সারাদেশে চলছে রমরমা আইপিএল জুয়া

ipl-juaচলছে ফ্রাঞ্চাইজিভিত্তিক বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় দেশীয় টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট লীগ ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল)। ক্রিকেটের এ জমজমাট লিগকে ঘিরে এক ধরনের অসাধু চক্র প্রতিনিয়তই খেলছে জুয়া। ‘আইপিএল জুয়া’ এখন ছড়িয়ে পড়েছে শহর থেকে গ্রামে। একে কেউ কেউ বলে টাকা লাগানো। আবার কেউ বলেন বাজি। ম্যাচের ফলাফল বাজি, ওভার বাজি, রান বাজিসহ বিভিন্ন ধরনের জুয়াবাজির ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হচ্ছেন অনেকেই।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়ে বা গোয়েন্দা নজরদারিতে কয়েকজনকে গ্রেফতার করলেও বন্ধ হচ্ছে না জুয়াবাজি। পাশাপাশি অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন সাইটেও সক্রিয় হয়ে উঠছেন জুয়াড়িরা। ফলে অবৈধ আর্থিক লেনদেন দিন দিন বাড়ছেই।

বছরের শুরুতেই খেলাকে কেন্দ্র করে চলা জুয়াবাজিতে ঢাকায় এক ছাত্র খুন হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইপিএলের শুরুতেই যদি বাজিকরদের দৌরাত্ম্য থামানো না যায়, তাহলে সামনে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটতে পারে। সামনে আবার ক্রিকেট বিশ্বকাপ; ফলে জুয়াবাজি নিয়ে সচেতন হতে হবে এখনই।
বাজি চলে সবখানে

ক্রীড়াঙ্গনের অন্যতম আলোচিত বিষয় ক্রিকেট বা ফুটবল ম্যাচ ঘিরে শুরু হয়েছে স্পট ফিক্সিং এবং বাজি। আন্তর্জাতিক বা ঘরোয়া বিভিন্ন ক্রিকেট বা ফুটবল ম্যাচকে ঘিরে বাজিকরদের চলে দর কষাকষি। দুর্বল টিমের সঙ্গে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের খেলা থাকলে সে ক্ষেত্রে দেয়া হয় লোভনীয় সব অফার। বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে বাজিরঘোড়া প্রায়ই লাফিয়ে ওঠে।

চলে রমরমা ব্যবসা। আইপিএল, বিপিএল, বিশ্বকাপ; এমনকি দেশ-বিদেশের ঘরোয়া লিগগুলোকে ঘিরেও বাজিকরদের রমরমা ব্যবসা। পরিসংখ্যান বলে, পাশের দেশ ভারত এবং পাকিস্তানে স্পট ফিক্সিংসহ বাজির প্রভাবটা অনেক বেশি।

বিশ্বে পাঁচটি বাজিকর বা জুয়াড়ি অধ্যুষিত দেশের মধ্যে রয়েছে এ দুই দেশের নাম। বিশ্লেষকদের মতে, আমাদের দেশে বাজিটা এসেছে এ দুই দেশ থেকেই। আর ছড়িয়ে পড়ছে দেশের আনাচে-কানাচে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশে বাজিটা নিয়ন্ত্রণ হয় মূলত রাজশাহী, বগুড়া ও নারায়ণগঞ্জ থেকে। এ তিনি জেলা থেকেই দেশের বিভিন্ন জায়গায় ডিলারদের মাধ্যমে বাজিটা পৌঁছানো হয়।
আন্তর্জাতিক বাজিকরদের কার্যকলাপ আমাদের দেশে তুলনামূলক কিছুটা কম হলেও ঘরোয়া বাজিকরদের বিচরণ ক্ষেত্রটা অনেক বেশি। চলছে আইপিএল। রাস্তার মোড়ের দোকানগুলোতে ভালোভাবে চোখ রাখলেই দেখা যায়, সেখানে চলছে বাজির দর কষাকষি।

তবে যারা বাজি ধরেন তাদের বেশিরভাগেরই বয়স ১৫ থেকে ২৫ বছর। যাদের বয়স বেশি, তারাই হলেন ঘরোয়া বাজির মাফিয়া ডন। রাজধানীর মিরপুর, পুরান ঢাকা, টঙ্গী এবং কামরাঙ্গীরচরে বাজিকরদের বিচরণ সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। তবে জুয়াড়িদের এ নতুন ধান্দায় বাদ নেই নগরীর অভিজাত এলাকাগুলো। ধনীর দুলালরা বাজি ধরেন বিভিন্নভাবে।

অভিজাত হোটেলে গিয়ে তাদের বাজি ধরার ধরনও কিছুটা ভিন্ন এবং অবশ্যই ‘বিগ বাজেট’। বিভিন্ন ম্যাচ ঘিরে জুয়াড়িদের এ তৎপরতা দেখা যায় গ্রাম-বাংলাতেও। প্রত্যন্ত অঞ্চলের পাড়া-মহল্লার বিভিন্ন মোড়ের দোকানগুলোতে চলে এসব জুয়ার বাজি। দলগত হার-জিত নির্ধারণ ছাড়া পাশাপাশি চলে ওভার বা ‘বল বাই বল’ বাজি।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান বলেন, ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ আইপিএলকে ঘিরে সক্রিয় জুয়াড়িদের ধরতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। পাড়া-মহল্লা এমনকি অলিগলিতে যেসব স্থানে টিভিতে খেলা দেখানো হয় সেসব স্থানে গোয়েন্দা মোতায়েন করা হয়েছে। আইপিএল নিয়ে কোনো বাজি বা জুয়ার সঙ্গে কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। টিভি দেখেই দাঁও

আন্তর্জাতিক অঙ্গনের বাজিকররা মাঠে গিয়ে বাজি ধরেন; কিন্তু আমাদের দেশে এক ধরনের জুয়াড়ি আছেন যারা বাজি ধরেন টিভির স্ক্রিনে খেলা দেখে। আজকাল একটু ভালোভাবে খেয়াল করলেই দেখা যায়, যখন কোনো ধরনের খেলা চলে বিশেষ করে টি-২০ কিংবা একদিনের ম্যাচ হলে তো কথাই নেই, জটলা বেঁধে যায় মোড়ের ছোট দোকানগুলোতে। সরেজমিন আইপিএলের একটি খেলা চলাকালে পুরান ঢাকার একটি ছোট্ট চায়ের দোকানে দেখা যায় উপচেপড়া ভিড়। কাছে ভিড়তেই দেখা যায় হাত বদল হচ্ছে টাকা। আর বুঝতে বাকি রইল না এখানে জুয়া চলছে। সম্প্রতি রয়েল চ্যালেঞ্জার ব্যাঙ্গালুরু বনাম কলকাতা নাইট রাইডার্সের মধ্যকার খেলায় বোলিং করতে এলেন অস্ট্রেলিয়ান তারকা অলরাউন্ডার মার্কাস স্টয়নিস, ব্যাটিংয়ে ক্যাবিবীয় অলরাউন্ডার আন্দ্রে রাসেল। তখন একজন দর হাঁকলেন এ ওভারে ১৫ রান নেবেন ঠিক, তখনই আরেকজন বললেন, আমি ১৫ রান না হওয়ার পক্ষে। জমা রাখা হল উভয়পক্ষের ২০০ করে ৪০০ টাকা। সেই ওভারে স্টয়নিসকে কাঁদিয়ে রাসেল নিয়েছিলেন ২৩ রান। মূলত এভাবেই বেটিংয়ের মাধ্যমে চলে বাজি। পাশাপাশি ম্যাচে পাওয়ার প্লেতে (প্রথম ৬ ওভার) কত রান হবে, ৫ থেকে ১০ ওভারে কত রান হবে, টোটাল রান কত হবে, কোন প্লেয়ার বেশি রান করবে সবকিছু নিয়েই চলে বাজি।

বিশেষ সাইট ‘বেট ৩৬৫’: বর্তমানে জুয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় বেটিং সাইট ‘বেট ৩৬৫’। অ্যালেক্সার হিসাব সাইটটির গ্লোবাল র‌্যাংঙ্কিং ২৪৬। বোঝাই যাচ্ছে সাইটটি ভিজিট হচ্ছে লাখ লাখ বার। সাইটটিতে যে কোনো খেলার লাইভ স্ট্রিমিং দেখা যায়। নিয়মিতই পাওয়া যায় আপগ্রেড খবর; এমনকি তা আইপিএলের মতো জমকালো টি-২০ আসর কিংবা মৃতপ্রায় ঘরোয়া ফুটবলের ম্যাচ হলেও। ‘বেট ৩৬৫’ মূলত ক্রীড়াবিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক বেটিং (বাজি ধরার) সাইট, যেখানে বিশ্বের যে কোনো স্থানের ১৮ বছর বা এর বেশি বয়সের যে কেউ যে কোনো খেলা নিয়ে অন্যদের সঙ্গে বাজি ধরতে পারেন। সহজ পথে স্বল্প সময়ে ‘বড়লোক’ হতে গিয়ে অনেকে হারান সর্বস্ব। এমন পরিস্থিতির পেছনে নীরবে ভূমিকা রেখে চলেছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক ক্রীড়া বাজির সাইট ‘বেট ৩৬৫ ডটকম’। কেবল নিজেই অ্যাকাউন্ট খুলে জুয়ায় অংশ নেয়া বা বাজি ধরা হচ্ছে এমনটি নয়। বেট ৩৬৫ সাইটের অ্যাকাউন্ট কেনাবেচার ব্যবসাও জমে উঠছে দিনকে দিন। যে ব্যবসায় প্রাপ্তবয়স্কদের পাশাপাশি স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা অংশ নিচ্ছে। যেহেতু ১৮ বছরের নিচে কেউ এখানে অ্যাকাউন্ট খুলতে পারেন না, তাই অন্যের অ্যাকাউন্ট কিনেই জুয়ায় তথা বাজিতে অংশ নিচ্ছে তারা। ল্যাপটপ, ডেস্কটপ বা মোবাইল সবকিছু দিয়েই এ সাইটে ব্রাউজ করা সম্ভব। এ সাইটে লেনদেন করা যায় ক্রেডিট কার্ড দিয়ে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র বলছে, যদি অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে দিয়ে লেনদেন হয় তাহলে তা মানি লন্ডারিং আইনের (মুদ্রা পাচার) মধ্যে পড়বে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক এ ধরনের অনৈতিক কার‌্যাবলি সম্পর্কে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে।

গ্রামে-গঞ্জে ডিলার ও সাব-ডিলার: ডিলার বলতে সাধারণ বিভিন্ন পণ্যসামগ্রীর পাইকারি বিক্রেতাকে বোঝায়। ইদানীং শহর-নগরে গড়ে উঠেছে জুয়ার বাজির ডিলার। এ ডিলাররাই মূলত বাজি নিয়ন্ত্রণ করে। বিভিন্ন ম্যাচকে ঘিরে ডিলাররা জুয়ার একটা রেট দিয়ে দেন। ম্যাচটি যদি সমান সমান কোনো দলের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয় সেক্ষেত্রে বাজির দরের হেরফের হবে ২০০ টাকা পর্যন্ত। আর শক্তিশালী দলের সঙ্গে দুর্বল দলের খেলা হলে বাজির দরের হেরফের নিম্নে ৫০০ টাকা থেকে কয়েকগুণ বেশি হয়ে থাকে। ডিলার যত বেশি বেশি ম্যাচের ডিল করে দিতে পারবেন তার লাভের অঙ্কটা তত বেশি। যেসব ডিলার লাখ লাখ টাকা ডিল করেন তাদের আবার থাকে কয়েকজন সাব-ডিলার। এরা মূলত ডিলারের কাছে কয়েকটি ম্যাচের ডিল নিয়ে তা মাঠ পর্যায়ে দিয়ে দেন।

ধরে নেয়া যাক, কোনো ম্যাচে বাজির রেট ১৫ থেকে ২০। অর্থাৎ কেউ যদি শক্তিশালী দল নিতে চান তাহলে তাকে ১ হাজার টাকা জিততে হলে ২ হাজার টাকা খাটাতে হবে। অন্যদিকে কেউ অপেক্ষাকৃত কম শক্তির দল নিলে সে ১ হাজার টাকা খাটিয়ে ১ হাজার ৫০০ টাকা জিততে পারবেন। এই যে মাঝখানে ৫০০ টাকার হেরফের এটাই মূলত ডিলারের লাভ। তিনি শুধু বাজি ধরিয়ে দিয়েই ৫০০ টাকা লাভ করছেন। ডিলারদের লাভ সবচেয়ে বেশি হয় ছোট দল জিতলে। আর বড় দল জিতলেও কোনো লোকসান নেই, কেননা বাজির নিয়ম অনুযায়ী, জয়ী বাজিকরের কাছ থেকে প্রতি হাজারে পঁচিশ থেকে পঞ্চাশ টাকা কেটে নেন ডিলার।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ডিলার বলেন, এ লাইনে লাভ যেমন আছে, লোকসানও আছে। ব্যবসা যেহেতু অবৈধ, তাই দুই পক্ষেরই টাকার দায়িত্ব আমাকে নিতে হয়। বাজিতে টাকা লেনদেনের একটা নির্দিষ্ট সময় থাকে। ওই সময়ের মধ্যে হেরে যাওয়াদের মধ্যে কেউ টাকা পরিশোধ না করলে সেই রিস্ক আমাকে নিতে হয়। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, থানা পুলিশকে ম্যানেজ করে চলতে হয়। এভাবেই সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে খেলাধুলা নিয়ে জুয়ার আসর।

বাজির হিসাব সংরক্ষণ: নগদ বাজির পাশাপাশি চলে মাসব্যাপী বাকি বাজির পসরা। এটাকে অনেক বাজিকর মাসিক ইনকামের অংশ হিসেবে দেখেন। তবে অনেক সময় কেউ কেউ নিঃস্ব হয়ে যান বাজির টাকা পরিশোধ করতে। মাসিক বাজির ক্ষেত্রে বাজির দলিল-দস্তাবেজ সংরক্ষণ করা হয় মোবাইল ম্যাসেজের মাধ্যমে। তবে পরিবারের লোকজনের কাছে ধরা পড়ার ভয়ে এক্ষেত্রে বেশ সতর্ক জুয়াড়িরা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা দুটি মোবাইল ব্যবহার করেন। বাজির দরটা বেশি হলে মোবাইলে রেকর্ডিং করে রাখা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বাজিকর জানান, মাসিক বাজিটা সাধারণত করা হয় দীর্ঘদিনের বাজির পার্টনারের সঙ্গে। তবে এক্ষেত্রে বিশ্বাসযোগ্যতা থাকা জরুরি। মাসের নির্দিষ্ট একটা তারিখ দেয়া থাকে ওইদিনই টাকা পরিশোধ করতে হয়। তবে লেনদেনের পরিমাণ বেশি হলে একটা নির্দিষ্ট অংশ অবশ্যই পরিশোধ করতে হয় বলে জানান তিনি। অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাসিক বাজির ক্ষেত্রে তালিকায় যোগ হয় স্পেন, ইতালির বিভিন্ন লিগের ফুটবল ম্যাচগুলো। এক্ষেত্রে র‌্যাংঙ্কিং দেখে বাজির দরটা ঠিক করা হয়।

সৌজন্যে- যুগান্তর