
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর ১০০ দিন পার হলেও সংকটের স্থায়ী সমাধানের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। দীর্ঘ এই সংঘাতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ ইরানিরা। একই সঙ্গে যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও অর্থনীতিতেও।
ইরানের রাজধানী তেহরানে অধিকাংশ দোকানপাট খোলা থাকলেও আগের মতো ক্রেতা নেই। শহরের যান চলাচল আংশিক স্বাভাবিক হয়েছে, তবে কয়েক মাসের বিক্ষোভ, বিমান হামলা এবং লম্বা সময় ইন্টারনেট বন্ধের কারণে লাখো মানুষ চাকরি হারিয়েছেন বা কাজ থেকে সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়েছেন।
প্রায় এক কোটি মানুষের শহর তেহরানে এখনো সাঁজোয়া যান, ভারী অস্ত্র ও নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি চোখে পড়ে। রাতের বেলায় শহরের বিভিন্ন এলাকায় চেকপোস্ট বসানো হয়। অনেক সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ মোড় বন্ধ রাখা হয়, যেখানে সরকার সমর্থকদের সমাবেশে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী স্লোগান শোনা যায়।
শহরজুড়ে বিভিন্ন ব্যানার ও বিলবোর্ডে সরকারপন্থী বার্তার পাশাপাশি লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ এবং ইরান-সমর্থিত ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’-এর প্রতীক প্রদর্শন করা হচ্ছে।
যুদ্ধের প্রথম দিনেই নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। এরপর তার ছেলে মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচন করা হয়। তবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তাকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি বললেই চলে। তার নামে কেবল কিছু লিখিত বার্তা প্রকাশিত হয়েছে।
নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং গোয়েন্দা তথ্য ফাঁসের আশঙ্কায় দেশটির পার্লামেন্ট কার্যত বন্ধ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও বন্ধ রাখা হয়েছে। অনেক পরীক্ষা অনলাইনে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কিছু পুলিশ ইউনিট রাস্তার পাশে অস্থায়ী ডেস্ক বসিয়ে কাজ করছে।
তবে যুদ্ধের ধাক্কা সত্ত্বেও ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো এখনো টিকে আছে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) সহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে তারা হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনে বড় ধরনের প্রভাব বজায় রেখেছে।
প্রায় ৪০ দিনের তীব্র যুদ্ধ ও হাজারো হামলার পর যুদ্ধবিরতির চেষ্টা হলেও তা স্থায়ী রূপ পায়নি। গত এক সপ্তাহ ধরে আবারও রাতের বেলায় গোলাগুলি ও হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি চুক্তির সম্ভাবনা এখনো অনিশ্চিত।
‘আলোচনা নয়, ক্ষেপণাস্ত্র’
যুদ্ধের ১০০তম দিনে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মধ্যস্থতার উদ্যোগ নিয়ে তেহরান সফর করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্র, লেবানন ও হিজবুল্লাহ-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে সমঝোতার পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন।
এদিকে ইরানের রক্ষণশীল দৈনিক ‘কেহান’ এক সম্পাদকীয়তে দাবি করেছে, যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ইরানকে শিখিয়েছে যে ‘যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার কারণে নয়, ক্ষেপণাস্ত্রের চাপে পিছু হটেছে’।
সংবাদপত্রটি আরও দাবি করে, আলোচনার পরিবর্তে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে চাপ সৃষ্টি করা উচিত, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নতুন চাপ তৈরি হয়।
অর্থনীতিতে গভীর সংকট
ইরানের সামরিক ঘাঁটি, পারমাণবিক স্থাপনা, তেল-গ্যাস অবকাঠামো, ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম শিল্পসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ব্যাপক হামলার ফলে অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধ আবার শুরু হলে বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ আরও বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালানো হতে পারে।
দেশজুড়ে অসংখ্য বাড়িঘর, হাসপাতাল, স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইরানের পরিসংখ্যান কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, মে মাস পর্যন্ত বার্ষিক মূল্যস্ফীতি প্রায় ৮৪ শতাংশে পৌঁছেছে। খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ১৩০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। ভোজ্যতেল, ডিম, মুরগি ও আমদানি করা চালের দাম কয়েকগুণ বেড়েছে।
জাতীয় মুদ্রা রিয়ালের মূল্যও ব্যাপকভাবে কমেছে। বর্তমানে খোলা বাজারে এক মার্কিন ডলারের বিপরীতে প্রায় ১৭ লাখ ৭০ হাজার রিয়াল লেনদেন হচ্ছে।
দীর্ঘ প্রায় তিন মাস বন্ধ থাকার পর ইরানের শেয়ারবাজার পুনরায় চালু হয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, বাজারের উত্থান মূলত উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাব এবং দীর্ঘ বিরতির পর লেনদেন শুরু হওয়ার ফল।
মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগ
দেশটিতে ইন্টারনেট আংশিকভাবে চালু হলেও এখনো কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রয়েছে। বিকল্প সংযোগ ব্যবস্থার বিরুদ্ধেও অভিযান চলছে।
এদিকে বিচার বিভাগ প্রায় প্রতিদিনই ভিন্নমতাবলম্বীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘোষণা দিচ্ছে। চলমান যুদ্ধ, সাম্প্রতিক বিক্ষোভ এবং আগের সংঘাতের সময় গ্রেপ্তার হওয়া অনেকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নতুন আইনের আওতায় গুপ্তচরবৃত্তি বা বিদেশি শত্রু রাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতার অভিযোগে অভিযুক্তদের জন্য আরও কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
যুদ্ধের ১০০ দিন পরও ইরানের সামনে শান্তির কোনো সুস্পষ্ট পথ দেখা যাচ্ছে না। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তা সংকট এবং অর্থনৈতিক দুরবস্থার মধ্যে সাধারণ মানুষের জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প














































