মঙ্গলবার । মে ২৬, ২০২৬
ডেভিড হার্স্ট আন্তর্জাতিক ২৬ মে ২০২৬, ১২:০৪ অপরাহ্ন
শেয়ার

মধ্যপ্রাচ্যে মূলত জিতেছে ইরান


Iran david

একটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্ট—যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি যুদ্ধ হেরেছে, যা গত ২৫ বছরে তাদের ষষ্ঠ পরাজয়

প্রতিদিনই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের মধ্যে চলমান জটিল আলোচনায় নতুন মোড় আসছে। প্রতিবারই যখন কোনো একটি বিষয়ে সমঝোতা প্রায় চূড়ান্ত হয়ে আসে, ট্রাম্প তখন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে কথা বলেন—এবং এরপর সেই অবস্থান থেকে সরে যান।

ইরানি আলোচকদের মতে, তারা যে দুইটি বিষয়ে সমঝোতার খুব কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন, তা হচ্ছে—প্রস্তাবিত ৩০–৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি লেবাননেও কার্যকর হবে এবং ইরানের কিছু জব্দ করা সম্পদ মুক্ত করা হবে।

কিন্তু এই জটিল পথ যতই দীর্ঘ হোক, এবং এমনকি যদি এই চুক্তি ব্যর্থ হয় এবং ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে তৃতীয়বার আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নেন, তবুও একটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্ট—যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি যুদ্ধ হেরেছে, যা গত ২৫ বছরে তাদের ষষ্ঠ পরাজয়।

ইরানের হাতে রয়েছে একাধিক শক্তিশালী ‘কার্ড’—বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি, পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে তৈরি করা প্রতিরোধ ক্ষমতা। আরও কিছু কার্ড এখনো তারা ব্যবহার করেনি, যেমন বাব আল-মান্দাব প্রণালি বন্ধ করা। কারণ এই সক্ষমতাও ইরানের হাতে আছে। অন্যদিকে ট্রাম্পের হাতে এসবের কোনোটি নেই।

এই ধারাবাহিক ব্যর্থতা, যেখানে একুশ শতকের প্রথম ভাগে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী এবং একচেটিয়া, তা যুদ্ধ ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।

ইরানের বিরুদ্ধে হামলায় ট্রাম্প শুধু তার পূর্বসূরিদের আফগানিস্তান, ইরাক, ইয়েমেন, লিবিয়া ও সিরিয়ার ভুলই পুনরাবৃত্তি করেননি, বরং তার সঙ্গে আরও কিছু নিজস্ব ভুল যুক্ত করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ যেমন ভুয়া গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ইরাকে হামলা করেছিলেন যে সাদ্দাম হুসেইনের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে, ট্রাম্পও তেমনি ভুয়া গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ইরানে হামলা করেছেন।

তবে বুশের সন্দেহজনক তথ্য তার নিজের গোয়েন্দা সংস্থারই ছিল। ট্রাম্পের ভুয়া গোয়েন্দা তথ্য তৈরি করেছে মোসাদ, এবং যুক্তরাষ্ট্রের সর্বাধিনায়ক তা পুরোপুরি গ্রহণ করেছেন— এক্ষত্রে তিনি নিজেদের গোয়েন্দা সংস্থার পরামর্শ উপেক্ষা করেছেন।

নেতানিয়াহু এবং মোসাদের পরিচালক ডেভিড বার্নিয়া ট্রাম্পকে বিশ্বাস করিয়েছিলেন যে জানুয়ারির গণ-আন্দোলনের পর তেহরানের শাসনব্যবস্থা এতটাই দুর্বল যে সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করা হলে কয়েক দিনের মধ্যেই দেশটির শাসন ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে।

নেতানিয়াহু এই মতে পক্ষে ছিলেন। কারণ তার জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো এটি বাস্তবায়ন করা। এখন যুদ্ধ শেষের দিকে, এবং তিনিই সবচেয়ে বড় পরাজিতদের একজন; তাই তিনি ট্রাম্পকে ইরানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর থেকে বিরত রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন।

কিন্তু এই যুদ্ধ শেষ হলে দুইজনকেই চূড়ান্ত জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হবে।

ক্ষমতার ভারসাম্য
তবে তারা এই পরাজয় মেনে নিতে পারছেন না। ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আঞ্চলিক পরিকল্পনার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

তিনটি মার্কিন প্রশাসনের—ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ, জো বাইডেন, এবং এখন ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ—নীতি ছিল সুন্নি আরব দেশগুলোকে ইসরায়েলের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক স্থাপন করানো।

এই নতুন ব্যবস্থাকে বিভিন্ন নামে ডাকা হয়েছে: সুন্নি-ইসরায়েল জোট, আরব ন্যাটো, আব্রাহাম চুক্তি—কিন্তু এর কাঠামো পরিষ্কার। এটি কোনো সমান অংশীদারিত্ব নয়। ইসরায়েলকে আঞ্চলিক প্রধান শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হবে, যার মাধ্যমে অস্ত্র, উচ্চ প্রযুক্তি, তথ্য ও বাণিজ্য পূর্ব থেকে পশ্চিমে প্রবাহিত হবে।

এই জোটের একমাত্র প্রকৃত অংশীদার ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ। তিনিই ‘লিটল স্পার্টা’ নামে পরিচিত দুই শক্তি ইসরায়েল এবং ইউএই-কে একত্র করে পারস্য উপসাগর, ওমান উপসাগর এবং লোহিত সাগরজুড়ে বিমানঘাঁটি ও বন্দরের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার সম্ভাবনা দেখেছিলেন।

ইরানের সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ হলে হয়তো রেজা পাহলভির মতো দুর্বল শাসক বসানো হতো, অথবা দেশ গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ত বা ভেঙে যেত। ইরাক ও সিরিয়াকে এই কৌশলেই দুর্বল ও বিভক্ত করার নীতি ইতোমধ্যে সফল হয়েছে।

জেরুজালেমের পুরো রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মহলের একটি অংশ বিশ্বাস করে যে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে বাইবেল-উল্লেখিত ভূমি পুনর্গঠন করা একটি ঐতিহাসিক লক্ষ্য; তবে বাস্তব রাজনীতি অনুযায়ীেইসরায়েল এমন প্রতিবেশী চায়, যাদের তারা হয় দখল করবে, নয়তো চিরকাল দুর্বল রাখবে।

একটি ভাঙা ইরান হতো ট্রাম্পের নতুন মধ্যপ্রাচ্য ব্যবস্থায় তাকে ‘রাজা’ হিসেবে অভিষেক ঘটাতো। তিনি হতেন সেই ব্যক্তি যিনি ৪৭ বছর ধরে ওয়াশিংটনের ইচ্ছাকে চ্যালেঞ্জ করা ‘দানব’কে শেষ পর্যন্ত পরাজিত করতে পেরেছেন।

কিন্তু এই স্বপ্ন এখন কেবল ট্রাম্পের কল্পনাতেই সীমাবদ্ধ। ইরান শক্তি নিয়ে টিকে থাকায় মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যই মৌলিকভাবে বদলে গেছে।

কেন্দ্রের দিকে যাত্রা
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনার নেতৃত্বে রয়েছে- পাকিস্তান ও কাতার। ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত শুরুর পর থেকে পাকিস্তান সবসময়ই অঞ্চলের প্রান্তে ছিল। তারা কেবল সহানুভূতি দেখিয়েছে—ইন্দোনেশিয়া বা মালয়েশিয়ার মতো—কিন্তু এর বেশি কিছু নয়।

বড় পরিবর্তন আসে ইরান যুদ্ধের সময়, যখন সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত বুঝতে পারে যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ছাতা, যার জন্য তারা প্রচুর অর্থ দিয়েছে, তা তাদের রক্ষা করতে পারছে না। ফলে তারা বড় সেনাবাহিনী ও শক্তিশালী বিমানশক্তির দেশগুলো যেমন তুরস্ক ও পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

হঠাৎ করেই পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ আসিম মুনির—ইউনিফর্মে থাকুক বা না থাকুক—একজন গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক খেলোয়াড় হয়ে ওঠেন।

পাকিস্তান, যাকে একসময় ‘স্টোন এজে’ অর্থাৎ গুহা যুগে ফিরিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল, সেই দেশটি এখন আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে।

প্রতিরোধ শক্তি ও হরমুজ
ইরান এখন পারস্য উপসাগরের আরেকটি বড় শক্তি হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের কার্যত নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হয়েছে। তারা আবারও দেখিয়েছে যে তারা এই প্রণালী ‘খুলতে বা বন্ধ করতে’ পারে।

ইসরায়েল ও ট্রাম্প ইরানের বিমান ও নৌবাহিনী ক্ষতিগ্রস্ত করলেও তাদের ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, ছোট নৌযান ও মাইন যুদ্ধ সক্ষমতা ধ্বংস করতে পারেনি।

এছাড়া ইরানের পরীক্ষিত মিত্র হিজবুল্লাহকে অনেকেই দুর্বল ভেবেছিল, কিন্তু হিজবুল্লাহর নতুন প্রজন্মের যোদ্ধারা নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে আবারও লেবাননের প্রতিরক্ষায় সক্রিয় হয়েছে। এটি প্রমাণ করেছে ইরানের প্রভাব শুধু রাষ্ট্রে নয়, বিভিন্ন প্রতিরোধ আন্দোলনেও বিস্তৃত।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রকে অনেকেই ‘অস্থিতিশীল রাষ্ট্র’ হিসেবে দেখছে এবং চীনকে স্থিতিশীলতার কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করছে।

ডেভিড হার্স্ট: মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডেল ইস্ট আই-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক। তিনি যুক্তরাজ্যের সংবাদপত্র দ্য গার্ডিয়ানের বিদেশনীতি বিষয়ক প্রধান লেখক হিসেবে কাজ করেছেন।