শনিবার । এপ্রিল ১১, ২০২৬
সেতু ইসরাত লাইফস্টাইল ১১ এপ্রিল ২০২৬, ১:১২ অপরাহ্ন
শেয়ার

ভোকাল নোডিউল এড়াতে কণ্ঠের যত্ন


voice

ভোকাল নোডিউল এড়াতে কণ্ঠের যত্ন

সংবাদ পাঠ, গান, আবৃত্তি, ডাবিং কিংবা স্ক্রিপ্টে ভয়েস ওভার -পেশা যাই হোক, একজন কণ্ঠশিল্পীর প্রধান হাতিয়ার তার স্বরনালি। শুধু স্টুডিওর গায়ক বা নিউজ প্রেজেন্টারই নন, ট্রেনের ফেরিওয়ালার চিৎকার, ফুটপাথের দোকানিদের হাঁকাহাঁকি কিংবা ক্লাসরুমে শিক্ষকদের গলা চড়িয়ে পড়ানো-সবখানেই কণ্ঠস্বরের নিরন্তর ব্যবহার। তবে এই অমূল্য সম্পদটির সঠিক যত্ন না নিলে দেখা দিতে পারে ‘ভোকাল নোডিউল’-এর মতো জটিল সমস্যা।

ভোকাল নোডিউল কী
অতিরিক্ত বা ভুলভাবে কণ্ঠস্বর ব্যবহারের ফলে স্বরযন্ত্রের ভোকাল কর্ডে যে ছোট টিউমার বা শক্ত দানার মতো মাংসপিণ্ড তৈরি হয়, তাকেই ভোকাল নোডিউল বলে। এটি সাধারণত ঘর্ষণের ফলে হয় এবং এর কারণে গলার স্বর বসে যাওয়া বা কর্কশ হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়।

কেন হয় এই সমস্যা
চিকিৎসকদের মতে, যাঁরা পেশার প্রয়োজনে নাগাড়ে কথা বলেন বা উচ্চস্বরে চিৎকার করেন, তাঁদের গলাই সবচেয়ে বেশি খারাপ হয়। উচ্চকণ্ঠে বেশি কথা বললে স্বরনালি বা ভোকাল কর্ডকে অতিরিক্ত কাজ করতে হয়। এর ফলে স্বরনালির মাঝখানে জল জমে ফুলে ওঠে, যাকে বলা হয় ‘ভোকাল নোডিউল’। এতে দুই পাশের ভোকাল কর্ডই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে শিক্ষক, গায়ক-গায়িকা, হকার, বাস কন্ডাক্টর এবং নিউজ প্রেজেন্টারদের মধ্যে এই সমস্যাটি প্রকটভাবে দেখা দেয়।

voice

কুসুম গরম পানিতে মধু মিশিয়ে বা আদা চা পান করলে গলার পেশি শিথিল থাকে

কণ্ঠস্বর ভালো রাখার উপায়

  • পর্যাপ্ত পানি পান: কণ্ঠনালীর স্বরযন্ত্র বা ভোকাল কর্ড সচল রাখতে আর্দ্রতা খুব জরুরি। সারা দিনে অন্তত ৮-১০ গ্লাস পানি পান করা উচিত। তবে এটি সরাসরি বরফ ঠান্ডা হওয়া চলবে না।
  • ভোকাল রেস্ট: একটানা দীর্ঘ সময় কথা বলবেন না বা গান গাইবেন না। প্রতি ৪৫-৬০ মিনিট কাজের পর অন্তত ১০-১৫ মিনিট কথা বলা থেকে বিরত থাকুন।
  • পর্যাপ্ত ঘুম: ঘুমের অভাবে কণ্ঠস্বরে ক্লান্তি চলে আসে। রাত জাগার অভ্যাস কণ্ঠের গভীরতা এবং স্পষ্টতা কমিয়ে দেয়। প্রতিদিন অন্তত ৭-৮ ঘণ্টা গভীর ঘুম নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
  • হিউমিডিফায়ার ব্যবহার: ঘরে যদি এসি চলে, তবে বাতাস শুষ্ক হয়ে যায় যা গলার জন্য ক্ষতিকর। এক্ষেত্রে হিউমিডিফায়ার ব্যবহার করে বাতাসের আর্দ্রতা ঠিক রাখা কণ্ঠের জন্য ভালো।

খাদ্যাভ্যাসে সতর্কতা
১. প্রতিদিন কুসুম কুসুম গরম পানিতে মধু মিশিয়ে বা আদা চা পান করলে গলার পেশি শিথিল থাকে এবং সংক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

২. নিয়মিত কুসুম গরম পানিতে লবণ দিয়ে গার্গল করলে গলার প্রদাহ কমে।

পেশাদারদের জন্য বিশেষ টিপস

লো পিচে অনুশীলন: যাঁরা উচ্চকণ্ঠে গান করেন, তাঁদের গাওয়ার স্টাইল পরিবর্তন করে ‘লো পিচে’ গাওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।

প্রচুর পানি পান: ভোকাল কর্ডের আর্দ্রতা বজায় রাখতে সারা দিনে প্রচুর পানি পান করুন।

বিপজ্জনক অভ্যাস বর্জন: ধূমপান এবং অতিরিক্ত চা-কফি বর্জন করুন, কারণ এগুলো স্বরনালিকে শুষ্ক করে ফেলে।

চিৎকার এড়িয়ে চলা: যতটা সম্ভব চিৎকার বা গলা ফাটিয়ে কথা বলা থেকে বিরত থাকুন। প্রয়োজনে মাইক্রোফোন বা লাউডস্পিকার ব্যবহার করার অভ্যাস করুন।

যদি দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে গলা ভাঙা থাকে বা কথা বলতে কষ্ট হয়, তবে দেরি না করে একজন নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞের (ENT Specialist) পরামর্শ নেওয়া জরুরি। মনে রাখবেন, গলার যত্ন কেবল অসুস্থ হলে নয়, বরং প্রতিদিনের রুটিন হিসেবে নেওয়া উচিত।

voice

যাঁরা উচ্চকণ্ঠে গান করেন, তাঁদের গাওয়ার স্টাইল পরিবর্তন করে ‘লো পিচে’ গাওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা

আধুনিক চিকিৎসা ও প্রতিকার
চিকিৎসকদের মতে, গলার সমস্যায় দ্রুত শনাক্তকরণ জরুরি। এক্ষেত্রে এফওএল (FOL) টেস্টের মাধ্যমে সমস্যাটি কোন পর্যায়ে আছে তা নিশ্চিত হওয়া যায়।

  • প্রাথমিক পর্যায়: প্রাথমিক স্টেজে ধরা পড়লে স্টেরয়েড জাতীয় কিছু ওষুধের মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

  • অস্ত্রোপচার: ওষুধে কাজ না হলে মাইক্রোল্যারিংজিয়াল সার্জারি করতে হয়। বর্তমানে লেজার রে (Laser) ব্যবহারের মাধ্যমেও আধুনিক ও সহজ পদ্ধতিতে এই অপারেশন করা সম্ভব।

  • জীবনযাত্রায় পরিবর্তন: অপারেশনের পর বা চিকিৎসার চলাকালীন রোগীদের নিচু স্বরে কথা বলার পরামর্শ দেওয়া হয়। এমনকি কিছুদিন কথা বলা একদম বন্ধ রাখা বা ‘ভোকাল রেস্ট’ নিতে বলা হয়।

আপনার কণ্ঠই আপনার পেশার ভিত্তি। তাই সামান্য অবহেলায় গলার স্বর বদলে গেলে বা সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প