
দলের ভাঙন ঠেকানোই মমতার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে হারের পর মমতা ব্যানার্জীর সামনে কঠিন সময় আসছে, এমন আশঙ্কা শুরু থেকেই ছিল। কিন্তু তাই বলে এত দ্রুত তিনি এবং তার দল তৃণমূল কংগ্রেস এতবড় সঙ্কটে পড়বে তা হয়তো অনেকে ভাবেননি।
দলের সর্ব ভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জী ও সিনিয়র নেতা ও সংসদ সদস্য কল্যাণ ব্যানার্জীর ওপর হামলা, মমতার ডাকা বৈঠকে দলের ৮০ বিধায়কের মধ্যে ৬০ জনের অনুপস্থিতি ছাপিয়ে এবার রীতিমতো ভাঙনের মুখে মমতার দল।
তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) অভ্যন্তরীণ বিরোধ এখন পুরোপুরি প্রকাশ্য। দল থেকে সম্প্রতি বহিষ্কৃত নেতা রিজু দত্ত দাবি করেছেন, তৃণমূলের প্রায় ৫০ জন বিধায়ক তাদের পক্ষে আছেন এবং তারাই দলের প্রকৃত সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ। মমতার সাথে থাকা অংশ সখ্যাগরিষ্ঠ নয়।
মঙ্গলবার ভারতীয় সংবাদ সংস্থা এএনআইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রিজু দত্ত বলেন, সম্প্রতি একটি হোটেলে প্রায় ৫০ জন বিধায়ক বৈঠক করেছেন। তার দাবি, এই সংখ্যা বিধানসভায় দলের দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থনের সমান। তাই আমরাই প্রকৃত তৃণমূল কংগ্রেস। আমাদের সঙ্গে প্রায় ৫০ জন বিধায়ক রয়েছেন। তাই বিরোধীদলীয় নেতা হওয়ার অধিকার ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের, মমতার ঠিক করা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নয়।’
তিনি আরও দাবি করেছেন, যেহেতু সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়ক তাদের পক্ষেই রয়েছেন, তাই দলীয় প্রতীক ব্যবহারের অধিকারও তাদের থাকা উচিত।
‘মহারাষ্ট্র মডেল’ নিয়ে জল্পনা
রিজু দত্তের এই বক্তব্যের পর পশ্চিমবঙ্গে ‘মহারাষ্ট্র মডেল’ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ২০২২ সালে মহারাষ্ট্রে শিবসেনা ভেঙে একনাথ শিন্ডের নেতৃত্বে আলাদা গোষ্ঠী গড়ে ওঠে। এবং পরবর্তীতে দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়কের সমর্থন পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত দলীয় নাম ও প্রতীক ব্যবহারের অধিকারও একনাথ শিন্ডে শিবিরের পক্ষে যায়।
পর্যবেক্ষকদের মতে, রিজু দত্তের বক্তব্যে সেই ঘটনারই ইঙ্গিত রয়েছে।
বর্তমান সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তথাকথিত ‘সিগনেচার স্ক্যান্ডাল’ বা স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগ। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের পরাজয়ের পর বিরোধীদলীয় নেতা ও দলীয় চিফ হুইপ নিয়োগসংক্রান্ত নথি নিয়েই এই বিতর্কের সূত্রপাত।
সম্প্রতি দল থেকে বহিষ্কৃত দুই বিধায়ক— ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহা—অভিযোগ করেন, তৃনমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় জমা দেওয়া কিছু নথিতে তাদের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে। এই অভিযোগের পর বিষয়টি তদন্তে নেমেছে রাজ্যের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। স্পিকারের কাছেও একই অভিযোগ উত্থাপন করবেন।
সোমবার তৃণমূল কংগ্রেস সন্দীপন সাহা ও রিতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে দল থেকে বহিষ্কার করে। দলীয় সূত্রের অভিযোগ, তারা দলবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। তবে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে বহিষ্কারের সময় নিয়ে। কারণ স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগ প্রকাশ্যে আনার পরপরই তাদের বিরুদ্ধে দলীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
মমতার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রিজু দত্তের বক্তব্য তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে আরও প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে। তবে দলীয় প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তার ভাতিজা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর হামলার অভিযোগে রাজ্যজুড়ে প্রতিবাদ কর্মসূচিরও ঘোষণা দিয়েছে তৃণমূল।
তৃণমূলের এই অভ্যন্তরীণ সংকট শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয়, তা এখনই বলা কঠিন। তবে স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগে সিআইডির তদন্ত এবং দলের ভেতরের বিরোধ ও ভাঙনের শঙ্কা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।













































