
খাবারের স্বাদ আসলে শুধু জিহ্বায় থাকে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে যায় সময়, যাত্রা, মানুষ আর স্মৃতি
বাংলাদেশের রেলপথের ইতিহাসে সান্তাহার রেলওয়ে স্টেশন শুধু একটি স্টেশন নয়, এক ধরনের যাত্রাবিরতির সংস্কৃতি। বহু দূরপাল্লার ট্রেন এখানে থামে। কেউ নামেন চা খেতে, কেউ পানি নিতে, কেউ শুধু একটু পা টানটান করতে। কিন্তু অনেকের কাছে সান্তাহার মানেই আরেকটি বিষয়—স্টেশনের পাশের দুই পুরোনো খাবারের হোটেল। একটির নাম স্টার হোটেল। অন্যটি বিসমিল্লাহ হোটেল।
দুই হোটেল পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে বহু বছর ধরে। একই ধরনের রান্না। একই ধরনের ব্যস্ততা। একই ধরনের ধোঁয়া ওঠা কড়াই। কিন্তু স্বাদে আছে আলাদা চরিত্র। একজন যেন ঝালপ্রিয়, দাপুটে। আরেকজন একটু নরম, ভারসাম্যপূর্ণ।
সান্তাহারে যারা নিয়মিত যাতায়াত করেন, তাদের কাছে এই দুই হোটেলের তুলনা নতুন কিছু নয়। কার নেহারী ভালো, কার বিরিয়ানি সেরা, কার মিষ্টি বেশি জনপ্রিয়—এসব নিয়ে আলোচনা বহু পুরোনো।
স্টার হোটেলের যাত্রা শুরু ১৯৭৪ সালে। স্বাধীনতার পরের বাংলাদেশ তখনো পুনর্গঠনের সময় পার করছে। সেই সময় থেকেই স্টেশনের পাশে ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে ওঠে হোটেলটি। ট্রেনের যাত্রী, ব্যবসায়ী, রেলকর্মী—সবাই মিলে তৈরি করে এর ক্রেতাভিত্তি। পরে নব্বইয়ের দশকে আসে বিসমিল্লাহ হোটেল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটিও নিজের আলাদা পরিচয় গড়ে তোলে।
দুই হোটেলের মেনু প্রায় একই। নেহারী, খাসির বিরিয়ানি, চিকেন চাপ, গ্রীল, ভাত, খাসির মাংস, হাঁসের মাংস—সবই পাওয়া যায়। মিষ্টিও আছে। কিন্তু একই খাবার হয়েও স্বাদের সূক্ষ্ম পার্থক্যই তৈরি করেছে তাদের আলাদা পরিচয়।
স্টার হোটেলের সবচেয়ে বড় পরিচিতি সম্ভবত তার নেহারী আর খাসির বিরিয়ানি। সকালের দিকে গেলে বড় বড় হাঁড়িতে ধীরে ধীরে ফুটতে থাকা নেহারীর গন্ধ আগে এসে লাগে। মসলার ঘ্রাণ ভারী। ঝালও বেশি। প্রথম চামচ মুখে নেওয়ার পরই বোঝা যায়, রান্নাটা ‘মাইল্ড’ হওয়ার জন্য করা হয়নি। এতে একটা পুরোনো ঢঙ আছে। এমন স্বাদ, যা অনেকটা উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী ঝাল রান্নার কথা মনে করিয়ে দেয়।

অনেকের কাছে স্টারের নেহারী একটু বেশি আগ্রাসী মনে হতে পারে
তবে সবাই এই ঝাল সমানভাবে নিতে পারেন না। অনেকের কাছে স্টারের নেহারী একটু বেশি আগ্রাসী মনে হতে পারে। সেখানেই বিসমিল্লাহর নেহারী আলাদা জায়গা করে নেয়।
বিসমিল্লাহ হোটেলের নেহারীতে মসলার গভীরতা আছে, কিন্তু ঝালের চাপ তুলনামূলক কম। ফলে সেটা খেতে আরামদায়ক লাগে। দীর্ঘ ভ্রমণের মধ্যে এমন খাবার অনেক যাত্রীর কাছেই বেশি স্বস্তিদায়ক। বিশেষ করে যারা অতিরিক্ত ঝাল এড়িয়ে চলেন, তারা বিসমিল্লাহর নেহারীকেই এগিয়ে রাখেন।
কিন্তু বিরিয়ানির প্রসঙ্গ এলে অনেকেই আবার স্টার হোটেলের দিকেই ফিরে যান। স্টারের খাসির বিরিয়ানিতে মাংসের পরিমাণ চোখে পড়ে। মসলার ব্যবহারও ভারসাম্যপূর্ণ কিন্তু সমৃদ্ধ। ভাতের সঙ্গে মাংসের গন্ধ মিশে যে ভারী স্বাদ তৈরি হয়, সেটাই সম্ভবত এর জনপ্রিয়তার মূল কারণ। এখানে বিরিয়ানি খেতে বসলে বোঝা যায়, রান্নাটিকে শুধু ‘স্টেশন খাবার’ হিসেবে বানানো হয়নি। বরং এতে এক ধরণের যত্ন আছে।
বিসমিল্লাহর বিরিয়ানিও খারাপ নয়। কিন্তু স্টারের বিরিয়ানিতে যে মসলার গভীরতা ও মাংসের উদারতা পাওয়া যায়, সেটা একটু বেশি শক্তিশালী অভিজ্ঞতা তৈরি করে।
দুই হোটেলের চিকেন চাপ নিয়ে আলাদা করে কথা বলতেই হয়। দুই জায়গাতেই চিকেন চাপ ঝাল। যথেষ্ট ঝাল। এমন ঝাল, যা খেতে খেতে অনেকের কপালে ঘাম চলে আসে। তবে সেই ঝালের মধ্যেও স্বাদ আছে। মুরগির মাংসে মসলার আস্তরণ ভালোভাবে ঢুকে যায়। সঙ্গে যদি গরম পরোটা বা নরম রুটি থাকে, তাহলে পুরো ব্যাপারটা জমে ওঠে।
গ্রীলও দুই হোটেলের জনপ্রিয় আইটেম। বাইরে হালকা পোড়া রং, ভেতরে রসালো মাংস, আর ওপরে মসলার স্তর—এই গ্রীল অনেক যাত্রীর জন্য ট্রেন ধরার আগের দ্রুত কিন্তু তৃপ্তিকর খাবার।
স্টেশনের পরিবেশও এই খাবারের অভিজ্ঞতার বড় অংশ। বাইরে ট্রেনের হুইসেল বাজছে। প্ল্যাটফর্মে যাত্রীদের হাঁটাহাঁটি। কেউ ব্যাগ টানছেন, কেউ চা খাচ্ছেন। আর তার মাঝেই হোটেলের ভেতরে বিশাল হাঁড়ি থেকে ধোঁয়া উঠছে। কর্মচারীরা দ্রুত প্লেট সাজাচ্ছেন। কেউ নেহারী ঢালছেন, কেউ বিরিয়ানির হাঁড়ি খুলছেন। পুরো পরিবেশে একটা ব্যস্ত কিন্তু পরিচিত উষ্ণতা আছে।
এই দুই হোটেলের আরেকটি মজার বিষয় হলো—দাম প্রায় একই।
প্রতিযোগিতা আছে, কিন্তু সেটি কেবল নামের নয়; স্বাদেরও। তাই ক্রেতারাও অনেক সময় দল ভাগ করে ফেলেন। কেউ বলেন, ‘নেহারী খেতে হলে বিসমিল্লাহ।’ আবার কেউ বলেন, ‘বিরিয়ানির জন্য স্টারের বিকল্প নেই।’

আসলে এই দুই হোটলের গল্প কেবল খাবারের গল্প নয়। এটি উত্তরবঙ্গের ভ্রমণসংস্কৃতিরও অংশ
মিষ্টির ক্ষেত্রেও দুই হোটেলের নিজস্ব শক্তি আছে। স্টার হোটেলের জিলাপি বেশ জনপ্রিয়। গরম জিলাপিতে কামড় দিলে ভেতর থেকে রস বের হয়। বাইরে হালকা মচমচে, ভেতরে নরম। দইও মোটামুটি ভালো মানের। ভারী ঝাল খাবারের পর ঠান্ডা দই অনেকের কাছেই স্বস্তি এনে দেয়।
অন্যদিকে বিসমিল্লাহ হোটেলের কালো জাম আলাদা করে প্রশংসা পাওয়ার মতো। নরম, রসালো, আর অতিরিক্ত মিষ্টি নয়। দইও ভালো। ফলে অনেকেই মূল খাবার শেষে মিষ্টির জন্য বিসমিল্লাহর দিকে ঝুঁকে পড়েন।
আসলে এই দুই হোটলের গল্প কেবল খাবারের গল্প নয়। এটি উত্তরবঙ্গের ভ্রমণসংস্কৃতিরও অংশ।
বাংলাদেশে এমন অনেক খাবারের জায়গা আছে, যেগুলো কোনো বড় শহরের অভিজাত রেস্তোরাঁ নয়, কিন্তু মানুষের স্মৃতিতে গভীরভাবে থেকে যায়। সান্তাহারের স্টার হোটেল ও বিসমিল্লাহ হোটেল ঠিক তেমনই দুই নাম।
কেউ হয়তো বহু বছর আগে প্রথমবার ট্রেন ভ্রমণে এখানে নেমে নেহারী খেয়েছিলেন। কেউ হয়তো রাতের ট্রেন মিস করে বসে বিরিয়ানি খেতে খেতে সময় কাটিয়েছেন। আবার কেউ শুধু এই দুই হোটেলের খাবারের জন্যই সান্তাহারে নামেন।
খাবারের স্বাদ আসলে শুধু জিহ্বায় থাকে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে যায় সময়, যাত্রা, মানুষ আর স্মৃতি। সান্তাহারের এই দুই হোটেল সেই স্মৃতিরই অংশ হয়ে আছে বহু বছর ধরে।
বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প













































