমাসে দেশে ফেরা শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

সৌদি থেকে দেশে শ্রমিকরা জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বর মাস থেকে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত সময়ে প্রায় ১ হাজার বাংলাদেশি শ্রমিককে আটক করেছে সৌদি পুলিশ। আকামা (কাজের অনুমতি) ও সৌদি সরকারকে দেওয়া ট্যাক্সের কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও তাদের আটক করা হয়েছে। অথচ তারা প্রতিবছর আকামা ও ট্যাক্স বাবদ দেশটির সরকারকে ১৪ হাজার রিয়েল দিয়েছেন। অন্যদিকে ছিল কফিলের (মালিক, যার অধীনে থাকে) জ্বালাতন।

কফিলের অধীনে কাজ করতে গিয়ে প্রতি মাসে ৩০০ থেকে শুরু করে ৫০০ রিয়েল পর্যন্ত দিতে হয়েছে শ্রমিকদের। এত কিছু দেওয়ার পড়েও তাদের ধরে ধরে ফেরত পাঠাচ্ছে সৌদি সরকার।

তাদের অভিযোগ, কোনো প্রয়োজনে ঘর বা প্রতিষ্ঠানের বাইরে বের হলেই রাস্তা থেকে আটক করে নিয়ে যায় পুলিশ। পরে তাদের নেওয়া হচ্ছে সফর জেলে (অস্থায়ী কারাগার)। আটকের সময় কোনো কিছু শুনছে না তারা। কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে গাড়িতে তোলা হয়। পরে তাদের কিছুদিন জেলে রেখে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে যাদের বাসা বাড়ি বা কোম্পানির মেস থেকে আটক করা হয়েছে তাদের কোনো কিছুই সঙ্গে নিয়ে যেতে দেওয়া হয়নি। অনেকে শুধু পরনের পোশাক আর পায়ে পরে থাকা স্যান্ডেল নিয়ে নিয়ে দেশে ফিরেছেন।

তবে দেশে ফেরাদের অধিকাংশই দেশটিতে এক যুগের বেশি সময় ধরে ছিলেন। কেউ দোকানে, কোম্পানিতে, ভবন নির্মাণ শ্রমিক, ঠিকাদারী, সিএনজি, অন্যের গাড়ি চালানো এমনকি অনেকে ব্যবসা করতেন। তাদের বেশির ভাগেরই আকামা (কাজের অনুমতি) ছিল।

দেড় বছর আগে সাড়ে ৫ লাখ টাকা খরচ করে দালালের মাধ্যমে সৌদি যান বগুড়া আদমদিঘি উপজেলার আবু বায়েজিদ। সেখানে গিয়ে দেড় বছর কাজও করেন বায়েজিদ। সৌদি আরব যাওয়ার অর্ধেক টাকা তার উঠেও এসেছে। কিন্তু এরই মধ্যে সব এলোমেলো হয়ে গেল। একদিন দুপুরে খাবার কেনার জন্য রাস্তায় বের হলে সৌদি পুলিশ তাকে আটক করে। ৭ অক্টোবর তিনি দেশে ফিরেছেন।

বায়েজিদ জানান, সৌদি যাওয়ার সময় তিনি প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে ১ লাখ, ঋণ করে ১ লাখ এবং তার ব্যবসার জন্য দোকান বিক্রি করে বাকি টাকা সংগ্রহ করেছিলেন। জমি-জমা বলতে তার কোনো কিছুই নেই। দেশে ফিরেছেন শূণ্য হাতে। পরনে একটি শার্ট, প্যান্ট আর স্যান্ডেল ছাড়া কিছু নিতে পারেননি। গ্রামে গিয়ে কী করবেন এই ভাবনা তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। ছেলে-মেয়েদেরকে কী বলবেন। কোনো প্রশ্নের উত্তর তার জানা নেই। হতাশা আর দুশ্চিন্তামাখা মলিন ‍মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হতে চায় না।

অনেক চেষ্টা করে বায়েজিদের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হলো। তিনি শুরুতেই বলেন, ‘সব শ্যাষ হয়া গেল। দেশে ফিরি কী করবো কবার পাচ্চি না। দুডা ছাওয়াক কী করি খাওয়ামো মাথা কাজ করিচ্ছে না।’

শুধু বায়েজীদ নয়, তার মতোই বহু শ্রমিক শূণ্য হাতে দেশে ফিরেছেন। তেমনি একজন মেহেরপুরের গাঙনি উপজেলার দেলোয়ার হোসেন। দেলোয়ার ২০০০ সালে সৌদি আরব যান। যাওয়ার পর কিছুদিন তিনি একটি কোম্পানির অধীনে কাজ করেন। পরে এক সময় ভবন নির্মাণ শ্রমিক সরবরাহের ঠিকাদার হিসেবে ব্যবসা শুরু করেন। ভালোই চলছিল তার সব কিছু। কিন্তু গত মাসে তিনি পুলিশের হাতে আটক হন। সফর জেল (অস্থায়ী জেলখানা) থেকে ফেরার আগে তার কফিল (মালিক, যার অধীনে থাকে) তাকে কিছু কাপড় ও দুটি লাগেজে কিছু জিনিসপত্র দেন। কিন্তু সৌদি বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ তাকে কিছুই নিতে দেয়নি।

কথাগুলো যখন দেশে ফিরে বিমানবন্দরে জানাচ্ছিলেন দেলোয়ার তখন হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন। প্রিয় সন্তানের জন্য কফিলের পক্ষ থেকে দেওয়া মেয়ের জামাটিও নিতে দেয়নি সৌদি বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।

দেলোয়ার বলেন, ‘ওরা আমার সব কিছু কেড়ে নিল। মেয়েটার জন্য কেনা জামাটাও নিতে দিল না।’ সৌদিতে ঢালাওভাবে বাংলাদেশিদের আটকের খবরে কেউ কেউ স্বেচ্ছায় পুলিশের কাছে ধরা দিচ্ছেন। পরে শুন্য হাতে দেশে ফিরেছেন।

ফেরত আসা ব্যক্তিদের অভিযোগ, সৌদিস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসে তারা আটকের বিষয়ে জানালেও কর্মকর্তারা ছিলেন নীরব। তারা কোনো ধরনের প্রতিবাদ করেননি। এমনকি তাদের ছাড়িয়ে নেওয়ারও কোনো ব্যবস্থা করেননি। তবে কারও কারও জন্য দেশটির কফিলরা টাকার বিনিময়ে সুপারিশ করেছিলেন। তাদের কয়েকজন ছাড়াও পান।

এর আগে গত ২৬ অক্টোবর ৮০ জ, ৩ অক্টোবর ১৪৪ জন, ৫ অক্টোবর ১৫০ ও ১৭০ জন এবং সর্বশেষ আজ (৭ অক্টোবর) দেশে ফিরলেন ১১০ জন পুরুষ শ্রমিক। এ পর্যন্ত যারা দেশে ফিরেছেন তাদের সবার অভিযোগ, তাদের বিনাদোষে ধরা হচ্ছে। পরে জেলে নিয়ে দেশে পাঠানো হয়েছে।

সৌদি ফেরত পুরুষ শ্রমিকরা জানিয়েছেন, দেশটিতে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে ধরপাকড় চলছে। সেই সময়ে থেকে সৌদির বিভিন্ন স্থানে বাংলাদেশি আটক হচ্ছেন এবং তখন থেকে কেউ কেউ এখনো সফর জেলেই (অস্থায়ী কারাগার) আছেন।

ফেরত আসা শ্রমিকেরা আরও জানান, তাদের ফেরত আসার সময় কিছুই নিতে দেয়নি দেশটির পুলিশ। এ কারণে প্রত্যেকের হাতে একটি করে প্লাস্টিকের ব্যাগ ছাড়া তেমন কিছু দেখা যায়নি। অনেকে শুধু পরনের কাপড়টুকু পরেই দেশে ফিরেছেন।

সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটিতে ১২টি সেক্টরে সে দেশের নারী ও পুরুষ নাগরিক ছাড়া কাউকে তারা কাজ করতে দেবেন না। সেক্টরগুলো হলো- মোটরযান/ মোটর সাইকেল কিংবা এর যন্ত্রাংশ খুচরা বা পাইকারি বিক্রয় কেন্দ্র, পাইকারী ও খুচরা (কাপড়, জুতা, ফার্নিচার, প্রসাধনী, গৃহের পণ্য) হাড়িপাতিল, তৈজসপত্র বিক্রয় কেন্দ্রসহ ১২ সেক্টর।

এ ঘোষণার পর বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের শ্রমিকদের ধরে ধরে দেশে পাঠানো হচ্ছে। তবে কেউ কেউ স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে যাচ্ছেন। এমন ঘোষণার সংকেত পাওয়ার পর থেকে গত দেড় বছরে ৭ লাখেরও বেশি প্রবাসী শ্রমিক সৌদি আরব ছেড়েছে। সৌদি সরকারের পরিসংখ্যান দফতরের দেওয়া তথ্যমতে, গত তিন মাসে ২ লাখ ৩৪ হাজার ২০০ জন শ্রমিক দেশ ছেড়েছেন।

প্রবাসী শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের অভিবাসন বিভাগের হেড অব প্রোগ্রাম শরিফুল হাসান বলেন, ‘সৌদি সরকার যাদের ফেরত পাঠাচ্ছে তাদের হয়তো ভিসা বা আকামা নেই। আবার অনেকে ফ্রি ভিসায়ও গিয়ে থাকে। সৌদি থেকে তাদের কেন ও কী কারণে ফেরত পাঠানো হচ্ছে সে বিষয়টি বাংলাদেশ সরকারের খতিয়ে দেখা দরকার। পাশাপাশি যারা এখন দেশটির সফর জেলে আছেন তারা যাতে আইনি সহায়তা পান সে বিষয়টি সরকারের নজর দেওয়া দরকার।’ তবে সৌদি সরকারের ১২ খাতকে সৌদিকরণের সিদ্ধান্তের প্রভাব কিছুটা হলেও পড়তে শুরু করেছে বলে মনে করেন অভিবাসন নিয়ে কাজ করা এ সমাজকর্মী।

অভিবাসী বিশেষজ্ঞ ও অভিবাস কর্মী উন্নয়ণ প্রোগ্রামের (ওকাপ) চেয়ারম্যান শাকিরুর ইসলাম বলেন, ‘দুই কারণে সৌদি থেকে শ্রমিক ফেরত আসছে। যারা যাচ্ছে তারা ফ্রি ভিসায় যাচ্ছেন। অধিকাংশ সময়ে এটিকে প্রমোট করা হচ্ছে। ফলে যারা যাচ্ছেন তারা অফিসিয়ালিভাবে আনডকুমেন্টেট। নিয়ম অনুযায়ী তাদের কারও অধীনে কাজ করার কথা কিন্তু যেহুতু ফ্রি ভিসায় পাঠানো হচ্ছে এ কারণে তারা মালিকের অধীনে কাজ করছেন না।’

‘তারা অন্য কোথাও কাজ করছে। সৌদি আইন অনুযায়ী দেশটির পুলিশ তাদের ধরতে পারে। যদি তারা মালিকের অধীনে কাজ না করে বা অন্য কোথাও অবৈধভাবে কাজ করে থাকে। তাদের ধরে রিপোর্ট করা হয়। এখানে আমাদের দেশের ব্যর্থতা হলো তাদের কেন ফ্রি ভিসায় পাঠানো হচ্ছে এটিও কিন্তু বড় প্রশ্ন। রিকুন্টিং এজেন্সি ও কিছু সরকারি কর্মকর্তারা এই ভিসাকে নতুন করে নামকরণ করেছে (এফএনএফ) ফ্যামেলি এন্ড ফেন্ডস ভিসা। আসলে এটি ফ্যামেলি এন্ড ফেন্ডস ভিসা না। এটিকে বাংলাদেশি কিছু লোক সৌদিদের কাছ থেকে কিনে বাংলাদেশি দরিদ্র মানুষগুলোর কাছে চড়া দামে বিক্রি করছে। তাদের বোঝানো হচ্ছে তারা ফ্রি ভিসায় গেলে বেশি টাকা কামাই করতে পাবরে। এখানে দুটি পক্ষ লাভবান হচ্ছে একটি হলো- সৌদিরা ফ্রি ভিসা তৈরি করে তারা টাকা আয় করছে আর বাংলাদেশের দালাল শ্রেণি টাকা কামাচ্ছে। আরেকটি পক্ষ হচ্ছে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো যারা এই ভিসাগুলােকে প্রমোট করছে। এই ভিসা সম্পর্কে না জেনে অধিকাংশ মানুষ সৌদি গিয়ে বিপদে পড়ছে এবং ফেরত আসছে।’

সরকারকে পরামর্শ দিয়ে এই অভিবাসন বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘সরকারকে অবশ্যই ফ্রি ভিসাটা বন্ধ করতে হবে। এতে যদি অভিবাসনের সংখ্যা কমে যায় তারপরেও তা করতে হবে। গতবার ৫ লাখের বেশিও সৌদি গেছেন। তাদের বেশির ভাগই ফ্রি ভিসায়। এখন সৌদি সরকার এখন যদি তাদের একই সঙ্গে ফেরত পাঠায় তবে তা সরকারেরর জন্য বোঝা হয়ে যাবে। শ্রমিক ফেরত পাঠানো কীভাবে বন্ধ করা যায়। সেজন্য সৌদির সঙ্গে বসে দ্রুত বাংলাদেশ সরকারকে আলোচনায় বসতে হবে।’ শুধু তাই নয়, ভবিষ্যতে শ্রমিকদের হয়রানি এবং ফেরত আসা বন্ধে দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনাও সরকারকে গ্রহণ করতে হবে বলে শাকিরুর ইসলাম মনে করেন।

শাকিরুর ইসলাম মনে করেন, কয়েক মাস থেকে সৌদিতে নির্যাতিত নারীদের ফেরত পাঠানোর ইমেজটিকে ঢাকবার জন্য দেশটির সরকার পুরুষ শ্রমিকদের পাঠিয়ে এমনটি করছে কি না সেটাও ভাববার বিষয়। এ জন্য সরকারকে বিষয়টি তদন্ত করে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার অনুরোধ করেন তিনি।

সৌজন্যে- প্রিয়.কম

sentbe-top