
নিকোলাস মাদুরো
শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা দেয়, তারা ভেনেজুয়েলায় একটি “বৃহৎ পরিসরের হামলা” চালিয়ে তেলসমৃদ্ধ দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে জানান, মাদুরো দম্পতিকে “দেশের বাইরে উড়িয়ে নেওয়া হয়েছে”।
ট্রাম্প আরও লেখেন, “এই অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে পরিচালিত হয়েছে।” তিনি এসময় বলেন, ক্ষমতার নিরাপদ রূপান্তর না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলা ‘চালাবে’।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, নিউইয়র্কে মাদুরো ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে।
ভেনেজুয়েলায় কী ঘটতে যাচ্ছে—তা জানতে দেশটির জনগণ উৎকণ্ঠার মধ্যে অপেক্ষা করছে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে একাধিক বিশ্বনেতা জানিয়েছেন, তারা নিজ নিজ দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে পরিস্থিতির পরবর্তী ধাপ পর্যবেক্ষণ করছেন। এই হামলাকে ১৯৮৯ সালের পর লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কিন্তু কে এই নিকোলাস মাদুরো! যার ওপর ট্রাম্প প্রশাসন এতোটা খড়গ হস্ত।
বাসচালক থেকে শাভেজের ঘনিষ্ঠ সহযোগী
নিকোলাস মাদুরোর জন্ম ১৯৬২ সালের ২৩ নভেম্বর। তার বাবা ছিলেন একজন ট্রেড ইউনিয়ন নেতা। শ্রমজীবী পরিবারের সন্তান মাদুরো নব্বইয়ের দশকের শুরুতে একজন বাসচালক হিসেবে কাজ করতেন।
সে সময় সেনা কর্মকর্তা হুগো শাভেজ ভেনেজুয়েলা সরকারের বিরুদ্ধে ব্যর্থ অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দিয়ে কারাবন্দি হন। মাদুরো শাভেজের মুক্তির দাবিতে প্রচারণা চালান এবং তার বামপন্থী রাজনৈতিক এজেন্ডাকে সমর্থন করেন।
১৯৯৮ সালে শাভেজ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর মাদুরো আইনসভায় আসন লাভ করেন এবং দ্রুত সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে উঠে আসেন। পরবর্তীতে শাভেজ তাকে নিজের উত্তরসূরি হিসেবে বেছে নেন। শাভেজের মৃত্যুর পর ২০১৩ সালে মাদুরো অল্প ব্যবধানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
মাদুরোর শাসনামল
মাদুরোর শাসনামলে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি ভয়াবহভাবে ভেঙে পড়ে। অতিমুদ্রাস্ফীতি, দীর্ঘমেয়াদি পণ্যসংকট এবং জীবনযাত্রার চরম অবনতি দেশটিকে সংকটে ফেলে।
তার শাসন সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয় বিতর্কিত ও কারচুপির নির্বাচন, খাদ্যসংকট এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে। ২০১৪ ও ২০১৭ সালে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে কঠোর অভিযান চালানো হয়। এর ফলে লাখো মানুষ দেশ ছাড়তে বাধ্য হন, যাদের একটি বড় অংশ কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নেন।
২০২৪ সালের নির্বাচনের পর জানুয়ারি ২০২৫-এ মাদুরো তৃতীয় মেয়াদে শপথ নেন। ওই নির্বাচন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও বিরোধীদের কাছে ব্যাপকভাবে বিতর্কিত ও জালিয়াতিপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। তবে তার বিজয়কে সমর্থন দেয় রাশিয়া, তুরস্ক ও চীন।
নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর হাজারো বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ
জাতিসংঘের একটি সাম্প্রতিক তদন্ত প্রতিবেদনে ভেনেজুয়েলার নিরাপত্তা বাহিনী, বিশেষ করে বলিভারিয়ান ন্যাশনাল গার্ড (জিএনবি)-এর বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রমাণ পাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তদন্ত দলের প্রধান মার্তা ভালিনাস বলেন, “বিরোধীদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত ও সমন্বিত দমন-পীড়নে জিএনবির ভূমিকা এক দশকের বেশি সময় ধরে অব্যাহত রয়েছে। এসব অপরাধের ধারাবাহিকতা এবং ন্যায়বিচারের অভাব জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কঠোর জবাব দাবি করে।”
যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আসছে। ২০২০ সালে ওয়াশিংটন তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অন্যান্য অভিযোগে মামলা করে। মাদুরো এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বরাবরই বলে আসছেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিতে চায়।
বর্তমানে মাদুরো ও তার স্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রে ফৌজদারি মামলার মুখোমুখি হচ্ছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের রাজনীতিকরা শনিবারের অভিযানের আইনগত বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান সিনেটর মাইক লি এক্সে লিখেছেন, “যুদ্ধ ঘোষণা বা সামরিক শক্তি ব্যবহারের অনুমোদন ছাড়াই এই পদক্ষেপ সাংবিধানিকভাবে কীভাবে বৈধ—তা জানতে আমি আগ্রহী।”



































