বুধবার । এপ্রিল ১৫, ২০২৬
সেতু ইসরাত লাইফস্টাইল ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ১২:১৬ অপরাহ্ন
শেয়ার

সাদা মাটির পাহাড়ে নীল হ্রদের হাতছানি


Birishiri-Netrokona

সাদা মাটির পাহাড়ে নীল হ্রদের হাতছানি

আকাশের নীল যেখানে পাহাড়ের সবুজে মিশেছে, আর স্বচ্ছ জলের সোমেশ্বরী যেখানে নুড়ি পাথরের গান গায়-সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে নেত্রকোণার সুসং দুর্গাপুর। নেত্রকোণা জেলার বিরিশিরি মূলত বাংলাদেশের একমাত্র চীনামাটির পাহাড়ের জন্য খ্যাত। প্রায় ২৭৯.২৮ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এই বিশাল জনপদ কেবল প্রকৃতি নয়, বরং ইতিহাস আর ঐতিহ্যের এক সমৃদ্ধ লীলাভূমি।

বিজয়পুরের চিনামাটির পাহাড় ও নীল লেক
দুর্গাপুরের বিজয়পুর এলাকাটি বাংলাদেশের একমাত্র প্রাকৃতিক চিনামাটির পাহাড়ের জন্য বিখ্যাত। ১৯৫৭ সালে ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর এখানে প্রথম সাদা মাটির সন্ধান পায়। প্রায় ১৫.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ৬০০ মিটার প্রশস্ত এই খনিজ অঞ্চলে আনুমানিক ২৪ লাখ ৭০ হাজার মেট্রিক টন সাদা মাটির বিশাল মজুদ রয়েছে। ১৯৬৮ সাল থেকে এখানে বাণিজ্যিকভাবে মাটি উত্তোলন শুরু হয় এবং তা ২০১৬ সাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। দীর্ঘদিনের খননের ফলে পাহাড়ে তৈরি হয়েছে গভীর হ্রদ, যার টলটলে নীল পানি পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ। ২০২১ সালে এই সাদা মাটি বাংলাদেশের একটি ‘জিআই পণ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

birishiri-netrokona

বিরিশিরির মূল আকর্ষণ হলো বিজয়পুরের চিনামাটির পাহাড়

স্বচ্ছ পানির নদী সোমেশ্বরী
ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসা সোমেশ্বরী নদীর কাঁচের মতো পরিষ্কার পানি বিরিশিরির অন্যতম সৌন্দর্য। নদীর বালুচর আর নুড়ি পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে চলা পানির শব্দ এক শান্ত পরিবেশ তৈরি করে। মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে আসা ১১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ সোমেশ্বরী নদী এই জনপদের প্রাণ। নদীর বিরিশিরি সেতুতে দাঁড়ালে দূরে ধনুকের মতো বাঁকা হয়ে থাকা পাহাড়ের সারি চোখে পড়ে। নদীর ঠিক ওপারেই পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত ১৯১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী রানীখং মিশন ও ক্যাথলিক গির্জা। টিলা বেয়ে ওপরে উঠলে একদিকে আদিবাসী সংস্কৃতির প্রাচীন স্থাপত্য আর অন্যদিকে নিচে বয়ে চলা সোমেশ্বরীর সৌন্দর্য এক নিমিষেই ক্লান্তি দূর করে দেয়। বর্ষায় নদীটি খরস্রোতা হলেও শীত বা বসন্তে এর শান্ত রূপ এবং তলদেশের বালু স্পষ্ট দেখা যায়। পর্যটকরা নৌকা বা মোটরসাইকেলে করে নদীর ‘জিরো পয়েন্ট’ পর্যন্ত ঘুরে আসতে পারেন।

অন্যান্য দর্শনীয় স্থান
দুর্গাপুর ও বিরিশিরিতে আরও দেখার মতো রয়েছে:

  • কালচারাল একাডেমি: আদিবাসী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও জীবনধারা জানার অন্যতম কেন্দ্র। ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ৩.২১ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই প্রতিষ্ঠানটি গারো, হাজং ও কোচদের ঐতিহ্য সংরক্ষণে কাজ করছে।

  • কমলা রানীর দিঘি: রাজা জানকি নাথের আমলের সেই রহস্যময় দিঘি যার পাড়ে আজও আদিবাসী পরিবারগুলো বসবাস করে।

  • সুসং দুর্গাপুরের জমিদার বাড়ি: এক সময় সুসং রাজ্যের রাজধানী ছিল দুর্গাপুর। ৩ হাজার ৩শ’ ৫৯ বর্গমাইল এলাকা ও প্রায় সাড়ে ৯শ’ গ্রাম নিয়ে প্রতিষ্ঠিত ছিল সুসং রাজ্যের রাজধানী দুর্গাপুর। এটি নেত্রকোনা জেলার একটি উপজেলা। সোমেশ্বর পাঠক ও পরবর্তীতে তার বংশধররা প্রায় ৬৬৭ বছর শাসন করেন এ রাজ্য।

  • স্মৃতিসৌধ: ১৯৪৬ -৫০ সালে তখনকার জমিদার বাড়ির ভাগ্নে কমরেড মনি সিংহের নেতৃত্বে জমিদারদেরই বিরুদ্ধে শুরু হয় টংক আন্দোলন। দুর্গাপুরে টংক আন্দোলনের শহিদদের স্মরণে স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়।

  • গারো পাহাড়: ভারতের মেঘালয় রাজ্যের গারো-খাসিয়া পর্বতমালার একটি অংশ হলো গারো পাহাড়। এর কিছু অংশ ভারতের আসাম রাজ্য ও বাংলাদেশের ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনা জেলায় অবস্থিত। প্রায় ৮০০০ বর্গ কিলোমিটার গারো পাহাড়ের বিস্তৃতি।
Birishiri,_Netrokona

খনি থেকে মাটি তোলার ফলে এখানে তৈরি হয়েছে স্বচ্ছ নীল পানির গভীর লেক

একদিনে ভ্রমণের পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা
যাদের হাতে সময় কম, তারা খুব সহজেই একদিনে বিরিশিরি ঘুরে আসতে পারেন:

  • যাওয়া: ঢাকার মহাখালী থেকে সরাসরি বাসে ৫-৭ ঘণ্টায় সুখনগরী পর্যন্ত যাওয়া যায় অথবা রাতে আন্তঃনগর ট্রেন ‘হাওর এক্সপ্রেস’ বা দুপুরের ‘মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস’ যোগে নেত্রকোনা এসে সেখান থেকেও যাওয়া সম্ভব।

  • ঘোরাঘুরি: সুখনগরী থেকে নৌকায় ছোট নদী পার হতে হবে। রিকশা, টেম্পু ,বাস বা মোটর সাইকেলে দূর্গাপুর যাওয়া যায়। রিকশায় গেলে ৮০-১০০ টাকা। বাস বা টেম্পুতে জনপ্রতি ভাড়া ২০ টাকা। এছাড়াও মোটর সাইকেলে ২ জন ১০০ টাকা লাগবে। তারপর বিরিশিরি বাজার থেকে ব্যাটারি রিকশা ভাড়া করে চিনামাটির পাহাড়সহ আরও কয়েকটি দর্শনীয় স্থান ঘুরে আসতে পারেন।বিরিশিরি বাজার থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশা বা মোটরসাইকেল ৫০০-৬০০ টাকায় ভাড়া করে ৫-৬ ঘণ্টার মধ্যে চিনামাটির পাহাড়, রানীখং চার্চ, সোমেশ্বরী নদী ও কালচারাল একাডেমি ঘুরে দেখা যায়। মোটরসাইকেলে দুজন একসাথে ঘোরা সুবিধাজনক।

Birishiri,_Netrokona

পাহাড়, নদী আর স্বচ্ছ নীল জলের এই জনপদ ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এক অনন্য লীলাভূমি

থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা
দুর্গাপুরে থাকার জন্য ওয়াইএমসিএ (YMCA) রেস্ট হাউস ও কালচারাল একাডেমির গেস্ট হাউস সবচেয়ে ভালো অপশন। এছাড়া সাধারণ মানের স্বর্ণা গেস্ট হাউস, হোটেল সুসং বা হোটেল গুলশানে ১৫০ থেকে ৪০০ টাকার মধ্যে থাকা যায়। খাবারের জন্য প্রতিটি গেস্ট হাউসেই ব্যবস্থা থাকে, এছাড়া স্থানীয় মাঝারি মানের রেস্টুরেন্টগুলোতে মাছ, মাংস ও ভাতের সুব্যবস্থা আছে।

নেত্রকোনা যেতে হলে খুব একটা পূর্ব পরিকল্পনার দরকার নেই। তবে ট্রেনে যেতে চাইলে ৩-৪ দিন আগে টিকিট কেটে নিতে হবে। যদি বাজেট ট্যুরের প্ল্যান করেন তাহলে কমপক্ষে ৫ জন হলে ভালো হয়, যেহেতু বেশিরভাগ জায়গা ঘুরে দেখতে হয় অটোরিকশা দিয়ে, এতে অন্তত ৫ জন হলে খরচ কিছুটা কম পড়বে।

বাংলা টেলিগ্রাফ ভিজুয়াল