শনিবার । মে ১৬, ২০২৬
সেতু ইসরাত লাইফস্টাইল ১৬ মে ২০২৬, ৪:৩২ অপরাহ্ন
শেয়ার

ক্ষুধার্ত মন কেন হুটহাট রেগে যায়?


lifestyle

ক্ষুধার্ত মন কেন হুটহাট রেগে যায়?

ধরুন, অফিসের টেবিলে কাজের পাহাড়, ঘড়ির কাঁটা দুপুর পেরিয়ে বিকেলের ঘরে। ঠিক এমন সময় খুব ছোট একটা কারণে সহকর্মীর ওপর ভীষণ চটে গেলেন আপনি। কিংবা বাসায় ফিরে চাবিটা খুঁজে না পেয়েই চিৎকার করে উঠলেন আপনজনের ওপর। পরে শান্ত হয়ে ভাবলেন, সামান্য এই বিষয়ে এত রাগ করার তো কিছু ছিল না!

দিনের কোনো এক ভাগে এই অনাকাঙ্ক্ষিত রাগের মুখোমুখি কমবেশি আমরা সবাই হয়েছি। আমরা একে নিছক মেজাজ গরম বললেও, চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে অন্য কথা। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য লিখেছিলেন, ‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়’। বিজ্ঞান বলছে, ক্ষুধার রাজ্যে মানুষের মন শুধু গদ্যময়ই নয়, বেশ খিটখিটে এবং অগ্নিশর্মাও বটে! এর নেপথ্যে রয়েছে শরীরের এক জটিল হরমোনের খেলা।

মস্তিষ্কের জ্বালানি যখন ফুরিয়ে আসে
আমাদের শরীর সচল রাখতে যেমন শক্তির প্রয়োজন, তেমনি আমাদের অনুভূতির নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র ‘মস্তিষ্ক’ পুরোপুরি নির্ভরশীল গ্লুকোজ বা চিনির ওপর। দীর্ঘ সময় পেটে দানাপানি না পড়লে রক্তে এই গ্লুকোজের মাত্রা তরতরিয়ে নামতে শুরু করে। আর তখনই ঘটে বিপত্তি। জ্বালানি ফুরিয়ে এলে মস্তিষ্ক আর সঠিকভাবে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। ফলে মনোযোগ ভেঙ্গে যায়, শরীর ক্লান্ত হয় আর সামান্য কথাতেই মন বিষিয়ে ওঠে।

হরমোন যখন যুদ্ধ ঘোষণা
পেট যখন শূন্য থাকে, তখন শরীরে ‘ঘ্রেলিন’ নামের এক হরমোন জানান দেয় যে এবার খাবার চায়। কিন্তু আপনি যখন সেই ডাক উপেক্ষা করে কাজে বুঁদ হয়ে থাকেন, তখন মস্তিষ্ক একে জীবন-মরণের সংকট ভেবে বসে। শরীরকে সচল রাখতে সে তখন ক্ষরণ করতে শুরু করে ‘কর্টিসল’ বা স্ট্রেস হরমোন।

angry man

জ্বালানি ফুরিয়ে এলে মস্তিষ্ক আর সঠিকভাবে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না

এই কর্টিসল একদিকে যেমন লিভার থেকে চিনি ধার করে শরীরে শক্তি জোগায়, অন্যদিকে তেমনি আমাদের মনের ‘ভালো লাগার’ রাসায়নিক উপাদান—সেরোটোনিন ও ডোপামিনের দফারফা করে ছাড়ে। ফলে শান্তশিষ্ট মানুষটিও মুহূর্তের মধ্যে এক অস্থির, খিটখিটে আর রাগী মানুষে পরিণত হন।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, ক্ষুধার্ত অবস্থায় রেগে যাওয়া কেবল মানুষের স্বভাব নয়, এটি আদিম এক বিবর্তনগত বৈশিষ্ট্য। আদিমকালে বন্য পশুপাখি বা মানুষকে খাবারের খোঁজ করতে হতো তীব্র প্রতিযোগিতা করে। তখন ক্ষুধার্ত অবস্থায় যে যত বেশি আক্রমণাত্মক হতে পারত, তার খাবার পাওয়ার এবং টিকে থাকার সম্ভাবনা তত বাড়ত। ইতিহাসের সেই আদিম রেশ আজও আমাদের রক্তে বয়ে চলেছে।

করনীয় কী?
তাহলে উপায়? চিকিৎসকদের পরামর্শ খুব সহজ-  শরীর ও মনের এই যুদ্ধ এড়াতে দীর্ঘ সময় খালি পেটে থাকা চলবে না। কাজের ফাঁকে ফাঁকে অল্প করে পুষ্টিকর হালকা খাবার খাওয়ার অভ্যাস রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ঠিক রাখে, ফলে মেজাজও থাকে ফুরফুরে।

তাই এরপর থেকে যখনই হুট করে কারও ওপর রাগ চড়চড় করে বাড়বে, মনে মনে একটুখানি ভাবুন—রাগটা কি সত্যিই ওই মানুষটার ওপর, নাকি পেটের ভেতরের অবাধ্য হরমোনগুলোর ওপর? উত্তরটা পেয়ে গেলেই হয়তো রাগের বদলে এক গ্লাস পানি আর একটুখানি খাবার মুখে তুলে  নেবেন। কারণ সুস্থ পেটের মাঝেই যে লুকিয়ে থাকে শান্ত মনের চাবিকাঠি!

ভিজুয়াল স্টোরি