
শিশুদের জন্যও মোবাইল ফোন হাতের কাছে পাওয়া কিংবা বহন করা খুব সহজ বিষয়
বর্তমান সময়ে ইন্টারনেট ছাড়া আমরা এক সেকেন্ডও চলতে পারিনা। পৃথিবী যতো প্রযুক্তিতে এগিয়ে যাচ্ছে, আমাদের ইন্টারনেট নির্ভরতা ততোই বেড়ে চলেছে। আর এই প্রযুক্তির ব্যবহারের জন্য মোবাইল ফোন হলো সহজলভ্য এক যন্ত্র। ল্যাপটপ আকারে বড় হওয়ায় সর্বত্র বহন করা যায় না। কিন্তু মোবাইল ফোন খুব সহজেই বহন করা যায়। শিশুদের জন্যও মোবাইল ফোন হাতের কাছে পাওয়া কিংবা বহন করা খুব সহজ বিষয়।
শিশুদের বুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই তারা মা-বাবা থেকে শুরু করে চারপাশের সবাইকে অতিমাত্রায় মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে দেখে। যেহেতু শিশু এবং কিশোর-কিশোরীরা তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বাড়ির মানুষজনকে দেখে শেখে বেশি তাই তাদের মধ্যেও এর প্রভাব পড়ে। তারাও একসময় মোবাইল ফোনে আসক্ত হয়ে ওঠে।
আজকাল শহরাঞ্চলের পাশাপাশি গ্রামেও অসংখ্য বাসায় রয়েছে ওয়াইফাই, ইন্টারনেট। অতিমাত্রায় সহজলভ্য এবং মা-বাবার সময়ের অভাবে অসংখ্য শিশু-কিশোর ডিভাইসে ভিডিও গেমস আর কার্টুনে অতিরিক্ত আসক্ত হয়ে পড়ছে। যার পরিণাম ভয়াবহ।
যে আচরণগুলো দেখলে বুঝবেন আপনার সন্তান ভিডিও গেমে অতিমাত্রায় আসক্ত
১. পরিবারের সদস্যদের থেকে দূরে সরে গিয়ে মোবাইল ফোন নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা ভিডিও গেমস খেলা।
২. গেমস খেলার জন্য খাওয়া, ঘুমানো গোসল হোমওয়ার্ক করতে ভূলে যাওয়া বা অনীহা।
৩. বাসার সদস্যদের কাছে লুকিয়ে আড়ালে গিয়ে বা স্কুল ফাঁকি দিয়ে ভিডিও গেমস খেলা কিংবা কার্টুন দেখা।
৪. ভিডিও গেমস খেলতে বাধা দিলে রেগে যাওয়া, অতিমাত্রায় প্রতিক্রিয়া দেখানো। অভিভাকের সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে মারামারিও করতে দেখা যায়। বাসার জিনিসপত্র ভাংচুর করে। অনেক শিশু কিশোরকে আবার ভষিণ কষ্ট পেতে দেখা যায়।
৫. রাতের বেলা অনেক শিশু এবং কিশোর অভিভাবকের মোবাইল ফোন চুরি করে গেমস খেলে, কার্টুন দেখে। চার্জ শেষ না হওয়া পর্যন্ত যা চলতেই থাকে।
৬. চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে গেমস খেলার জন্য স্কুলে অনুপস্থিত থাকা বা লেখাপড়ার প্রতি অতিমাত্রায় মনোযোগহীনতা।
৭. অনেক সময় ভিডিও গেমস খেলা বা কার্টুন দেখার জন্য মোবাইল ফোন বা ডিভাইস নিয়ে বাথরুমেও যেতে দেখা যায়।

বাসার পাশের খেলার মাঠে খেলার ব্যবস্থা করতে হবে
এই অবস্থা থেকে প্ররিত্রাণের উপায়
১. সন্তানকে প্রচুর পরিমাণে সময় দিতে হবে। কর্মজীবী মা-বাবারা ঘরে ফিরে সন্তানের সাথে গল্প, তার খেলনা নিয়ে খেলা, একসঙ্গে টিভি দেখা ও খাবার খেতে হবে।
২. সন্তানকে মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, ট্যাব চালানোও শেখাতে হবে। কারণ প্রযুক্তির প্রসারের মধ্যে শিশু-শোররা এসব যন্ত্রের ব্যবহার না জানলে তারা জীবন যুদ্ধে পিছিয়ে পড়বে। তবে ভিডিও গেমস, কার্টুন যেন মাত্রাহীন হয়ে না যায়।
৩. ছুটির দিনগুলোতে বা সন্তানের পরীক্ষা শেষে নিয়মিত তাকে বাসার বাইরে বেড়াতে নিয়ে যাবেন। তার পছন্দের খাবারের দোকানে নিয়ে খাওয়াবেন।
৪. বাসার পাশের খেলার মাঠে খেলার ব্যবস্থা করতে হবে। তবে সন্তানকে অপরিচিত কারো সাথে খেলতে দিলে, অবশ্যই অভিভাককে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
৫. সন্তান যেহেতু মা-বাবাকে দেখে শেখে তাই অভিভাবককে সন্তানের সামনে অতিমাত্রায় মোবাইল ফোন ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
৬. শিশু-কিশোর বয়স থেকেই তাদের সৃজনশীল গল্প-উপন্যাসের বই পড়াতে হবে। এখন বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় সারা বছর বইমেলা হয়। মুদ্রিত বই পড়ার চর্চা বাড়াতে হবে।
৭. আজকাল মেধা বিকাশের জন্য বাজারে শিশু-কিশোরদের জন্য বিভিন্ন ধরনের খেলনা পাওয়া যায়। যেমন- ছবি আঁকার বই, বিল্ডিং ব্লক তৈরি, লুডু, দাবা, ক্লে, শো পিস তৈরির বিভিন্ন উপকরণ ভীষণ সহজলভ্য। এই ধরনের খেলনা ছেলে-মেয়েদেরকে ডিভাইস থেকে দূরে রাখবে।
৮. সন্তানকে সৃজনশীল কাজ যেমন- কবিতা আবৃত্তি, নাচ, গান, বিতর্ক, জুডো-কারাতে খেলা, তাইকান্দো খেলা, মুকাভিনয়, গিটার, ভায়োলিন, পিয়ানো, বেহালা এসব শেখানো উচিত। এতে একইসাথে তাদের মেধা ও প্রতিভার বিকাশ হবে। নতুন নতুন মানুষজনের সাথে মেশার সুযোগ হবে। ফলে ডিভাইসে সময় দিতে পারবেনা। আগ্রহ কমবে বা তৈরিই হবেনা।
৯) শিশু-কিশোর উপযোগী নাটক-সিনেমা দেখাতে হবে। তবে সেটা মোবাইল ফোনে নয় বড় সাইজের টেলিভিশনে কিংবা সিনেমা হলে।
১০. টেলিভিশন বা মোবাইল ফোন থেকে সন্তানকে সম্পূর্ণ দূরে সরিয়ে দিলে তারা প্রযুক্তিতে দূর্বল হয়ে যাবে। তাই শিশু-কিশোরদের মেধা বিকাশ হয় তেমন কার্টুন, গেমস, শিশুতোষ অনুষ্ঠান তাদেরকে দেখাতে হবে।
১১. বাসার নীচে সাইকেল চালানো, খেলাধুলা, সাঁতার শেখা, স্কেটিং করা, এই ধরনের কাজগুলো শিশুদেরকে অতিমাত্রায় ডিভাইস থেকে দূরে রাখবে।
ডা. ফারহানা মোবিন: চিকিৎসক, বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতাল।
বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প











































