
রাজনৈতিক মামলায় ২০১৮ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ২৫ মাস কারাভোগ করতে হয়। এই সময়ের মধ্যে তিনি সরাসরি কারাগারে ছিলেন ৯ মাস এবং কারাবন্দি অবস্থায় হাসপাতালে কাটিয়েছেন ১৬ মাস। সরকারের নির্বাহী আদেশে ২০২০ সালের ২৫ মার্চ তিনি বাসায় ফেরেন। এরপর আরও পাঁচ বছর ১০ মাস জীবিত ছিলেন, যার মধ্যে অন্তত ৪৮৪ দিন তাঁকে হাসপাতালে থাকতে হয়েছে।
খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতির জন্য বিএনপির নেতাকর্মী ও স্বজনদের অভিযোগ ছিল, কারাবাসের সময় তিনি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাননি। উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার সুযোগ না দেওয়ায় তাঁর অসুস্থতা গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছে যায়। পরবর্তী সময়ে চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও তাঁকে পুরোপুরি সুস্থ করা সম্ভব হয়নি বলে দাবি তাঁদের।
খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও হাসপাতালে তাঁর তত্ত্বাবধানে থাকা ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “ম্যাডাম হেঁটে কারাগারে ঢুকেছিলেন, কিন্তু বের হয়েছেন হুইলচেয়ারে। কারাগারে নেওয়ার পর তাঁকে দীর্ঘদিন একাকিত্বে রাখা হয়েছিল। ধীরে ধীরে চিকিৎসা সংকটের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়, যা পরে আর কাটিয়ে ওঠা যায়নি।”

অন্যদিকে কারা অধিদপ্তর ও কারা হাসপাতাল সূত্র জানায়, কারাগারের ভেতরে খালেদা জিয়ার জন্য সার্বক্ষণিক একজন নারী ফার্মাসিস্ট ও প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের ব্যবস্থা ছিল। নিরাপত্তাজনিত কারণে তাঁর কক্ষে সাধারণ চিকিৎসাসেবা সীমিত ছিল বলেও দাবি করা হয়।
কারাবাসকালে তাঁকে দেখতে যান দুই চিকিৎসক, যাঁদের একজন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নিউরোলজিস্ট অধ্যাপক সৈয়দ ওয়াহিদুর রহমান। তিনি তখন বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানান, খালেদা জিয়া রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপসহ একাধিক জটিল রোগে ভুগছিলেন। তাঁর দুই হাঁটুতে কৃত্রিম প্রতিস্থাপন থাকায় উন্নত পরীক্ষার জন্য বিশেষায়িত হাসপাতালের প্রয়োজন ছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

সেনাকুঞ্জে খালেদা জিয়া
২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি কারাগারে যাওয়ার পর ওই বছরের ৬ অক্টোবর অসুস্থ অবস্থায় তাঁকে তৎকালীন বিএসএমএমইউ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে টানা দুই বছর পাঁচ মাস চিকিৎসা নেন তিনি। ২০২০ সালের ২৫ মার্চ নির্বাহী আদেশে বাসায় ফেরার পরও তাঁর অসুস্থতা কাটেনি।
পরবর্তী পাঁচ বছরে অন্তত ১৫ বার তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। কখনো কোভিড-১৯ সংক্রমণ, কখনো অস্ত্রোপচার, কখনো হঠাৎ শারীরিক জটিলতায় দীর্ঘ সময় কাটে হাসপাতালের বেডে। ২০২৩ সালে একটানা আট মাসের বেশি সময় হাসপাতালে থাকতে হয় তাঁকে। ২০২৪ সালেও একাধিকবার ভর্তি ও ছাড়পত্রের মধ্য দিয়ে কাটে সময়।

উন্নত চিকিৎসার আশায় ২০২৫ সালের ৭ জানুয়ারি তিনি লন্ডনের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন এবং ৫ মে দেশে ফেরেন। দেশে ফেরার পরও একাধিকবার তাঁকে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সর্বশেষ গত ২৩ নভেম্বর রাতে তাঁকে আবার হাসপাতালে নেওয়া হয়।
কারাগার, হাসপাতাল আর বাসার মধ্যে সীমাবদ্ধ এই দীর্ঘ সময়জুড়ে খালেদা জিয়ার জীবন যেন পরিণত হয়েছিল এক অবিরাম চিকিৎসা-সংগ্রামে, যা বাংলাদেশের রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক বেদনাদায়ক অধ্যায় হয়ে।









































