সোমবার । মার্চ ২৩, ২০২৬
বাংলা টেলিগ্রাফ ডেস্ক জাতীয় ৬ জানুয়ারি ২০২৬, ৬:১৩ অপরাহ্ন
শেয়ার

গভীর সমুদ্রে গবেষণা জোরদারে প্রধান উপদেষ্টার আহ্বান


CA Fish

বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রসম্পদ সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান ও গবেষণার ঘাটতির কথা তুলে ধরে এ খাতে গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেছেন, দেশের স্থলভাগের সমান বিস্তৃত জলভাগ থাকা সত্ত্বেও সামুদ্রিক সম্পদের প্রকৃত পরিমাণ ও সম্ভাবনা সম্পর্কে এখনো পূর্ণাঙ্গ ধারণা তৈরি হয়নি।

প্রধান উপদেষ্টার মতে, এই বিপুল সামুদ্রিক সম্পদকে টেকসইভাবে কাজে লাগাতে হলে ব্যাপক গবেষণা, তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং কার্যকর নীতিগত সহায়তা অপরিহার্য।

মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) সকালে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অনুষ্ঠিত এক সভায় এসব কথা বলেন তিনি। সভায় সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ ও ইকোসিস্টেম নিয়ে গবেষণা জাহাজ আর.ভি. ড. ফ্রিডটজফ ন্যানসেন–এর মাধ্যমে পরিচালিত সাম্প্রতিক জরিপ ও গবেষণার প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার কাছে উপস্থাপন করা হয়।

সভায় উপস্থিত ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার, প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সায়েদুর রহমান চৌধুরী এবং মৎস্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ড. মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন।

সভায় গবেষণার ফলাফল তুলে ধরে অধ্যাপক সায়েদুর রহমান জানান, জরিপে ৬৫টি নতুন জলজ প্রাণীর প্রজাতির অস্তিত্ব শনাক্ত হয়েছে। তবে একই সঙ্গে উঠে এসেছে বেশ কিছু উদ্বেগজনক চিত্র। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গভীর সমুদ্রে জেলিফিশের অস্বাভাবিক বিস্তার সামুদ্রিক ভারসাম্যহীনতার ইঙ্গিত দিচ্ছে, যার অন্যতম কারণ অতিরিক্ত মাছ আহরণ।

তিনি আরও জানান, সমুদ্রের প্রায় দুই হাজার মিটার গভীরতাতেও প্লাস্টিক বর্জ্যের উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি। ২০১৮ সালের গবেষণার সঙ্গে তুলনা করে দেখা গেছে, গভীর ও স্বল্প গভীর—উভয় এলাকাতেই বড় আকারের মাছের সংখ্যা ক্রমাগত কমে যাচ্ছে।

বর্তমানে প্রায় ২৭০ থেকে ২৮০টি বড় ট্রলার গভীর সমুদ্রে মাছ ধরায় নিয়োজিত রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৭০টি ট্রলার শব্দতরঙ্গভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক মাছ শিকার করছে, যা অত্যন্ত আগ্রাসী পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এতে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরায় যুক্ত জেলেরা লাভবান হলেও উপকূলীয় ও স্বল্প গভীর পানির জেলেরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার সতর্ক করে বলেন, এই ধারা অব্যাহত থাকলে বঙ্গোপসাগরে মাছের সংকট আরও তীব্র হতে পারে। শব্দতরঙ্গভিত্তিক মাছ ধরা নিয়ন্ত্রণে সরকার শিগগিরই নীতিগত সিদ্ধান্ত নেবে বলে তিনি জানান।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রে টুনা মাছের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে, যা অর্থনৈতিকভাবে বড় সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে। পাশাপাশি সুন্দরবনের নিচে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাছের প্রজনন ক্ষেত্রের সন্ধান পাওয়া গেছে, যা সংরক্ষণের জন্য সরকার ইতোমধ্যে নির্দেশনা দিয়েছে।

সভায় জানানো হয়, যুক্তরাজ্যের রাজকীয় নৌবাহিনীর একটি আধুনিক জলতল পরিমাপ ও সমুদ্রবিজ্ঞান জরিপ জাহাজ বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এই জাহাজ সমুদ্রতল, গভীরতা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক তথ্য সংগ্রহে সহায়তা করবে, যা দেশের গবেষণা সক্ষমতা বাড়াবে।

জাপান, ইন্দোনেশিয়া ও মালদ্বীপের সঙ্গে যৌথ গবেষণা কার্যক্রম জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আগে সমস্যাগুলো সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে গবেষণা এগিয়ে নিতে হবে। এর মাধ্যমেই দেশের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যাবে।