
উভয় দেশই বুঝতে পারে যে বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় তাদের একে অপরকে প্রয়োজন
গেলো বছরের সেপ্টেম্বরে বেইজিংয়ের তিয়ানআনমেন স্কয়ারে হাঁটার সময় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যে অঙ্গ প্রতিস্থাপন ও দীর্ঘায়ু নিয়ে এক অদ্ভুত আলাপ হয়েছিল।
পুতিন বলেন, ‘মানবদেহের অঙ্গ ক্রমাগত প্রতিস্থাপন করা সম্ভব। এতে মানুষ দীর্ঘজীবী হবে, আরও তরুণ থাকবে, এমনকি অমরত্বও পেতে পারে।’
জবাবে শি জিনপিং বলেন, ‘কেউ কেউ ভবিষ্যদ্বাণী করছেন, এই শতাব্দীতে মানুষ ১৫০ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারবে।’
দুই নেতার এই কথোপকথন তাদের সম্পর্কের একটি বিরল দিক উন্মোচন করে। বহু বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা এই দুই নেতা একে অপরকে ‘সবচেয়ে ভালো বন্ধু’ বলে উল্লেখ করেছেন এবং আপাতত তাদের ক্ষমতা ছাড়ার কোনো সম্ভাবনাও নেই।
আট মাসের ব্যবধানে চলতি সপ্তাহে পুতিন আবারও বেইজিং সফরে যাচ্ছেন। চীন ও রাশিয়ার মধ্যে ‘সুপ্রতিবেশী ও বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা চুক্তি’র ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে তার এই সফর হবে।
সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, তখন তাকে জাঁকজমকপূর্ণ ভোজ ও বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে স্বাগত জানানো হয়েছিল। তুলনায় পুতিনের সফর অনেকটাই নীরব ও সীমিত প্রচারণার মধ্যে হচ্ছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটনের অনেকের আশা ছিল ট্রাম্প হয়তো চীনকে রাশিয়া থেকে দূরে সরাতে পারবেন। কিন্তু বাস্তবে সেই সম্ভাবনা খুবই কম।
‘সীমাহীন বন্ধুত্ব’, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন
চীন ও রাশিয়া তাদের সম্পর্ককে “সীমাহীন বন্ধুত্ব” বলে বর্ণনা করলেও বাস্তবে সম্পর্কটি অনেকটাই অসম।
বিশ্লেষকরদের মতে, রাশিয়া এখন পুরোপুরি চীনের ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে চীন রাশিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। অন্যদিকে রাশিয়ার অংশ চীনের মোট আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাত্র ৪ শতাংশ।
পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়া ক্রমেই চীনের দিকে ঝুঁকেছে। প্রযুক্তি, শিল্প ও বৈজ্ঞানিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও এখন বেইজিং মস্কোর প্রধান ভরসা।
২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়া আরও বেশি চীনা প্রযুক্তি ও যন্ত্রাংশের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ার ‘নিষিদ্ধ’ প্রযুক্তির ৯০ শতাংশের বেশি এখন চীন থেকে আসে।
পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়েও রাশিয়ার টেলিযোগাযোগ খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে।
সম্পর্কের পাল্লা যদিও চীনের দিকে ভারী, তবুও রাশিয়ারও কিছু বড় শক্তি রয়েছে। রাশিয়ার বিশাল জ্বালানি সম্পদ চীনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বৈশ্বিক অস্থিরতার সময় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বেইজিং, রাশিয়ার তেল-গ্যাসের ওপর নির্ভর করছে।
মিত্র নয়, কৌশলগত অংশীদার
বিশ্লেষকরা বলছেন, চীন ও রাশিয়া আনুষ্ঠানিক সামরিক মিত্র নয়। বরং তারা ‘নমনীয় কৌশলগত অংশীদার।’ দুই দেশের মধ্যে ৪ হাজার ৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। অতীতে যা ছিল উত্তেজনার উৎস, এখন তা সহযোগিতার ভিত্তি হয়ে উঠেছে।
চীন ও রাশিয়া দু’দেশই যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার বিরোধিতা করে। মানবাধিকার প্রশ্নে পশ্চিমা দেশগুলো যেখানে চীন বা রাশিয়ার সমালোচনা করে, সেখানে বেইজিং ও মস্কো একে অপরকে প্রকাশ্যে সমালোচনা করে না।
তবে বিশেষজ্ঞদের বলছেন, দুই দেশের সম্পর্ক পুরোপুরি আবেগের নয়, বরং বাস্তব স্বার্থের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। চীন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ করতে চায় না। অন্যদিকে রাশিয়া অনেক বেশি আক্রমণাত্মক অবস্থান নিতে আগ্রহী।
তবুও উভয় দেশই বুঝতে পারে যে বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় তাদের একে অপরকে প্রয়োজন।
বিবিসি















































