রবিবার । জুন ৭, ২০২৬
ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক আন্তর্জাতিক ৭ জুন ২০২৬, ১:৪৫ অপরাহ্ন
শেয়ার

এখন কেন উত্তর কোরিয়া সফরে যাচ্ছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং?


XI

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের উত্তর কোরিয়া সফর এবং দেশটির নেতা কিম জং উনের সঙ্গে রোববার পিয়ংইয়ংয়ে বৈঠক আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

তবে বিস্ময়ের বিষয় দুজন নেতার সাক্ষাৎ নয়। কারণ এর আগে গত বছর বেইজিংয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসানের ৮০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত বিশাল সামরিক কুচকাওয়াজের সময়ও তাদের মধ্যে বৈঠক হয়েছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, এবারের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো—শি নিজেই উত্তর কোরিয়ায় যাচ্ছেন। ২০১৯ সালের পর এই প্রথম তিনি পিয়ংইয়ং সফর করছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদেশ সফর অনেক কমিয়ে দিয়েছেন শি। এমনকি বর্তমানে বিশ্বের অনেক নেতা, যেমন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিংবা রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, সাধারণত বেইজিংয়ে গিয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

সংকট বিশ্লেষক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ বলছে, শি জিনপিংয়ের এই সফর প্রমাণ করে যে বেইজিং এ সফরকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে।

রাশিয়া-উত্তর কোরিয়া ঘনিষ্ঠতা নিয়ে চীনের উদ্বেগ
বিশ্লেষকদের ধারণা, উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান সম্পর্কই শি জিনপিংয়ের সফরের অন্যতম কারণ। দীর্ঘদিন ধরে চীন-উত্তর কোরিয়া সম্পর্কের ক্ষেত্রে বেইজিং ছিল জ্যেষ্ঠ অংশীদার। এক সময় উত্তর কোরিয়ার প্রায় ৯৫ শতাংশ বাণিজ্য চীনের ওপর নির্ভরশীল ছিল।

কিন্তু ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। যুদ্ধের সময় উত্তর কোরিয়া রাশিয়াকে অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং সেনা সহায়তা দিয়েছে বলে পশ্চিমা বিশ্লেষকদের ধারণা।

দক্ষিণ কোরিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সাল থেকে সৈন্য মোতায়েন ও অস্ত্র সরবরাহের বিনিময়ে রাশিয়া উত্তর কোরিয়াকে প্রায় ১৪ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার দিয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই অর্থের বড় অংশ সরাসরি নগদ নয়; বরং উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, যন্ত্রাংশ ও বিশেষ সামগ্রী হিসেবে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, চীন কখনোই উত্তর কোরিয়াকে অতিরিক্ত সামরিকভাবে শক্তিশালী দেখতে চায়নি। কারণ রাশিয়ার সহায়তায় উত্তর কোরিয়ার সামরিক সক্ষমতা দ্রুত বৃদ্ধি পেলে তা কোরীয় উপদ্বীপের বিদ্যমান ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।

উত্তর কোরিয়ার সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি
চলতি বছরের শুরু থেকে উত্তর কোরিয়া ইতোমধ্যে আটটি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে। গত মে মাসে দেশটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিনির্ভর নতুন একটি ট্যাকটিক্যাল ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও উন্মোচন করে।

এ ছাড়া সম্প্রতি উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে এমন কিছু ছবি প্রকাশ করা হয়েছে, যা দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি দ্রুত সম্প্রসারণের ইঙ্গিত বহন করে।

কোরীয় উপদ্বীপে উত্তেজনা ও চীনের ভূমিকা
১৯৫০ সালের কোরিয়া যুদ্ধের পর থেকে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া প্রযুক্তিগতভাবে এখনো যুদ্ধাবস্থায় রয়েছে। ১৯৫৩ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাধ্যমে সংঘাত স্থগিত হলেও কোনো আনুষ্ঠানিক শান্তিচুক্তি হয়নি।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক আরও অবনতি হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালে কিম জং উন কোরীয় পুনর্মিলনের দীর্ঘদিনের লক্ষ্য বাতিল করার পর উত্তেজনা নতুন মাত্রা পায়।

দক্ষিণ কোরিয়ার অবশ্য আশা প্রকাশ করেছে যে, শি জিনপিংয়ের এই সফর কোরীয় উপদ্বীপ-সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

জাপান-দক্ষিণ কোরিয়া ঘনিষ্ঠতাও উদ্বেগের কারণ
বিশ্লেষকদের মতে, পূর্ব এশিয়ার সাম্প্রতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিও চীনের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। গত সপ্তাহে সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত শাংগ্রিলা ডায়ালগে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মধ্যে সম্ভাব্য সামরিক-লজিস্টিক সহযোগিতা চুক্তির বিষয়টি আলোচনায় আসে।

চীন ও জাপানের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই উত্তেজনাপূর্ণ। ১৯৩০ ও ১৯৪০-এর দশকে জাপানের সাম্রাজ্যবাদী শাসনের স্মৃতি এবং টোকিওর সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির সাম্প্রতিক উদ্যোগ নিয়ে বেইজিংয়ের আপত্তি রয়েছে।

এমন প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষকদের ধারণা, উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করা, রাশিয়ার বাড়তি প্রভাব মোকাবিলা করা এবং কোরীয় উপদ্বীপে নিজের প্রভাব বজায় রাখাই শি জিনপিংয়ের এই সফরের প্রধান লক্ষ্য।

বাংলা টেলিগ্রাফ পর্যবেক্ষণ