বৃহস্পতিবার । মে ২১, ২০২৬
বাংলা টেলিগ্রাফ ডেস্ক লাইফস্টাইল ২১ মে ২০২৬, ১০:৪৫ পূর্বাহ্ন
শেয়ার

চা প্রেমীদের দিন আজ, আন্তর্জাতিক চা দিবস


tea day

ধোঁয়া ওঠা এক কাপ গরম চা। আর সেই কাপে আলতো চুমুকেই লুকিয়ে থাকে পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের ক্লান্তি মুক্তির মহৌষধ। সকালের আলসেমি কাটানো থেকে শুরু করে বন্ধুদের বিকেলের জমজমাট আড্ডা—চা যেন আমাদের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। আজ ২১ মে, আন্তর্জাতিক চা দিবস। কেবল একটি জনপ্রিয় পানীয় হিসেবেই নয়, বিশ্ব অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের সাথে জড়িয়ে থাকা এই অনন্য পাতাটির গুরুত্বকে উদযাপন করতেই বিশ্বজুড়ে আজ পালিত হচ্ছে বিশেষ এই দিনটি।

চায়ের ইতিহাস কিন্তু হাজার বছরের পুরোনো। কথিত আছে, খ্রিষ্টপূর্ব ২৭২৭ অব্দে চীনের সম্রাট শেন নুং-এর রাজপ্রাসাদে একদিন গরম পানির পাত্রে বাতাস উড়ে এসে কিছু বুনো পাতার টুকরো পড়ে। সম্রাট সেই পানি পান করে এক অদ্ভুত স্বাদ ও নতুন শক্তির সন্ধান পান। মূলত চিকিৎসাগুণ সম্পন্ন ভেষজ হিসেবে শুরু হলেও, পরবর্তীতে এটি রাজকীয় পানীয়তে রূপ নেয়। ১৬ শতকের দিকে পর্তুগিজ বণিকদের মাধ্যমে চা এশিয় মহাদেশ থেকে ইউরোপে পৌঁছায় এবং ১৭ শতকে এটি ব্রিটিশদের হাত ধরে বিশ্বজুড়ে এক বৈপ্লবিক পানীয় হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে।

কিভাবে পেলাম চা দিবস
আন্তর্জাতিক চা দিবসের পেছনে রয়েছে বিশ্বায়নের যুগে বড় বড় করপোরেট কোম্পানির শোষণের বিরুদ্ধে চা শ্রমিকদের এক ঐতিহাসিক লড়াইয়ের গল্প। ২০০৪ সালের জানুয়ারি মাসে ভারতের মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত হয় ‘ওয়ার্ল্ড সোশ্যাল ফোরাম’ (WSF)। বিশ্বজুড়ে পুঁজিবাদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অধিকারকর্মী ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর এই মিলনমেলায় অংশ নেন বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও কেনিয়ার মতো বড় বড় চা উৎপাদনকারী দেশের ট্রেড ইউনিয়ন নেতারা। সেই সময় বিশ্ববাজারে চায়ের দাম পড়ে যাওয়ায় বড় করপোরেট কোম্পানিগুলো লোকসান ঠেকাতে চা বাগান বন্ধ করে দিচ্ছিল এবং শ্রমিকদের ছাঁটাইসহ মজুরি কমিয়ে দিচ্ছিল। এই সংকটের মুখে মুম্বাইয়ের ওই ফোরামে চা শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে একটি বিশেষ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।

সেখানে আলোচনা উঠে আসে যে, বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ যে চা পান করে তৃপ্তি পাচ্ছেন, তার নেপথ্যের লাখ লাখ চা শ্রমিক চরম দারিদ্র্য, অপুষ্টি এবং মৌলিক অধিকারহীনতায় ভুগছেন। এই করুণ বাস্তবতার দিকে বিশ্ববাসীর মনোযোগ আকর্ষণ করতে এবং করপোরেট শোষণের বিরুদ্ধে একজোট হতে ভারতের ‘নিখিল ভারতীয় চা শ্রমিক ফেডারেশন’ এবং শ্রীলঙ্কার শ্রমিক নেতারা প্রথম প্রস্তাব করেন—বিশ্বের একটি নির্দিষ্ট দিন ‘আন্তর্জাতিক চা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হোক, যা হবে মূলত চা শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের দিন।

tea day

কেন ১৫ ডিসেম্বর? 
মুম্বাই ফোরামের সেই ঐতিহাসিক দাবির পর, ২০০৫ সালে দিল্লির এক আন্তঃদেশীয় সম্মেলনে চা উৎপাদনকারী দেশগুলো একত্রিত হয়ে ১৫ ডিসেম্বর দিনটিকে প্রথম বেসরকারিভাবে চা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এই নির্দিষ্ট দিনটি বেছে নেওয়ার পেছনে ছিল একটি ঐতিহাসিক প্রতিবাদী ঘটনা। ১৭৭৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর আমেরিকার বোস্টন বন্দরে ব্রিটিশদের অন্যায় ও অতিরিক্ত চা করের প্রতিবাদে ‘সানস অব লিবার্টি’ আন্দোলনের কর্মীরা প্রায় ৩৪০টি চায়ের বাক্স সাগরে ফেলে দিয়েছিলেন, যা ইতিহাসে ‘বোস্টন টি পার্টি’ নামে পরিচিত। এই চা বিদ্রোহের ঘটনাটিকে এবং এর সাথে জড়িয়ে থাকা আন্তর্জাতিক চা বাণিজ্য ও শ্রমিকদের অধিকারের লড়াইকে প্রতীকী রূপ দিতেই ডিসেম্বরের ১৫ তারিখটিকে বেছে নেওয়া হয়েছিল।

জাতিসংঘের স্বীকৃতি ও ২১ মে তারিখের পেছনের কারণ বেসরকারিভাবে দীর্ঘ দেড় দশক ধরে ১৫ ডিসেম্বর দিবসটি পালিত হওয়ার পর, এটিকে জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি ওঠে। কারণ, বেসরকারি উদ্যোগে উন্নত দেশগুলোর বা ক্রেতা দেশগুলোর মনোযোগ পুরোপুরি আকর্ষণ করা যাচ্ছিল না। ফলশ্রুতিতে ২০১৫ সালে ভারত সরকার জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে এই দিবসটিকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব পাঠায়। জাতিসংঘ বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বাণিজ্যের মৌসুম বিবেচনা করে দিনটি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়।

সাধারণত অধিকাংশ এশীয় ও আফ্রিকান চা উৎপাদনকারী দেশে মে মাস থেকেই চায়ের নতুন মৌসুম বা মূল উৎপাদন শুরু হয়, যখন পাতা সবচেয়ে সতেজ থাকে। নতুন মৌসুমের শুরুতেই যেন বিশ্ববাজার চা শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও অধিকার নিয়ে সচেতন হতে পারে, সেজন্যই জাতিসংঘ ২০১৯ সালে চূড়ান্ত অনুমোদনের পর ২০২০ সাল থেকে প্রতি বছর ‘২১ মে’ তারিখটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘আন্তর্জাতিক চা দিবস’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।

tea day

দিবসটির পেছনের মূল উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য
পানির পর বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি পান করা হয় যে পানীয়টি, তা হলো চা। এটি শুধু একটি সস্তা পানীয়ই নয়, উন্নয়নশীল দেশগুলোর দারিদ্র্য বিমোচন ও গ্রামীণ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। চা দিবস পালনের মূল লক্ষ্য শুধু চা পানের আনন্দ উদযাপন করা নয় বরং এর পেছনে রয়েছে গভীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক উদ্দেশ্য। বিশ্বজুড়ে চা চাষের সাথে লাখ লাখ প্রান্তিক চাষি ও শ্রমিক জড়িত, যাদের একটি বড় অংশই নারী।

আজকের এই বিশেষ দিনে পরিবেশবিদ ও কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যেভাবে তাপমাত্রা বাড়ছে, তাতে চায়ের উৎপাদন মারাত্মক হুমকির মুখে। তাই নিজেদের প্রতিদিনের প্রশান্তি আর কোটি শ্রমিকের জীবন বাঁচানোর তাগিদেই চা বাগানগুলোর সুরক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

ভিজুয়াল স্টোরি