বুধবার । মার্চ ১১, ২০২৬
সেতু ইসরাত লাইফস্টাইল ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৪:৩০ অপরাহ্ন
শেয়ার

২৬তম সুন্দরবন দিবস আজ


sundarban-dayজলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে উপকূল রক্ষায় সুন্দরবনের অবিকল্প ভূমিকা সামনে রেখে আজ বাংলাদেশে পালিত হচ্ছে ২৬তম সুন্দরবন দিবস। এবারের দিবসের কর্মসূচিতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে প্লাস্টিক ও পলিথিন দূষণমুক্ত সুন্দরবন নিশ্চিত করা। পর্যটন এবং নদীপথে যাতায়াতকারী নৌযান থেকে ফেলা প্লাস্টিক বনের শ্বাসমূল ও মাটির উর্বরতা নষ্ট করছে, যা জীববৈচিত্র্যের জন্য চরম হুমকি। তাই ‘প্লাস্টিকমুক্ত সুন্দরবন ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা’ – এই আহ্বানেই পালিত হচ্ছে এবারের ২৬তম সুন্দরবন দিবস।

প্রতি বছর ভালোবাসা দিবস ও বসন্ত বরণের ডামাডোলে সুন্দরবন দিবসটি কিছুটা নিভৃতে পালিত হলেও, বাংলাদেশের পরিবেশগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই দিনটির গুরুত্ব অপরিসীম। মূলত সুন্দরবনের টেকসই ব্যবস্থাপনা এবং এই বনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবনমান উন্নয়নের বার্তা নিয়ে আজ দেশজুড়ে বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হচ্ছে।

sundarban সুন্দরবন দিবসের প্রেক্ষাপট
২০০১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি খুলনায় প্রথম জাতীয় সুন্দরবন সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের আওতায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনার স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রূপান্তর ও পরশের উদ্যোগে এবং দেশের আরও ৭০টি পরিবেশবাদী সংগঠনের নীতিনির্ধারকগণ সুন্দরবনের অস্তিত্ব রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। সেই সম্মেলনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০০২ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ১৪ ফেব্রুয়ারিকে সুন্দরবন দিবস হিসেবে পালন করা শুরু হয়। আজ ২৬তম বর্ষে এসে এই দিবসটি কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয় বরং সুন্দরবনকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচানোর এক জোরালো দাবিতে পরিণত হয়েছে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে সুন্দরবনের অবস্থা নিয়ে তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিশ্বের এই বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনটি এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। প্রায় ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই বন বাংলাদেশের ফুসফুস হিসেবে পরিচিত। মোট ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের সুন্দরবনের প্রায় ৬০ শতাংশ বাংলাদেশের সীমানায় এবং বাকি অংশ ভারতে অবস্থিত।

সুন্দরবনের বর্তমান জীববৈচিত্র্যের সঠিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি বিশ্বের অনন্য একটি ইকোসিস্টেম। সরকারি বন বিভাগ ও ইউনেস্কোর তথ্যমতে, সুন্দরবনে উদ্ভিদের প্রজাতি সংখ্যা প্রায় ৩৩৪টি। প্রাণীকুলের মধ্যে এখানে প্রায় ৪২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ২৭০ থেকে ৩১৫ প্রজাতির পাখি, ৩৫ থেকে ৫০ প্রজাতির সরীসৃপ এবং মাত্র ৮ থেকে ১০ প্রজাতির উভচর প্রাণী বাস করে। এছাড়া সুন্দরবনের জলাশয়ে ১২০ প্রজাতির মাছ এবং ২০ থেকে ৩০ প্রজাতির চিংড়ির দেখা মেলে। সাম্প্রতিক বাঘ শুমারি অনুযায়ী, সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বর্তমানে ১২৫-এর কাছাকাছি, যা এই বনের সুস্থ পরিবেশের একটি বড় লক্ষণ। তবে বাঘের নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করা এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে হরিণ ও অন্যান্য বন্যপ্রাণী শিকার এবং বিষ দিয়ে মাছ ধরার মতো অপতৎপরতা এখনো বনের জীববৈচিত্র্যকে হুমকির মুখে রাখছে। এছাড়া বনের ভেতরে পশুর নদসহ অন্যান্য চ্যানেলে অতিরিক্ত জাহাজ চলাচল এবং শিল্পায়নের প্রভাবে বনের ইকো-সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

সুন্দরবনের বর্তমান সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হলো জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় লবণাক্ত পানি বনের গহীনে প্রবেশ করছে, যার ফলে সুন্দরী গাছের ‘আগা মরা’ রোগ দেখা দিচ্ছে। এতে বনের ঘনত্ব কমে যাচ্ছে এবং বন তার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে। অথচ এই সুন্দরবনই সিডর, আইলার মতো প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের গতিবেগ প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমিয়ে দিয়ে লাখ লাখ মানুষের জীবন রক্ষা করেছে। সুন্দরবন না থাকলে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতো। 

sundarban ২৬তম সুন্দরবন দিবসে বিশেষজ্ঞ মহলের দাবি, সুন্দরবনকে রক্ষায় কেবল আইন করলে হবে না, বরং বনের ওপর নির্ভরশীল বাওয়ালি, মৌয়াল ও জেলেদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। সুন্দরবনের চারপাশে কোনোভাবেই ক্ষতিকর শিল্পায়ন হতে দেওয়া যাবে না। আজকের এই দিনে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত, সুন্দরবন আমাদের রক্ষা করছে, এখন আমাদের পালা সুন্দরবনকে রক্ষা করার। এই প্রাকৃতিক রক্ষাকবচকে হারিয়ে ফেললে আমাদের মানচিত্রের এক বিশাল অংশ স্থায়ীভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হবে।

খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরাসহ উপকূলীয় অঞ্চলে বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বন বিভাগের উদ্যোগে র‍্যালি, মানববন্ধন ও আলোচনা সভার মাধ্যমে দিবসটি উদযাপন করা হচ্ছে।

বাংলা টেলিগ্রাফ ভিজুয়াল