
বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল নিয়ে বসেছে ফুটবলের মহারণ। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে এবারের বিশ্বকাপের প্রথম পর্বে আছে ১২টি গ্রুপ। প্রতিটি গ্রুপ থেকে শীর্ষ দুই দল সরাসরি উঠবে শেষ ২৪-এ, আর তাদের সঙ্গে যোগ দেবে সেরা আটটি তৃতীয়-স্থানধারী দল।
ড্র শেষ হওয়ার পর থেকেই শুরু হয়েছে হিসাব-নিকাশ। কোথায় ‘গ্রুপ অব ডেথ’? কোন গ্রুপ তুলনামূলক সহজ? আর কোন দলগুলোকে ধরা হচ্ছে পরবর্তী পর্বে ওঠার সবচেয়ে বড় দাবিদার?
চলুন, কঠিন থেকে সহজ—এই ক্রমে দেখে নেওয়া যাক বিশ্বকাপ ২০২৬-এর ১২টি গ্রুপ।
১. গ্রুপ ‘আই’: এক মৃত্যু উপত্যকা
বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সবচেয়ে কঠিন গ্রুপ হিসেবে ইতোমধ্যে পরিচিতি পেয়েছে গ্রুপ ‘আই’। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের গড় হিসাব অনুযায়ী এটিই সবচেয়ে শক্তিশালী গ্রুপ।
ফ্রান্স টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামবে। অন্যদিকে সেনেগাল আফ্রিকার অন্যতম শক্তিধর দল।
নরওয়ের সবচেয়ে বড় অস্ত্র আর্লিং হালান্ড। ইউরোপিয়ান দলটি ‘ডার্ক হর্স’ হিসেবে টুর্নামেন্টে চমক দেখাতে পারে। আর বাছাইপর্বে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলে বিশ্বকাপে আসা ইরাকও সহজ প্রতিপক্ষ নয়।
সম্ভাব্য সরাসরি উত্তীর্ণ: ফ্রান্স ও সেনেগাল
২. গ্রুপ ‘এফ’: নেদারল্যান্ডসের পথ রুদ্ধ করতে প্রস্তুত জাপান ও সুইডেন
বিশ্বর্যাঙ্কিংয়ের গড় অবস্থান ২৬- এ থেকেই বোঝা যায় গ্রুপটির প্রতিযোগিতা কতটা তীব্র হতে পারে।
সপ্তম স্থানে থাকা নেদারল্যান্ডস কাগজে-কলমে এগিয়ে থাকলেও জাপানকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। বিশ্বকাপে সবার আগে জায়গা নিশ্চিত করা জাপান সম্প্রতি ওয়েম্বলিতে ইংল্যান্ডকেও হারিয়েছে।
সুইডেনের আক্রমণে আছেন আলেক্সান্ডার ইসাক ও ভিক্টর গিয়োকেরেসের মতো তারকা। আর তিউনিসিয়া পুরো বাছাইপর্বে কোনো গোল না খেয়ে বিশ্বকাপে এসেছে।
সম্ভাব্য সরাসরি উত্তীর্ণ: নেদারল্যান্ডস ও জাপান
৩. গ্রুপ ‘এল’: ইংল্যান্ড-ক্রোয়েশিয়া দ্বৈরথে জমে উঠবে লড়াই
গত দুই বিশ্বকাপে একবার ফাইনাল ও একবার সেমিফাইনাল খেলেছে ক্রোয়েশিয়া। সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে আবারও বড় কিছু করার স্বপ্ন দেখছে লুকা মদরিচের উত্তরসূরিরা।
তাদের প্রথম ম্যাচই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। জার্মান কোচ টমাস টুখেলের অধীনে এটি হবে ইংল্যান্ডের প্রথম বিশ্বকাপ অভিযান।
কার্লোস কুইরোজের ঘানা এবং মধ্য আমেরিকার সর্বোচ্চ র্যাঙ্কধারী দল পানামাও সহজে পথ ছেড়ে দেবে না।
সম্ভাব্য সরাসরি উত্তীর্ণ: ইংল্যান্ড ও ক্রোয়েশিয়া
৪. গ্রুপ ‘সি’: ব্রাজিলের সামনে মরক্কোর বড় চ্যালেঞ্জ
একসময়কার অপ্রতিরোধ্য ব্রাজিল এখন আর সেই অবস্থানে নেই। তবে কার্লো আনচেলোত্তির অধীনে সেলেসাওরা এখনও গ্রুপের সবচেয়ে শক্তিশালী দল। তাদের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে মরক্কো। এবং হয়েছেও তাই। ইতোমধ্যেই ব্রাজিল প্রথম ম্যাচে মরক্কোর সাথে ড্র করে পয়েন্ট ভাগাভাগি করে নিয়েছে। ২০২২ বিশ্বকাপে আফ্রিকার ইতিহাস গড়ে সেমিফাইনালে ওঠা দলটি এখন আরও পরিণত।
স্কটল্যান্ড ও হাইতি হয়তো তৃতীয় স্থানের জন্য লড়বে, কিন্তু সুযোগ পেলে তারা বড় কোনো অঘটনও ঘটাতে পারে। আর স্কটল্যান্ড তো আবার হাইতির সাথে ১-০ গোলে জিতে এগিয়েও আছে খানিকটা। এখন কেউ যদি অঘটন ঘটন পটিয়সী হতে পারে, সেটা বোধ হয় স্কটল্যান্ডই। তবুও,
সম্ভাব্য সরাসরি উত্তীর্ণ: ব্রাজিল ও মরক্কো
৫. গ্রুপ ‘কে’: রোনালদোর পর্তুগালের সামনে কলম্বিয়ার পরীক্ষা
পর্তুগাল ও কলম্বিয়াকে এগিয়ে রাখা হলেও গ্রুপটি মোটেও একপেশে নয়।
উজবেকিস্তান প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছে। ফাবিও কানাভারোর কোচিংয়ে দলটির অন্যতম ভরসা ম্যানচেস্টার সিটির ডিফেন্ডার আবদুকোদির খুসানোভ।
অন্যদিকে ২০২৪ কোপা আমেরিকার ফাইনালে ওঠা কলম্বিয়া পর্তুগালকে গ্রুপসেরা হওয়ার লড়াইয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারে।
সম্ভাব্য সরাসরি উত্তীর্ণ: পর্তুগাল ও কলম্বিয়া
৬. গ্রুপ ‘এইচ’: স্পেন-উরুগুয়ে ম্যাচ হতে পারে গ্রুপপর্বের সেরা আকর্ষণ
ইউরো ২০২৪ জয়ের পর স্পেনকে অনেকেই বিশ্বকাপের অন্যতম প্রধান দাবিদার মনে করছেন।
তবে মার্সেলো বিয়েলসার উরুগুয়ে তাদের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে। দুই দলের মুখোমুখি লড়াইটি গ্রুপপর্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ম্যাচগুলোর একটি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সৌদি আরব ২০২২ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে দেখিয়েছে, তারা যে কাউকে চমকে দিতে পারে।
সম্ভাব্য সরাসরি উত্তীর্ণ: স্পেন ও উরুগুয়ে

এক নজরে ১২ গ্রুপের ফেভারিট
৭. গ্রুপ ‘ই’: জার্মানির সামনে ইকুয়েডর ও আইভরি কোস্টের চ্যালেঞ্জ
পরপর দুই বিশ্বকাপে গ্রুপপর্ব থেকেই বিদায় নেওয়ার দুঃস্বপ্ন ভুলতে চায় জার্মানি।
দক্ষিণ আমেরিকা বাছাইয়ে আর্জেন্টিনার পর দ্বিতীয় হওয়া ইকুয়েডরকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। মিডফিল্ডে রয়েছে মইসেস কাইসেদোর মতো তারকা।
সাম্প্রতিক আফ্রিকান কাপ অব নেশনস জয়ী আইভরি কোস্টও এই গ্রুপকে কঠিন করে তুলেছে। তবে গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে জার্মানি কুরাসাওকে ৭-১ গোলে ধরাশায়ী করলেও জয়টা যেন কুরাসাওয়ের ই। কারন তাঁদের ইতিহাসে হয়তো ৭-১ গোলের ব্যবধানে হারার কথা লেখা থাকবে না। লেখা থাকবে , কুরাসাও ফুটবল সাম্রাজ্যের প্রতাপশালী জার্মানির জালে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই গোল দিয়েছিলো।
সম্ভাব্য সরাসরি উত্তীর্ণ: জার্মানি ও ইকুয়েডর
৮. গ্রুপ ‘জে’: আর্জেন্টিনার চোখে অপেক্ষাকৃত স্বস্তির ড্র
শিরোপাধারী আর্জেন্টিনা সম্ভবত সবচেয়ে খুশি হয়েছে এই বছরে বিরোধী শিবিরের ড্রয়ের ফল দেখে।
অস্ট্রিয়া ও আলজেরিয়ার মধ্যকার লড়াই দ্বিতীয় স্থানের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে। তবে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়া জর্ডানও অবমূল্যায়নের দল নয়।
২০২৩ এশিয়ান কাপের রানার্সআপ দলটি বাছাইপর্বে ৩২ গোল করে অপরাজিত থেকেছে।
সম্ভাব্য সরাসরি উত্তীর্ণ: আর্জেন্টিনা ও অস্ট্রিয়া
৯. গ্রুপ ‘এ’: স্বাগতিক মেক্সিকোর সামনে বড় সুযোগ
এই গ্রুপে গড় র্যাঙ্কিং তুলনামূলক নিচে হওয়ায় অনেকেই এটিকে সহজ গ্রুপগুলোর একটি হিসেবে দেখছেন।
ঘরের মাঠের সুবিধা নিয়ে মেক্সিকো এগিয়ে থাকতে পারে। দক্ষিণ কোরিয়া এশিয়া অঞ্চলের বাছাইপর্বে একমাত্র অপরাজিত দল ছিল।
চেক প্রজাতন্ত্র এবং দক্ষিণ আফ্রিকাও লড়াই জমিয়ে তুলতে পারে।
সম্ভাব্য সরাসরি উত্তীর্ণ: মেক্সিকো ও দক্ষিণ কোরিয়া
১০. গ্রুপ ‘জি’: বেলজিয়ামের জন্য স্বস্তিদায়ক সমীকরণ
‘সোনালি প্রজন্ম’- যুগ শেষ হলেও বেলজিয়াম এখনও এই গ্রুপের সবচেয়ে শক্তিশালী দল।
মোহাম্মদ সালাহর মিশর দ্বিতীয় স্থানের অন্যতম দাবিদার। অন্যদিকে ইরানের প্রস্তুতি রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ব্যাহত হয়েছে।
নিউজিল্যান্ডকে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে দুর্বল দলগুলোর একটি হিসেবে ধরা হচ্ছে।
সম্ভাব্য সরাসরি উত্তীর্ণ: বেলজিয়াম ও মিশর
১১. গ্রুপ ‘ডি’: স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রর জন্য অনুকূল ড্র
বিশ্বর্যাঙ্কিংয়ের গড় অবস্থান তুলনামূলক ভালো হলেও এই গ্রুপে কোনো পরাশক্তি নেই।
ক্রিস্টিয়ান পুলিসিচকে সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্র আত্মবিশ্বাসী। প্লে-অফ পেরিয়ে আসা তুরস্কও বেশ শক্তিশালী দল।
প্যারাগুয়ে ও অস্ট্রেলিয়াও শেষ ষোলোয় ওঠার স্বপ্ন দেখছে। তবে প্যারাগুয়েকে প্রথম ম্যাচে ৪-১ গোলের বিশাল ব্যবধানে হারিয়ে নিঃসন্দেহেই যুক্তরাষ্ট্র এই মুহূর্তে ভীষণ আত্মপ্রত্যয়ী।
সম্ভাব্য সরাসরি উত্তীর্ণ: যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্ক
১২. গ্রুপ ‘বি’: সবচেয়ে সহজ, কিন্তু সবচেয়ে অনিশ্চিত?
ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের গড় হিসেবে এটি টুর্নামেন্টের সবচেয়ে দুর্বল গ্রুপ।
তবে দুর্বল মানেই একপেশে নয়। বরং চারটি দলের সামর্থ্য কাছাকাছি হওয়ায় প্রতিটি ম্যাচই হতে পারে ভাগ্যনির্ধারণী।
সুইজারল্যান্ড নকআউট পর্বে নিয়মিত খেলার অভিজ্ঞতা নিয়ে এগিয়ে থাকবে। স্বাগতিক কানাডাও ঘরের সমর্থনকে কাজে লাগাতে চাইবে।
বসনিয়া-হার্জেগোভিনা ও এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন কাতারও চমক দেখানোর সামর্থ্য রাখে। প্রথম ম্যাচে কানাডা আর বসনিয়া-হার্জেগোভিনার ম্যাচটি ড্র হওয়াতে সমীকরণটা যেন আরো অনিশ্চিত হয়ে রইলো।
সম্ভাব্য সরাসরি উত্তীর্ণ: সুইজারল্যান্ড ও কানাডা
৪৮ দলের নতুন বিশ্বকাপে গ্রুপপর্বের সমীকরণ আগের যেকোনো আসরের চেয়ে জটিল। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—‘গ্রুপ অব ডেথ’ থেকে শুরু করে সম্ভাব্য অঘটনের মঞ্চ, সবকিছুরই আয়োজন হয়ে গেছে। এখন অপেক্ষা কেবল মাঠের লড়াই শেষে ফলাফল ।














































