
কেন আম পাড়তে হয় পঞ্জিকা মেনে?
প্রকৃতির এক অদ্ভুত শৃঙ্খলা মেনে প্রতি বছর মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে দেশের ফলের বাজারে নামে বাহারি আমের ঢল। ১৫ মে থেকে শুরু হয়ে আম-উৎসবের এই রমরমা আমেজ চলে প্রায় আগস্ট মাস পর্যন্ত। তবে মুশকিল হলো, আমভক্ত হিসেবে বিশ্বে শীর্ষ তালিকায় থাকলেও আমরা অনেকেই এখনও সঠিক জাতের আম চিনতে ভুল করি। ল্যাংড়া, ফজলি আর আশ্বিনার চেনা বৃত্তের বাইরে বাজারে আসা প্রায় ২৫টি বাণিজ্যিক জাতের ভিড়ে আসল আম চেনা সাধারণ ক্রেতাদের জন্য বেশ কঠিন।
এই সুযোগেই ফলের বাজারে জমে ওঠে অসাধু ব্যবসায়ীদের ছলচাতুরী আর কেমিক্যাল মেশানোর নীরব প্রতিযোগিতা। বেশি মুনাফার আশায় মৌসুমের শুরুতেই ক্ষতিকর ক্যালসিয়াম কার্বাইড বা হরমোন স্প্রে করে কাঁচা আম কৃত্রিমভাবে পাকিয়ে বাজারে ছাড়ার চেষ্টা করে একটি চক্র।
অসাধু এই চক্রের দৌরাত্ম্য রুখতে এবং সাধারণ মানুষের পাতে শতভাগ নিরাপদ ও সুস্বাদু আম পৌঁছে দিতে প্রতি বছরই ঢাল হয়ে দাঁড়ায় জেলা প্রশাসন ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ‘ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার’ বা আম পাড়ার সময়সূচি। কৃষি কর্মকর্তারা জানান, গাছে প্রাকৃতিকভাবে আম পাকার জন্য এই আইনি ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা মেনে চলা বাধ্যতামূলক।
সময়ের আগে অপরিপক্ব আম পেড়ে ফেললে ফলটি তার আসল সুগন্ধ ও মিষ্টি স্বাদ হারায়। ক্যালেন্ডার অনুযায়ী আম পাড়লে ফলটি গাছ থেকে পর্যাপ্ত পুষ্টি পেয়ে পরিপুষ্ট হওয়ার সুযোগ পায়, যা ক্রেতাদের জন্য খাঁটি ও নিরাপদ আমের নিশ্চয়তা দেয়।
সব জাতের আম কিন্তু একসঙ্গে পাকে না। প্রকৃতির এই নিয়মকে সম্মান জানাতেই ক্যালেন্ডার ধরে আম নামানো হয়। যেমন— মে মাসের মাঝামাঝি বাজারে আসে গুটি ও গোপালভোগ, মে-র শেষে বা জুনের শুরুতে হিমসাগর ও ল্যাংড়া, জুনের শেষ ভাগে হাঁড়িভাঙা এবং জুলাই-আগস্টের দিকে দেখা মেলে ফজলি ও আশ্বিনার।
এই পর্যায়ক্রমিক সরবরাহ ঠিক থাকায় বাজারে আমের সঠিক দাম বজায় থাকে, ফলে উপকৃত হন চাষি ও ভোক্তা উভয়েই। শুধু দেশের বাজারেই নয়, বর্তমানে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে বাংলাদেশের আমের যে বিপুল চাহিদা তৈরি হয়েছে, তার সুনাম ধরে রাখতেও শতভাগ কেমিক্যালমুক্ত ও পরিপক্ব আম রপ্তানি করা জরুরি।
রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ বা সাতক্ষীরার মতো প্রধান আম উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলোর আবহাওয়া ও তাপমাত্রার ওপর ভিত্তি করেই মূলত এই অঞ্চলভিত্তিক ক্যালেন্ডার তৈরি করা হয়। তবে নিয়মের বাইরে যদি কোনো চাষির গাছে সময়ের আগেই আম পেকে যায়, তবে কৃষি বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরিপক্বতা যাচাই সাপেক্ষে আম পাড়ার বিশেষ অনুমতি নেওয়ার সুযোগও রয়েছে।
কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, এই নিয়মের মূল লক্ষ্যই হলো গণহারে কাঁচা-পাকা আম পেড়ে ভালো মালের ভেতরে খারাপ মাল মিশিয়ে বাজার নষ্ট করার প্রবণতা বন্ধ করা। আর নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়ায় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হয়। মূলত আমের আসল গুণগত মান ও বৈশ্বিক সুনাম ধরে রাখতে এই ‘আম ক্যালেন্ডার’ এখন দেশের ফলন সংস্কৃতির এক অপরিহার্য অংশ।
উদ্যোগের গল্প


















































